প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: অপার সম্ভাবনা, সমৃদ্ধ দেশের হাতছানি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এদিন বঙ্গবন্ধুর আহবানে সারাদিয়ে পূর্ববাংলার জনগণ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে মরণপন যে যুদ্ধ শুরু করেন সেটির নাম মুক্তিযুদ্ধ। যার একমাত্র লক্ষ্য ছিলো স্বাধীন সার্বোভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এককথায় এটি আমাদের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা আমাদের একদিনে অর্জিত হয়নি, ঘোষণার মধ্যেই সেই স্বাধীনতা পূর্ণতা ধরা দেয়নি। স্বাধীনতা লাভের জন্য আমাদের পাকিস্তানি শাসক এবং তাদের সেনাবাহিনী ও দোষর বিভিন্ন উপবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন, গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও বাড়িঘর, শহর-বন্দর, লোকালয় ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছিলো, রাস্তা-ঘাট, পুল, কালর্ভাট স্থাপনা, কলকারখানা নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়েছিলো।

পাকিস্তানি শাসক এবং তাদের সামরিক বেসামরিক দোষররা পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করেছিলো। তাদের কাছে সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবনের কানাকড়ি মূল্য ছিলো না। দরকার ছিলো শুধু এ ভূখণ্ডের ওপর যেন তাদের পাকিস্তানের রক্তাক্ত পতাকা ওড়তে থাকে। পাকিস্তান কখনোই পূর্ববাংলাকে পাকিস্তানের সমমর্যাদার প্রদেশ ভাবেনি, জনগণকেও মানুষের মর্যাদায় দেখতে চায়নি। সে কারণেই পূর্ববাংলা পাকিস্তান হয়ে ওঠেছিলো একটি বিদেশি, ঔপন্যাবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে। তবে এর চরিত্র ছিলো আরও ভয়ঙ্কর। সাম্প্রদায়িকতা বাঙালি বিদ্ধেষপনা, নিজেদের শ্রেষ্ঠ নির্ভেজাল পড়াকাষ্ঠা রূপে  ভাবা হতো। এখন বৈষম্যমূলক পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ববাংলার জনগণের অস্তিত্ব ২৩ বছরে ধীরে ধীরে  বিপন্ন হতে থাকে। ১৯৬৭১ সালে পাকিস্তানিরা তাদের দোসরদের ব্যতীত আর সবার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার নৃশংসতায় লিপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালি ও এই অঞ্চলে বসবাসকারী অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিগুলোর জাতিগত অধিকার রক্ষার আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তুলতে থাকেন।

এজন্য তাকে বার বার পাকিস্তানের কারাগারে আটক রাখা হয়, নানা মামলায় জড়িয়ে তার কারাজীবন দীর্ঘমেয়াদী এবং বিবর্তনমূলক করা। উদ্দেশ্য ছিলো আন্দোলন, সংগ্রাম এবং জাতিগত অধিকারের চেতনা যেন এই ভূখণ্ডে কোনো নেতা যেন গড়ে তুলতে না পারে। কিন্তু শেখ মুজিব ছিলেন একজন অদম্য সাহসী, ত্যাগী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা-যিনি পাকিস্তানের সকল ষড়যন্ত্র রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার নীতি ও কৌশলে পরাস্ত করতে পারদর্শী ছিলেন। ছয়দফা উত্থাপন করে তিনি একদিকে পূর্ববাংলার জনগণকে তাদের স্বাধীনতা ও মুক্তির পথ দেখিয়ে দিলেন, অন্যদিকে পাকিস্তানকে এমন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন, যা ওই রাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠির পক্ষে হজম করা মোটেও সহজ ছিলো না। ১৯৬৬ থেকে ৭১ পর্যন্ত ছয় দফার সেই লড়াইয়ে পাকিস্তানের  শাসকগোষ্ঠি সকল ষড়যন্ত্র  ভয়ভীতি মামলা অন্ত্র ও হত্যা পরিকল্পা ব্যস্তে যায়। বঙ্গবন্ধু গোটা জাতিকে স্বাধীনতার জন্য ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন। সেই ঐক্যের বিষফোড়ন ঘটতে থাকে ১৯৬৯, ১৯৭০, এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। ২৬ মার্চের পর সে যুদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিকল্পনা মোতাবেক এবং  জনগণের আস্থায়, ভারত ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব শক্তির সর্মথনে ৯ মাস এক জনযুদ্ধ সংগঠিত করার মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের  কারাগার থেকে স্বাধীন এ দেশের  বিজয়ী রাষ্ট্রনায়ক পরিচয়ে পর্দাপন করেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর এক যুদ্ধবিধ্বস্ত  রাষ্ট্রের কঠিন দায়িত্ব কাধে তুলে নেন। ১৯৪৭-১৯৭১ সালে তার ছিলো  স্বাধীনতার  স্বপ্ন। সে স্বাধীনতা অর্জিত হলো ৩০ লাখ মানুষের  জীবনের বিনিময়ে। অধিকাংশ মানুষের বিপুল সম্পদের হানি হয়, ধ্বংস হয় গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ১৯৭২ সালে তিনি স্বপ্নে সেই রাষ্ট্রটিতে সোনার বাংলায় পরিণত করার রাষ্ট্রচিন্তায়  নিজেকে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে রাতদিন পরিশ্রম করতে থাকেন। অর্থনৈতিক নানা সংকট, দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে তিনি সোনার বাংলা নামক রাষ্ট্রের আইন, সংবিধান, অবকাঠামোগত সুযোগ সৃষ্টি, নতুন জাতি গঠনের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা প্রশাসন, ভূমি, শিল্প, বিদেশ নীতি, গঠন করতে থাকেন। সে কারণেই ১৯৭২ সালে যে দেশের মাথাপিছু আয় ছিলো মাত্র ৯৩ ডলার। সেই দেশকে তিনি পুনর্গঠনের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের জুন মাসেই ২৭০ ডলারে উন্নিত করার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়। বঙ্গবন্ধুর এমন ভিশনারী-মিশনারী নেতৃত্ব যদি অভ্যাহত থাকতো তাহলে আশির দশকেই আমরা  অন্য এক বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক মর্যাদা নিয়ে আবির্ভূত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু ৭৫ সালে দেশিয় এবং আন্তার্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠি বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিজনদের হত্যা কার মাধ্যমে শুধু শাসন ক্ষমতারই নয়, বরং গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার পশ্চাৎমুখী ও প্রতিক্রিয়াশীল এক পরিবর্তন ঘটায়-যা এখনও আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্রিয়াশীল  রয়েছে।

১৯৭৬-২০০১ এবং ২০০৯ থেকে বর্তমান সময়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে বিপুল সম্ভাবনা দৃশ্যমান হয়েছে, তার অনেকটাই  বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার ফসল। বস্তুত ১৯৭২ থেকে ২০০১ সালের ৫০ বছর কালে প্রকৃত রাষ্ট্রচিন্তার অধিকারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের শাসন আমরা পেয়েছি মাত্র (৩.৫+৫+১২=২০.৫)। এ সাড়ে বিশ বছরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে ৭৩ শতাংশ। বাকি সাড়ে উনত্রিশ বছরের শাসকদের শাসন কালে ঘটেছে মাত্র ২৭ শতাংশ। এখান থেকেই প্রকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্বের  শাসনকালের গুরুত্ব বোঝার উদাহরণ খুঁজে নিতে হবে।

গত ১২ বছরে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন হাজার দুইশ মেগাওয়াট থেকে বাইশ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন করার  যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে তা আমাদের গোটা অর্থনৈতির কর্মকাণ্ড আমূল পরিবর্তন সাধনে ভূমিকা রেখেছে। একইসঙ্গে ডিজিটাইলাইজেশন ঘটায় গোটা অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা, সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-ব্যাণিজ্য, রেমিটেন্স প্রবাহ এবং দেশের অভ্যন্তরে  গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার চিত্রই পাল্টে দিয়েছে, কৃষি, মস্যশিল্প, বিদেশি বিনিয়োগ, মেগা প্রকল্প ইত্যাদিতে বাংলাদেশ এখন অন্যন্য এক উচ্চতায় আসীন হয়েছে। সে কারণেই অনেক দেরিতে হলেও  শেখ হাসিনার  শাসনকালেই  আমরা স্বল্পোন্নত দেশের অবস্থান থেকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং সর্বশেষ  উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন লাভের মাধ্যমে ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।

কোভিড-১৯ সারা বিশ্বকে উন্নয়ন ধারা থেকে অনেকটাই  পিছিয়ে দিচ্ছে, আমরা  সেই তুলনায় এখনও অনেক রাষ্ট্র ও সংস্থার চোখে বেশ ভালো করছি, তবে এতো আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যেহেতু জাতির জনকের জন্মশত বছর এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি একই সময়ে আমাদের জাতীয় জীবনে আবির্ভূত হয়েছে। তাই কোভিড-১৯ এর প্রতিকূলতাকে স্মরণে রেখে আমাদের এই। ঐতিহাসিক দুই অনন্য অসাধারণ ঘটনাকে পালন করতে হচ্ছে, শিক্ষানীতি হচ্ছে অতীতের প্রতিকূলতাকে কীভাবে বঙ্গবন্ধু মোকাবেলা করেছেন এবং গত কয়েক বছর ধরে শেখ হাসিনা জাতির জনকের অসমাপ্ত সোনার বাংলা গড়ার চ্যালেঞ্জকে ধীরচিত্তে  জয় করার দায়িত্ব কাধে নিয়েছেন। আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এখন আর পিছিয়ে পড়া দেশ নয়, বরং অপার সম্ভাবনার সমৃদ্ধ দেশের হাতছানি প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি। লেখক : শিক্ষাবিদ

সর্বাধিক পঠিত