প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নিঝুম মজুমদার: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কী ধরনের সংষ্কার চাই?

নিঝুম মজুমদার: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কী ধরনের সংষ্কার চাই? এগুলো নিয়ে আসলে কথা হলেও কেউই বিস্তারিত বলেন না যে কেন বাতিল চান, আবার ঠিক কী কী সংস্কার চান (অন্তত আমি দেখিনি)। আমার মনে হলো এ বিষয়ে আমার প্রস্তাবগুলো আমি ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান [ধারা ১২(২)] মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর পেশ করতে পারি। সে ইচ্ছে থেকেই আমার কয়েকটি প্রস্তাব। এ প্রস্তাবগুলো-ই শেষ নয় হয়তো। আপাতত জরুরি যেসব ধারা মাথায় যা এসেছে সেগুলোর প্রেক্ষিতে আমার প্রস্তাব লিপিবদ্ধ করছি। পরিবর্তন-পরিবর্ধন-পরিমার্জন- হতে পারে। (১) ধারা ৮-এ বর্ণিত ‘নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে’ শব্দগুলোর ব্যখ্যা স্পষ্টভাবে দেওয়া যেতে পারে। এই একই সঙ্গে কেন হুমকি সৃষ্টি করেছে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মনে করেছেন সেটির একটি ব্যখ্যা প্রকাশ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে কিংবা প্রকাশ্যে না দিলে, যার বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদেরকে জানানো যেতে পারে।

(২) ধারা ৫(ঘ) এই বর্ণিত ‘সরকারের অনুমোদন গ্রহণক্রমে’ শব্দটিতে স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে সরকারের ঠিক কোনো বিভাগের এবং কোনো পদমর্যাদার ব্যক্তির অনুমোদন গ্রহণক্রমে হতে হবে। (৩) ধারা ১৩ তে যেসব উপধারা রয়েছে, সেগুলো সত্ত্বেও সেখানে এই আইনের অধীনে একজন মুখপাত্র নিয়োগ করবার বিধি রাখা যেতে পারে যিনি বছরে তিনবার অর্থ্যাৎ প্রতি ৪ মাস অন্তর অন্তর এই আইনে কতোটি মামলা হয়েছে, মামলার সার্বিক অবস্থা, কতোজন গ্রেফতার, বিচার কতোদূর এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ব্রিফ আকারে প্রকাশ করবেন।(৪) ধারা ২১ এ বর্ণিত ‘প্রোপাগান্ডা’ বলতে কী বুঝায় সেটিকে বিশদভাবে ব্যখ্যা করা যেতে পারে।(৫) ধারা ২১-এ বর্ণিত ‘জাতির পিতা’ শব্দটির পরে ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান নামটি স্পষ্ট আকারে সংযুক্ত করা যেতে পারে।

(৬) ধারা ২১-এ বর্ণিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলতে যে ব্যখ্যা ধারা ২(প) তে বর্ণিত হয়েছে, সেটিকে আরও অনেক বিশদভাবে ব্যখ্যা করা যেতে পারে

(৭) ধারা ২৫- এর (ক) বর্ণিত ‘আক্রমণাত্নক’, ‘ভীতি প্রদর্শক’, ‘মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও’,  শব্দ ও শব্দগুলোর বিস্তারিত ব্যখ্যা দেওয়া যেতে পারে। এসব শব্দ খুব বিমূর্ত কিংবা অনেক ব্যখ্যার দাবি রাখে যদিও কিন্তু আইনে কিছুটা হলেও দিক নির্দেশনা রাখা যেতে পারে।(৮) ধারা ২৫ এর (খ) তে বর্ণিত ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ ‘সুনাম ক্ষুন্ন’ ‘বিভ্রান্তি ছড়াইবার’ ‘অপঃপ্রচার’ শব্দ কিংবা শব্দগুলোর বিশদ ব্যখ্যা দেওয়া যেতে পারে। (৯) ধারা ২৬ (১) এ বর্ণিত অপরাধ কী অনুসন্ধান মূলক গবেষণা অথবা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে রহিত করা যেতে পারে? একই সঙ্গে যদি সাংবাদিক বা গবেষকদের এ অপরাধের আওতামুক্ত রেখে, যিদি পরবর্তীতে প্রতীয়মান হয় তারা ভুল তথ্য দিয়েছেন সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখলে একটি চেক এবং ব্যালেন্স হতে পারট বলে আমার অভিমত।(১০) ২৭ ধারায় বর্ণিত ‘সাইবার সন্ত্রাসী’ কারা এটির একটি সঙ্গা দেওয়া যেতে পারে(১১) ধারা ২৮ শে বর্ণিত ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ’ বা ‘অনুভূতিতে আঘাত’ এই দুইটি বিষয়কে বিশদ বর্নণা কিংবা একটি সুনির্দিষ্ট গাইড-লাইন প্রনয়ন করা যেতে পারে। (১২) ধারা ২৯  শে বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রচার ও প্রকাশ যে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ইত্যাদির বিরুদ্ধেও হতে পারে তা নির্দিষ্ট করে লিখে দেওয়া যেতে পারে (১৩) ধারা ৩১ শে বর্ণিত প্রতিটি শব্দেরই সু-স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সেগুলোর প্রেক্ষিতে আলাদা করে একটা বুকলেট, গাইড লাইন প্রনয়ন করলে সাধারোন মানুষ একটি নির্দেশনা পেতে পারে যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতি, অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। এতে করে রাষ্ট্র বলতে পারবে যে, তারা সাধারোন জনতাকে স্পষ্ট করে বুঝাবার জন্য একটা গাঈদলাইন ও নির্দেশনা দিয়েছে এবং এতে করে অপরাধ প্রতিরোধে তাদের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটবে।

(১৪) ধারা ৩৪ এর ক্ষেত্রে ‘হ্যাকিং’ এর যে সঙ্গা উপধারা ২ (ক) ও (খ) তে দেওয়া হয়েছে সেটি আরও বেশি বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। উপধারা ২(খ) তে বর্ণিত ‘প্রবেশের মাধ্যমে ক্ষতিসাধন’  শব্দগুলোর সঙ্গে’ হ্যাকিং করে ক্ষতিসাধন না হলেও, বাকটি যোগ করা যেতে পারে (১৫) ধারা ৪০ এ বর্ণিত তদন্তের সময় সুনির্দিষ্ট হতে হবে এবং সেই সময়ের পর ‘অবশ্যই’ তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে হবে বলে আইনে রাখা যেতে পারে অন্যথায় তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রভিশন রাখা যেতে পারে। সেটি আর্থিক দন্ডও হতে পারে কিনা তেমন ভাবা যেতে পারে।(১৬) ৪০ ধারায় বর্ণিত তদন্তের সময় ১০৫ দিন কমিয়ে সেটিকে ৯০ দিন করা যেতে পারে। তিন দফায় ৩০ দিন করে তিনবার সময় বাড়াতে পারবে এবং কেন সময় বাড়াচ্ছে সেটি অবশ্যই বিশদ আকারে আদালতকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়কে জানাতে হবে। ৯০ দিনের ভেতর তদন্ত রিপোর্ট জমা না দিলে অভিযুক্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘জামিন’ দিতে হবে বলে আইনী প্রভিশন রাখা যেতে পারে।(১৭) ৯০ দিনের ভেতর তদন্ত রিপোর্ট জমা না দিলে তদন্তকারী কর্মকর্তাওকে শাস্তির আওতায় এনে, অভিযুক্তকে মুক্তি দিয়ে নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে যার জন্য সময় বরাদ্দ থাকবে ২০ ক্যালেন্ডার দিন। এর মধ্যে তদন্ত শেষ না করতে পারলে মামলা খারিজ হয়ে যাবে বলে আইনী প্রোভিশন রাখা যেতে পারে একই সঙ্গে অভিযুক্তকে হয়রানী করবার অপরাধে বাদী, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট থানার প্রধানকে উচ্চ মূল্যে আর্থিক দণ্ড দেওয়া যেতে পারে যেই টাকা অভিযুক্ত পাবে। একই সঙ্গে আদালতের সময় নষ্ট করবার জন্য ওই একই পার্টিজ কে একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হতে পারে বলে আইনি বিধান যোগ করা যেতে পারে।(১৮) ধারা ৪১ (১) (গ) তে উল্লেখিত ‘অন্যান্য কার্য’ কী সেটার সু-স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে।(১৯) অভিযুক্তের যেসব ডিভাইস, মালামাল তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিজের আয়ত্বে নেবেন,

তিনি অবশ্যই বন্ড সাক্ষর দিবেন যে, এই মালামালের কোনো ক্ষতি সাধন হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এসব মালামালের আর্থিক মূল্যও জব্দ তালিকাতে স্পষ্ট লিখে রাখতে হবে এবং পরবর্তীতে এসব মালামালের ক্ষতিসাধন হলে অবশ্যই সেটার দ্বিগুন মূল্য ফেরত দিতে হবে।(২০) এই আইনে নিয়োগ-প্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তার অবশ্যই একটি বা কয়েকটি বিশেষ কোর্স সম্পন্ন থাকতে হবে বলে আইনী প্রোভিশন রাখা উচিৎ। যেমন ফরেনসিক টেস্ট, জব্দকৃত মালামাল হ্যান্ডলিং-এর কোর্স, তদন্ত কিভাবে করতে হয় সেটির কোর্স ইত্যাদি। (২১) এই আইনের ৪৩ ধারাটি পুরোপুরি বাদ দিতে পারলে ভালো হয়। পরোয়ানা ব্যাতিরিকে তল্লাসির ক্ষমতার দুই একটা গুন হয়তো আছে কিন্তু এর খারাপ বা অপঃব্যবহারের দিকটাই বেশি। ফলে অপঃব্যবহার রোধে, এই ধারাটি বাতিলের ভাবনা রাষ্ট্র করতে পারেন।

(২২) যদি এ পরোয়ানা ব্যতীত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতেই হয় তাহলে গ্রেফতার করবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে মুচলেকার বিনিময়ে ‘অবশ্য-ই’ মুক্তি দিতে হবে, এমন বিধান রাখা যেতে পারে।(২৩) ধারা ৪৭ শে বর্ণিত যে অংশ রয়েছে, সেখানে এমন বিধান যুক্ত করা যেতে পারে যে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ না হলে যারা তথ্য দিলেন বা সেবা প্রধান করলেন তাদেরকে উক্ত অভিযুক্তকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

(২৪) ৫২ ধারায় বর্ণিত বিচারের সময় সীমা অবশ্যই সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে এবং সেই সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে, মামলা খারিজ হয়ে যাবে বলে আইনী প্রোভিশান থাকতে হবে। তবে এই ক্ষেত্রে যদি অভিযুক্ত অসুস্থ থাকে, অভিযুক্তের কোনো কারনে বিচার বিল্মবিত হয় তাহলে পুরে বিচারের বেঁধে দেওয়া সময়ের সঙ্গে এসব বিলম্বিত সময় যুক্ত হবে না।

(২৫) সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না করতে পারলে কেন তিনি পারলেন না, এটা ব্যখ্যা করবার বিধান ৫২(৩) ধারাতে বলা থাকলেও, এখানে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রাখা যায় কিনা এটা ভাবা যেতে পারে। এ ব্যাপারে আমি কিছুটা ‘লিনিয়েন্ট এপ্রোচ’ রাখবো। তবে বিচারের পুরোটা সময় অভিযুক্ত যদি উক্ত বিচারের জন্য, দেশের জন্য বা অভিযোগকারীর জন্য কোনো ধরনের হুমকি না হয়, তাহলে তিনি ‘অবশ্যই’ জামিনে থাকবেন, এমন প্রোভিশান রাখা যেতে পারে(২৬) ধারা ৫৩ (ক), (খ)-তে বর্ণিত সমস্ত অপরাধ কিংবা এ আইনে বর্ণিত সমস্ত অপরাধের অভিযোগ উঠলে সেগুলোকে ‘জামিন যোগ্য’ করবার বিধান রাখা যেতে পারে(২৬) ধারা ৫৬ তে বর্ণিত ‘অন্যকোনো ব্যক্তি’ কে সেটার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে। (২৭) ধারা ৫৭ তে বর্ণিত ‘ইমিউনিটি’/ ‘দায়মুক্তি’ প্রোভিশন বাতিল করা যেতে পারে। অভিযুক্ত যদি নিরপরাধ হিসেবে মুক্তি পান তাহলে তিনি অভিযোগকারী, তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা বিচারপতি ছাড়া বাকি সমস্ত সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তা বা কর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারী মামলা করতে পারবেন, এমন প্রোভিশন এই আইনে রাখা যেতে পারে। (২৮) বিধি প্রণয়ন কী কী বিষয়ে করতে পারবে এটি ধারা ৬০(২) তে লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। তবে এটিকে সুনির্দিষ্ট করে এর চৌহদ্দী সংকোচিত না করে, যেকোনো বিষয়ে বিধি, গাইডলাইন, নীতি প্রনোয়ন করতে পারবে বলে প্রোভিশন রাখা যেতে পারে। এ আইনের ১ থেকে ৬০ ধারা পর্যন্ত রিভিউ করে এগুলোই আপাতত মাথায় এলো। আমার এই প্রস্তাবের পক্ষ/বিপক্ষ থাকবে। আমার চিন্তার ক্ষুদ্রতা থাকতে পারে, আমার চিন্তার দুর্বলতা থাকতে পারে। আমি এসব মেনে নিয়েই একটা আলোচনা কিংবা প্রস্তাব তুলে ধরেছি। আবার কিছু মাথায় এলে সংযুক্ত করে নেবো। তবে আলোচনা চলুক। আলাপ চলুক। কথা হোক। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত