প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নরেন্দ্র মোদি: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভিন্ন এক দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন

নরেন্দ্র মোদি:  ১৯৭৫ সালের আগস্টের এক অন্ধকার সকালে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁর হত্যাকারীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুফলগুলো বদলে দিতে চেয়েছিল, যেগুলোর জন্য বঙ্গবন্ধু এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তারা বঙ্গবন্ধুর একটি সহযোগিতামূলক, শান্তি ও সম্প্রীতিপূর্ণ উপমহাদেশ গঠনের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করতে চেয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর জীবনকে একটি সংগ্রামগাথা বলা যায়। নিপীড়ন ও বর্বরতার মুখোমুখি হয়েও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ঋজুতার সঙ্গে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা ছিলেন তাঁর শক্তির উত্স। যদিও আমরা তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে জানতে পারি যে একবার তিনিও বঙ্গবন্ধুর বারবার কারাবরণের কারণে পরিবারের ঝুঁকি ও কষ্টের কথা তুলে ধরেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সহজ জবাব ছিল, তাঁর ‘অন্য কোনো উপায় নেই’।

লক্ষ্যের প্রতি তাঁর এই অবিস্মরণীয় অবিচলতা এবং সব অত্যাচার সহ্য করার পরও বঙ্গবন্ধু চেতনার উদারতা ধরে রেখেছিলেন, যা তাঁর মহানুভবতারই প্রতীক। ন্যায়পরায়ণতা এবং সাম্যের প্রতি তাঁর প্রগতিশীল বিশ্বাস ১৯৫০–এর দশকে তাঁর একটি লেখায় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি অন্তত এটুকু জানি যে আমার থেকে ভিন্ন মত পোষণ করেন বলে কাউকে খুন করা উচিত নয়।’

এটি ছিল তাঁর নিজ আদর্শের প্রতি গভীর বিশ্বাসের এক বিরল সংমিশ্রণ এবং একটি আলাদা মতামত গ্রহণের জন্য মনের উদারতা, যা বঙ্গবন্ধুকে আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছিল। এর ফলে ভারতের জনগণের কাছেও বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। তাঁর মধ্যে আমরা এমন একজন দূরদর্শী নেতা দেখেছি, যাঁর দৃষ্টি শারীরিক সীমানা এবং সামাজিক বিভাজনগুলোর সংকীর্ণ সীমার ঊর্ধ্বে ছিল। সে কারণেই আমরা আমাদের বাংলাদেশি ভাইবোনদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি উদ্‌যাপনে এই অত্যন্ত বিশেষ মুজিব বর্ষে অংশ নিয়েছি।

আমরা যখন বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামের দিকে তাকাই, তখন আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, আমাদের উপমহাদেশ কেমন দেখতে হতো, যদি এই আধুনিক যুগের মহামানবকে হত্যা না করা হতো?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন, কী হতে পারে তার ভবিষ্যদ্বাণী কে করতে পারে? তবে একটি স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রায় চার বছরের কার্যকালের দিকে তাকালে আমরা একটি অনুমান করতে পারি।

বাজি ধরেই বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এবং আমাদের অঞ্চলটি এক অন্য রকম পথ ধরে বিকশিত হতো।

একটি সার্বভৌম, আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে, সবার সঙ্গে মৈত্রী এবং কারও প্রতি বৈরিতা প্রকাশ না করে, একটি বেদনাদায়ক যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে দ্রুত বেড়ে উঠছিল।

এটি যদি অব্যাহত থাকত, তবে সম্ভবত ভারত ও বাংলাদেশ বহু দশক আগে এমন কয়েকটি অর্জন করতে পারত, যা আমরা সম্প্রতি করতে পেরেছি।

উদাহরণস্বরূপ, ভারত এবং বাংলাদেশ ২০১৫ সালের স্থলসীমা চুক্তির মাধ্যমে ঐতিহাসিক জটিলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলোর ইতিহাসে এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল। তবে বঙ্গবন্ধু যদি আরও দীর্ঘকাল অধিষ্ঠিত থাকতেন, তবে এই অর্জন হয়তো অনেক আগেই সম্ভব হতো। এমন হলে আমাদের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অভিন্ন নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতাও একটি পৃথক কক্ষপথে পৌঁছাত।

এটি হয়তো অবাস্তব মনে হতে পারে, তবে অন্য উদাহরণগুলোও দেখতে হবে। শতাব্দী ধরে চলা দ্বন্দ্বের ফলে ইউরোপ বিভক্ত হয়েছিল, তবে সমৃদ্ধ ও অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণে অংশ নেওয়ার জন্য তারা জনগণকে একত্র করতে অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেছে। একে কিছুটা আসিয়ানের অর্জনের সঙ্গে তুলনা করা চলে।

আমি নিশ্চিত যে তাঁর দূরদর্শী বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের উপমহাদেশের জন্য আরও বড় কোনো স্বপ্ন দেখার সাহস করতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এই অঞ্চলটি, অন্তত বঙ্গোপসাগর অঞ্চল সম্ভবত অন্য রকম হতে পারত।

আমরা গভীরভাবে আন্তসংযুক্ত মানসম্পন্ন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে হালকা শিল্প, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি পণ্যগুলোকে উন্নত উপকরণে পরিণত করে একটি নিবিড় সুসংহত অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করতে পারতাম। আমরা লাখো মানুষের অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত সুবিধা সর্বোচ্চ করে তোলার জন্য আন্তসরকারি কাঠামো তৈরি করতে পারতাম।

আমরা আমাদের অঞ্চলটিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব থেকে বাঁচাতে আমাদের নিজেদের মধ্যে এবং আমাদের অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আবহাওয়া, সমুদ্রসংক্রান্ত ও ভূতাত্ত্বিক তথ্য ভাগ করে নেওয়ার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতাম।

আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর—বঙ্গোপসাগর ও এর আশপাশে দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটাতে মৎস্য থেকে শুরু করে উপকূলীয় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে আমাদের সমুদ্রসংক্রান্ত সামর্থ্যে যোগ দিতে পারতাম।

আমরা বঙ্গোপসাগর পরিবহন ও লজিস্টিক কাউন্সিলের মাধ্যমে ত্রুটিহীন সমন্বিত ও সুসংহত রাস্তাঘাট, নাব্যযোগ্য নদী ও নদীবন্দর, রেলপথ, বন্দর, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং বিমানবন্দরগুলোর এক বিস্তৃত বহুমুখী সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারতাম।

এর ফলে পণ্যগুলো এমনকি উৎপাদনপ্রক্রিয়া চলাকালেও বিভিন্ন সময়ে তথ্যপ্রযুক্তিসংবলিত ও উচ্চ আধুনিক সীমান্ত ধরে দ্রুত ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারত।

সর্বোপরি, এমন একটি দৃশ্য কল্পনা করুন যেখানে আমাদের লোকেরা উপমহাদেশজুড়ে অধ্যয়ন করতে, কাজ করতে এবং অনায়াসে ব্যবসা করতে পারে—বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক তরুণ যারা সম্পদ, উদ্ভাবন এবং নতুন প্রযুক্তি চালনার জন্য তাদের শক্তিতে কাজে লাগাতে পারে।

আমাদের সমাজে উগ্রবাদ, হিংস্র বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং বিদ্বেষের বিষবাষ্পের বিরুদ্ধে এটি সবচেয়ে প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হতো। এটিই সেই সোনালি অধ্যায়, যদি ১৯৭৫ সালের আগস্টের সেই করুণ শুক্রবারটা না আসত, তাহলে হয়তো আমরা সেখানে থাকতে পারতাম।

বাংলাদেশের জাতির পিতার হত্যাকাণ্ড অঞ্চলটিকে ভাগ্যবঞ্চিত করেছিল, যা আমরা ভাগ করে নিতে পারতাম এবং আমাদের ভাগ করে নেওয়া উচিত ছিল এবং আজও, একটি নতুন ও উদীয়মান বাংলাদেশের এটা বিশ্বাস করা সম্ভব যে এই ভবিষ্যৎ আরও একবার আমাদের আয়ত্তে আসবে।

বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান আয় ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সক্ষম নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করছে। আমাদের অংশীদারত্বের জন্য আবারও সাহসী ও উচ্চাভিলাষী হওয়ার সময় এসেছে, যেমনটি বঙ্গবন্ধু করতেন। আমাদের ভাগ্যবিধাতা জনগণের চেতনা ও কর্ম প্রচেষ্টায় তেমন একটি ভবিষ্যৎ খুবই নিকটে।

আমাদের রোমাঞ্চকর সাম্প্রতিক যাত্রা আমাকে আশাবাদী করে। ভালো প্রতিবেশীর মনোভাব নিয়ে আমরা জটিল বিষয়গুলো আন্তরিকতার সঙ্গে সমাধান করেছি। আমাদের স্থল ও সমুদ্রসীমা সমস্যা মিটে গেছে। মানুষের প্রচেষ্টার প্রায় সব দিক নিয়েই কাজ করার ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা রয়েছে।

একে অপরের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সহায়তা করার মাধ্যমে আমাদের বাণিজ্য ঐতিহাসিক স্তরে পৌঁছেছে। আমাদের মানুষে মানুষে বিনিময়গুলো বরাবরের মতো মজবুত রয়েছে। আমরা যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ভালো অগ্রগতি লাভ করেছি। কার্গোগুলো এখন বাংলাদেশ থেকে ভারতের মাধ্যমে নেপাল ও ভুটানে যেতে পারে।

আমরা বাংলাদেশের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্যসামগ্রী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে সরবরাহের জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল শুরু করার জন্য ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, এর ফলে বাংলাদেশের বার্জগুলো সব পথ দিয়েই ভারতের বারানসি এবং সাহিবগঞ্জে পৌঁছাতে পারবে। গত বছর আমরা রেলপথের মাধ্যমে কার্গো এবং পার্সেল পরিষেবাও শুরু করেছি। এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে উভয় দেশের গ্রাহক এবং উত্পাদনকারীরা সরাসরি উপকৃত হয়েছে। তদুপরি, ভারত ক্ষমতায় আন্তসীমান্ত বাণিজ্যকে উত্সাহিত করতে তাদের কিছু বিধিমালা সংশোধন করেছে, যা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে উপকৃত করবে।

এই ঐতিহাসিক স্মরণীয় বছরটিতে আমরা ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন এবং আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ প্রকল্পগুলোর সমাপ্তির অপেক্ষায় রয়েছি। আমাদের সংযোগের উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ব্যবসা বৃদ্ধি পাবে, আমাদের অংশীদারত্ব আরও গভীর হবে এবং সহযোগিতার নতুন নতুন দ্বার খুলবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা আবারও এমন একটি লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যার ইঙ্গিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমাদের অঞ্চলের জন্য একবার জাগিয়ে তুলেছিল। যৌথভাবে একটি সোনালি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে ভারত বাংলাদেশের অংশীদার থাকবে, যে ভবিষ্যতের জন্য বঙ্গবন্ধু, লাখ লাখ দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি এবং প্রকৃতপক্ষে হাজার হাজার ভারতীয় তাঁদের সমস্ত কিছু উৎসর্গ করেছিলেন।

বাংলাদেশের জাতীয় দিবস উদ্‌যাপনে অংশ নেওয়ার সম্মান অর্জনের জন্য আমি যখন ঢাকা সফর করব, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আমি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করব। আমি বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছি। জয় বাংলা, জয় হিন্দ। বঙ্গবন্ধুর চেতনা আমাদের বন্ধুত্বকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলুক।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে ​প্রথম আলোকে দেওয়া তাঁর বিশেষ লেখা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত