প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: নরেন্দ্র মোদির সফর, উস্কানীমূলক বক্তব্য, শাল্লায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা এবং সেখানে দ্রুতবিচার আইনে মামলা না হওয়া- কেনো?

দীপক চৌধুরী: নানারকম চক্রান্তের কথা উঠেছে। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র তো আছেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র হয়েছে বহুবার। সেই চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র এখনও বিদ্যমান। মুজিববর্ষ ও সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি দেশে আসছেন। যাঁরা আসতে পারেননি তাঁরা অর্থাৎ বিশ্বের খ্যাতিমান নেতারা ভিডিওতে শুভেচ্ছাবাণী পাঠাচ্ছেন। একটি ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। চক্রান্তকারী-ষড়যন্ত্রকারীদের এটাই পছন্দ হচ্ছে না। গাত্রদহের এটিই মূলকারণ। এরপর যে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে, এটি হচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর। বন্ধুপ্রতীম প্রিয় প্রতিবেশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমাদের সরকার নিমন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু তাঁকে ঠেকাতে হেফাজত মরিয়া। হেফাজত নেতারা দিরাইয়ের সমাবেশে মোদি ঠেকোনোর ঘোষণা দিয়েছেন। “বাংলাদেশে মোদিকে ঢুকতে দেওয়া হবে না”- এই ঘোষণা দেন হেফাজত নেতারা ওই সমাবেশ থেকেই। সূত্র কিন্তু সেটিই। এরপরের ইতিহাস ও জঘন্য ঘটনা দেশবাসী জানেন। শাল্লার ঘটনা বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা ছিঃ ছিঃ দিচ্ছেন।
ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কী-না করেছে! তাঁদের ত্যাগ, দায়িত্ব, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁদের বিশ্বাস-শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি করার নেতৃত্ব দিয়েছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। অথচ সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঠেকানোর উস্কানীমূলক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশসহ বিশে^র মানুষকে বিস্মিত করেছে। একদিকে সরকার তাঁর আগমন নিশ্চিত করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে হেফাজতিরা ঠেকানোর উল্টো উস্কানী দিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে, নরেন্দ্র মোদির  নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে মোমেন পর্যন্ত গণমাধ্যমে পরিষ্কার করে বক্তব্য রেখেছেন।

এবার সুনামগঞ্জের শাল্লার নোয়াগাঁও প্রসঙ্গে আসি। ১৭ মার্চ হামলার পর থেকে অনেকদিন অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু হিন্দুসম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলার পরও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা দেখা যাচ্ছে কেনো? হামলায় যে যুবকের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা, সেই ঝুমন দাশ ওরফে আপনের (২৮) বিরুদ্ধে শাল্লা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী নাকি ঝুমন দাশ ওরফে আপনের (২৮) বিরুদ্ধে শাল্লা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি হয় সোমবার রাতে। অথচ হিন্দু গ্রামবাসীর গ্রামে ওঠে যেভাবে তাণ্ডব চালানো হলো, টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার, সম্পদ লুটপাট হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে বাড়িঘর, হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবতা অর্থাৎ প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে, অশ্লীলভাবে অবমাননা করা হয়েছে সেখানে দায়সারাগোছের মামলা নেওয়া হয়েছে। হিন্দুসম্প্রদায়ের দেবতার অবমাননা হয় না, নাকি? কিন্তু কেনো? গ্রামবাসীর মামলা দ্রুত বিচার আইনে রেকর্ডের দাবি করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন কানে তুলছেই না।

এদিকে, নোয়াগাঁওয়ে হামলার ঘটনায় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে দেওয়া মামলাটি দ্রুত বিচার আইনে রেকর্ড করার দাবিতে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী গতকাল বুধবার বিকেলে সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হকের কাছে এই স্মারকলিপি দেন তাঁরা। একই সময় দ্রুত মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

১৮ মার্চ নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার নোয়াগাঁওয়ের ঘটনায় শাল্লা থানায় একটি এজাহার দাখিল করেন। এজাহারের প্রাথমিক তথ্য বিবরণী থেকে দেখা যায়, মামলাটি দণ্ডবিধির

১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩৭৯/৩৮০/৪২৭/২৯৫/৫০৬/৩৪ ধারায় রেকর্ড বা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এজাহারের বিষয় ও গুরুত্ব বিবেচনায় এজাহারটি দণ্ডবিধির উল্লিখিত ধারায় লিপিবদ্ধ করা হলো কীভাবে? এটি কী ছেলে খেলার বিষয়? নানারকম প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। কী রকম রহস্যজনক কাজ-কারবার। মামলা রেকর্ড করার মুহূর্তে কেউ কী কানে কানে বলেছিল মামলাটি অতি সাধারণ আইনে করা হোক! সঠিক আইনে মামলা না করায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রথম আলো পত্রিকা লিখেছে, এজাহারটি আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন-২০০২-এর অধীনে লিপিবদ্ধ করা যথোপযুক্ত ছিল। কারণ, এজাহারের বিষয় আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন-২০০২-এর ধারা ২-এর উপধারা (ই), (ঈ), (উ) পুরোপুরি সমর্থণ করে।

এটা তো আজ স্পষ্ট যে, ১৫ মার্চ দিরাই উপজেলা শহরে আয়োজিত এক সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও মামুনুল হক বক্তব্য দেন। পরে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেন বলে অভিযোগ ওঠে নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক ঝুমন দাশের বিরুদ্ধে। এর জেরে ১৭ মার্চ সকালে শাল্লা উপজেলার কাশিপুর, দিরাই উপজেলার নাসনি, সন্তোষপুর ও চণ্ডিপুর গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামের পাশের ধারাইন নদের তীরে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে সেখান থেকে শত-শত লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালান। আজ এটা পরিষ্কার হওয়া দরকার যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িগুলোতে নিষ্ঠুর হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, মন্দিরে হামলা, ত্রাস সৃষ্টির পরও প্রকৃত দোষী-অপরাধীরা এখনো ধারাছোঁয়ার বাইরে কেনো? লুটপাটকারীদের বিচার হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি এদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষ মেনে নেবে না। ভিডিও দেখে হামলাকারী সশস্ত্র ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় আনতে হবে। ১৯৭১-এ সাম্প্রদায়িকতার কবর রচিত হয়েছে এদেশে। এটা মনে রেখে কাজ করতে হবে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা চলবে না। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে, ‘মাছ’ আর ‘শাক’ এখন চিহ্নিত করা সহজ। এই ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা হতেই হবে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত