প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প: চাহিদার অভাবে ভেস্তে যাচ্ছে ৪০৭ কোটি টাকার প্রকল্প

বণিক বার্তা: প্রতি বছরই সেচ মৌসুমে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। অন্যদিকে পরিবেশের দূষণ বাড়ায় ডিজেলচালিত পাম্পের ব্যবহার। এসব সমস্যার সমাধানে দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবো)। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যয়বহুল এ প্রকল্প কৃষক পর্যায়ে কোনো আবেদনই তৈরি করতে পারেনি। চাহিদাও একেবারে শূন্যের কোটায়। এ কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু একটি পাম্পও স্থাপন করা যায়নি। ফলে প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি ভেস্তে যেতে বসেছে।

বাপবিবো সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৮ সালের ২৯ মে। এতে সরকারের অর্থায়ন ধরা হয়েছিল ৩৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এছাড়া এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) প্রকল্প সহায়তার পরিমাণ ৩৬৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রকল্পে বাপবিবোর নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। নির্ধারিত মেয়াদ পূরণ হওয়ার পর সময় পেরিয়েছে আরো প্রায় তিন মাস। যদিও এখনো একটি পাম্পও স্থাপন করতে পারেনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা। এ অবস্থায় প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে আবার।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপন-সংক্রান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) সংশোধনী উত্থাপন করা হয়। এ সময় পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খান। এ সময় বাপবিবোর চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভার কার্যপত্র সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় ৪৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৪৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ধরা হয়েছে ৬৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এডিবির প্রকল্প সহায়তার পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৮৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাকি ২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা অর্থায়ন করছে বাপবিবো নিজেই। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ সময় দুই বছর বাড়িয়ে আগামী বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সভায় উঠে আসে, এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের অধীনে একটিও পাম্প স্থাপন করা যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয়ের কারণে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩ দশমিক ১২ শতাংশ।

সভায় প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এর কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দেন সভাপতি শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) শরিফা খান। এ সময় বাপবিবোর চেয়ারম্যান জানান, সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প ক্রয়ে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে প্রচার কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অপারেশনাল মডেল পুনর্গঠন ও প্রকল্প এলাকা বাড়ানো হচ্ছে। এর ফলে আগ্রহী কৃষকের সংখ্যা বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা যায়। সেক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

পিইসি সভায় উপস্থিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিনিধি জানান, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য এডিবি থেকেও তাগিদ দেয়া হচ্ছে। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হলে এডিবির সম্মতি ও ইআরডির মতামত নিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পটির পরিচালক শাকিল ইবনে সাঈদ বলেন, এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ডিজেলচালিত পাম্পগুলোকে প্রতিস্থাপন করে সোলারে চালানো হবে। কিন্তু এখন দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। তাই সোলার পাম্পে কৃষকের চাহিদা কমে গিয়েছে। তবে এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আগে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কৃষকদের আকৃষ্ট করতে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছিল। কৃষকরা যাতে পাম্পগুলো নিতে আগ্রহী হন, সেজন্য কমিটি বেশকিছু সুবিধা দেয়ারও সুপারিশ করেছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, এসব সুপারিশের অন্যতম হচ্ছে পাম্পের মূল্যহ্রাস। আগে একটি তিন অশ্বশক্তির পাম্প কিনতে ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা লাগত। সেটি এখন কমিয়ে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে এককালীন পরিশোধ করতে হতো ১৫ শতাংশ। সেটা এখন করা হয়েছে ১০ শতাংশ। সেচকাজে ব্যবহারের পর যখন পাম্পগুলো অলস বসে থাকবে, তখন কৃষক জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। এজন্য পাম্প থেকে জাতীয় গ্রিডে সংযোগ স্থাপনের যাবতীয় খরচ সরকারই বহন করবে। তাই আগামীতে এ প্রকল্প কৃষকদের আকর্ষণ করবে বলে আশা করা যায়। তার পরও বাস্তবায়নের দিক থেকেও এটি একটি কঠিন প্রকল্প। কারণ বিদ্যুৎ এখন সব জায়গায় আছে। মানুষ বিদ্যুতের দামের সঙ্গে এর খরচের তুলনা করে দেখবে।

বাপবিবো সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথমে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, নওগাঁ, ফেনী, কুমিল্লা-২, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ—এ ১০টি পল্লী উন্নয়ন সমিতির এলাকায় পাম্পগুলো স্থাপনের লক্ষ্য হাতে নেয়া হয়। কিন্তু এসব অঞ্চলে কৃষকদের চাহিদা কম হওয়ায় নতুন করে ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুর, টাঙ্গাইল, মাদারীপুরসহ ৩২টি পল্লী উন্নয়ন সমিতির এলাকায় পাম্পগুলো স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত