প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন ক্যাভিটিস, কেন এ দন্তীয় অবক্ষয় সমাজে!কী সেই মধ্যরাতের কেলেংকারি!

ডেস্ক রিপোর্ট : জনপ্রিয় উপস্থাপক, সংবাদ পাঠিকা ও লেখিকা পারমিতা হিম তার ফেসবুক পেজে দন্তবিষয়ক অদ্ভুত ও মনোমুগ্ধকর একটি লেখা পোষ্ট করেন। পোষ্টটি আমাদেরসময়.কমের পাঠকদের জন্য নিচে দেওয়া হলো:

যতবার দাঁতের ডাক্তারের রক এন্ড রোল চেয়ারে শুয়ে পড়ি, ততবারই ভাবি আর কোনোদিন এখানে আসব না। দাঁত খুলে পড়ে যাক--তবুও না। কী জানি কম্পেস্ট ব্যবহার করে ওরা, আর দাঁতের ভেতরে ড্রিল-- ওই আওয়াজ, গন্ধ, রক্তভেজা তুলা আর কাঁচের ভেতর থেকে শয়তানের চোখের মত চেয়ে থাকা কম পাওয়ারের বাল্ব-- সব মিলায়ে আমার কাছে মনে হয় এটা লাশকাটা মর্গে শুয়ে থাকা, ডাক্তারের চেয়ারে না।

ডাক্তার আমার গালে একটা নল রেখে হাঁ করায়ে ওর মনে যত জ্বালা ছিল তা দিয়ে দাঁত গুতাচ্ছে আর আমি ভাবতেছি--আর কোনদিন আসব না এখানে, বাবারে,
প্রথমে- ভগবান তুমি বিরাজ কর,
এরপর- আমাকে তুমি রক্ষা কর,
তারপর- আমার তোমাকে লাগবে না, ইউ ক্যান এক্সিস্ট ইন পিস...
আর এমন সময় ডাক্তার বলল, আপনার দাঁতের অবস্থা তো খুবই খারাপ! এমন হল কেন? ফাস্টফুড বেশি খান?
আমি নল লাগানো অবস্থায় কথা কিভাবে বলল?
কোনোরকমে মাথা ডানে বামে নেড়ে, ঘোড়ার মত চিহি চিহি শব্দে বলার চেষ্টা করলাম 'না' 'না' 'না'।

বাস্তবিক অর্থে শুধু ফাস্টফুড কেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের নব্য পয়সা হওয়া ধনী ব্যক্তিদের ছেলেমেয়েরা এ দোকানে, সে দোকানে কিংবা অনলাইনে মুরগিপ্রধান যেসব খাবার গোগ্রাসে গিলতে থাকে; না ওসব খাওয়ার রুচি আমার কোনদিন হয়, না আমি সামাজিক রুচি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যা কিছু 'ট্রেন্ড' তা করতে দৌড়াই। মুরগি, তা সে যার সাথেই মিশ্রিত হোক, এরকম জঘন্য খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমার কোনোকালে ছিল না, আর হবার বয়স আছে বলেও মনে হয় না।

কিন্তু ডাক্তার তা মানবে কেন? মানুষের কথা বিশ্বাস না করাই যে এখন আরেক 'ট্রেন্ড', তাই সে নাক মুখ ঘুরিয়ে খুব নাটক করে আমার দাঁতে একটা গুঁতা দিয়ে বলল-- তাহলে নিশ্চয়ই সফট ড্রিংকস, কোক-ফানটা- সেভেন আপ খান, ওগুলা খুব ক্ষতি করে দাঁতের।

আমিই বা কেন মানব? কোক-ফানটা দূরের কথা--শেষ কবে চিনির শরবত খাইছি জীবনে সেইটাও তো আমার মনে নাই!
আমি দোর্দণ্ড প্রতাপে মুখে নলসহ আমার মস্তক ডানে-বামে, ডানে-বামে করতে করতে বললাম--না, না, না, কখনো খাই না। (শোনাল--লা, লা, লা, কখলো খালালালা)

ডাক্তার ভুরু কুঁচকে বলল, তাহলে তো খুবই চিন্তার বিষয়। কেন ক্ষয়ে যাচ্ছে দাঁতগুলি? রহস্যজনক ব্যাপার। আপনি কি দিনে দুইবার ব্রাশ করেন?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম, হ্ল।
ডাক্তার বলল, ফ্লস করেন?
আমি, হ্ল।
ডাক্তার বলল, তাহলে তো এমন হবার কথা না! দেখি আরো জোরে হাঁ করেন।
বলে গভীর আগ্রহ নিয়ে আমার দাঁতের ভিতর ঢুকে গেল।
আমি আরেক গ্রহে আমার চিন্তার নভোযান ল্যান্ড করায়ে ভাবতে লাগলাম কেন আমার দাঁত ক্ষয়ে যাচ্ছে!

আমি ফ্লস করি, দাঁত মাজি, মিষ্টি খাই না, খাবার খাই কম, এমনকি প্রায় বেলা খাই-ই না—সেটা নিয়ে আবার অন্য প্রবলেমে পড়ি—তাহলে কি আমার দাঁত চায় আমি একেবারে আমরণ অনশনে চলে যাই? দুনিয়াতে যে কাজের জন্য তাকে পাঠানো হইছে, যা না করলে সে নরকে যাবে আর করলে স্বর্গ নিশ্চিত—সে চপচপ, কচকচ, কাটুম-কুটুম অর্থাৎ খাদ্য চাবানোর কাজ করতে তার অস্বীকৃতি? তবে কি এই দন্তসমূহ স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চাইতেছে? বিদ্রোহ ঘোষণা করতেছে?

এমন সময় মনে পড়ল মধ্যরাতের কথা। প্রায় প্রতি মধ্যরাতে, ব্রাশ করে বালিশে মাথা রেখে দু চোখ মুদে আসার ঠিক আগে ওয়েল ফুডের শন পাপড়ি, সুইজারল্যান্ডের টবলরোন, বম্বে সুইটসের ডাল মুট আর বাপের পাঠানো আমেরিকান অ্যালপেনলিবে খাওয়ার জন্য প্রাণ যে আইঢাই-আইঢাই করা শুরু করে... তারপর এগুলা না খাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই যে দুই চোখের পাতা এক হতে চায় না, অগত্যা তাদের কাছে পরাস্ত হয়ে রান্নাঘরে ছুটে গিয়ে বয়াম হাতে ছুটে আসি বিছানায়। প্রথমে চানাচুর, তারপর শন পাপড়ি, তারপর থাকলে মি. টুইস্ট, তারপর টোবলরন, তারপর অ্যালেপনলিবে মুখে দিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে—সকালে তো দাঁত মাজবোই—এই ভেবে যে শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে পড়ি—এইটুকু মনে আসতেই মঙ্গল গ্রহ থেকে আমার নভোযান ডাক্তারের রক্ত ছিটানো সার্জিকাল মাস্কের উপরে ল্যান্ড করল।

মুখ খুলে নব্য আবিস্কৃত লারেলাপ্পা ভাষায় একবার তাকে বলতেও চাইলাম-- কেন ক্যাভিটিস, কেন এ দন্তীয় অবক্ষয় সমাজে!কী সেই মধ্যরাতের কেলেংকারি!

কিন্তু হারামজাদা ডেন্টিস্ট আমার মুখে নল ঠুসে, ইনজেকশনের মত দেখতে একটা লোহা নিয়ে এতই মনোযোগ দিয়ে আমার দাঁতের পাথর গবেষণায় ব্যস্ত যে তার চকচক চোখে ভবিষ্যত রুট ক্যানেল, ক্যাপ, পার্মানেন্ট ফিলিং, টেম্পরারি ফিলিং,ব্রিজ এবং সার্জারির নাম করে আমার পকেটের কোটি কোটি টাকা হাতানোর স্বপ্নে চকচক করে ওঠা চক্ষুভাষার পুরোটাই যে আমি পড়ে ফেললুম—এ বিষয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপই দেখা গেল না।
পারমিতা হিম
৩/৩/২০২১

 

ডেনটিস্ট--

যতবার দাঁতের ডাক্তারের রক এন্ড রোল চেয়ারে শুয়ে পড়ি, ততবারই ভাবি আর কোনোদিন এখানে আসব না। দাঁত খুলে পড়ে...

Posted by Paromita Heem on Wednesday, March 3, 2021

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত