প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেরে বাংলা, মানিক মিয়া আর অশ্বিনী কুমার দত্তের বরিশাল বদলায়নি একটুও

আরিফুর রহমান : সৃজন বরিশাল জিলা স্কুলে ক্লাস থ্রীতে ভর্তি হবার চেষ্টা করছে। পড়াশুনা ভালোই করেছে কিন্তু কোভিডের কারণে ভর্তি পরীক্ষা হয়নি, লটারী হয়েছে – জেতেনি। ওর ইচ্ছে সে ডাক্তার হবে।
বললাম, তোমার বাবার মতো পুলিশ হও।
সৃজনের সরল জবাব, না– পুলিশ ডরাই।

ওদের পরিবার বরিশালে আমার পিতার বাড়ীর প্রতিবেশী, দেখা মাত্র পরিচয় হলো, পনের মিনিটে স্বজন হয়ে গেলাম। বরিশাল নৌ পুলিশের ওসি সৃজনের বাবা, হেসে বললেন, –আপনার কথা শুনেছি, আজ দেখা হলো।
নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড সবাই মিলে চব্বিশ ঘন্টা বরিশালের নদীপথ পাহারা দেয়। কীর্তনখোলা নদীতে জাহাজের ট্রাফিক জ্যাম দেখলে অবাক হতে হয়। বাংলাদেশের নব্য অর্থনৈতিক অবকাঠামোর প্রচন্ড শক্তিমত্তা বুঝতে চাইলে নদী পথে কয়েক ঘন্টা ঘুরে মালবাহী জাহাজের ভিড় দেখে আসতে হবে মাত্র।

বাবার কবর জিয়ারত করতে বরিশাল এসেছি দুদিন হলো। এই শহরে এখনো পুরানো দিন খুঁজে পাওয়া যায়। শহরের বিভিন্ন বাগানে এখনো জীবনানন্দের ভাট ফুল ফোটে, তমাল গাছের শাখায় শালিকেরা বসে কথা বলে– কে খাইলো কে খাইলো!! সাঁজের বেলা বকের ঝাঁক বাসায় ফেরে দল বেঁধে। গভীর রাতে ভুতুম ডেকে ওঠে ডুমুর গাছে আর তখনই বাতাসে সরসর শব্দ করে নড়ে ওঠে শ্যাওড়া গাছের পাতা। ছোটবেলা এই শব্দ হলে মা বলতেন শাকচুন্নি আর পেত্নীরা উড়ে এসে শ্যাওড়া গাছে বসেছে, ঘুমা এখন। তখন ভয় পেয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়তাম। মা আজ কত দূরে অথচ বুড়ো গাছটি এখনো জানালার পাশে। এতবছর পরেও আমাকে চিনে ফেলেছে।

গত মাঝ রাতে আমাকে ছোটবেলার মতই ভয় দেখাতে চেষ্টা করেছে পাতায় সরসর শব্দ করে। ঘুম ভেঙে গেলে জল পান করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। শাকচুন্নি, পেত্নী আর ভুতের দল হতাশ হয়ে চলে গেলো। এক ভুতকে বলতে শুনলাম, মা মরে গেলে মানুষগুলোর বোধশোধ থাকেনা। চল, অন্য কাউকে ভয় দেখাই। কোন এক অজানা বক্তৃতা পাখির অবিরত চিকুই মিকুই শুনতে শুনতে ঘুম জেঁকে বসবে চোখে। বরিশাল একটুও বদলায়নি।

এই শহরে এখনো প্রত্যুষে আপনার ঘুম ভাঙবে হয় মোরগ না হয় ডাহুকের ডাকে। এখনো সন্ধ্যার আঁধার ঘনালে রূপাতলীর বিদ্যুতের আলো পেরুলেই শিয়ালের দলবদ্ধ কেয়া হুয়া হুক্কা হুয়া স্লোগান শোনা যায় নদীর পাড়ে পরিত্যক্ত ইটের ভাটায়। অলস দুপরে ডিসি বাংলো রোডের শত বছরের পুরনো বিশাল রেইন- ট্রির ডালে কোকিলদের কুহু গানের আসর বসে যায় এখনো।
বললাম, তোমার বয়স কত সৃজন?
–নয় বছর।
তোমার কপালে কালো ফোটা দিয়েছো কেন?
লজ্জা পেয়ে বললো, মা বলেছেন, আল্লাহ আমার জন্ম থেকেই এটি লাগিয়ে দিয়েছেন।
বললাম, তুমি কি জানো তোমার তিলটির একটা অর্থ আছে?
মাথা নাড়িয়ে বোঝালো–জানেনা।

বললাম, শরীরের তিল নিয়ে কিছু মানুষ মনে করেন, তোমার মতো কপালের মাঝখানে যদি কারো তিল থাকে তবে মানুষটি জ্ঞানী এবং দুর্দান্ত বুদ্ধির অধিকারী হয়। সে অনেক পরিশ্রমী হয়।
সৃজন বললো, তাহলে আমি কি জিলা স্কুলে ভর্তি হতে পারবো?
আমি বললাম, অবিশ্যিই পারবে এবং তুমি ডাক্তারও হবে।

সৃজনের ছোট বোনটি এতক্ষন আমাদের কথা শুনছিলো, ফোকলা দাঁত বের করে রায় দিলো, চাচ্চু, ডাক্তাররা ভালোনা, শুধু টাকা চায়। মানুষের অসুখের কষ্ট হলে কি টাকা নিতে হয়?

বুঝলাম, শেরে বাংলা, মানিক মিয়া আর অশ্বিনী কুমার দত্তের বরিশাল বদলায়নি একটুও। না বদলিয়েছে প্রকৃতি- না বদলিয়েছে বরিশালের মানুষ – শিশু থেকে বুড়ো। কেউ বদলায়নি। সবার মুখেই সেই টগবগে কথা।

সূত্র-

সৃজনের বরিশাল।
সৃজন বরিশাল জিলা স্কুলে ক্লাস থ্রীতে ভর্তি হবার চেষ্টা করছে। পড়াশুনা ভালোই করেছে কিন্তু কোভিডের কারণে…

Posted by Arifur Rahman on Friday, March 19, 2021

 

সর্বাধিক পঠিত