প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. লেলিন চৌধুরী:  লেখকের মৃত্যু এবং প্রজ্জ্বলিত তারুণ্য

ডা. লেলিন চৌধুরী: তরুণদের কারাগারে পাঠানো হলো। তারা কি খুব ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক? তারা মুক্ত থাকলে কি জনপদ তছনছ হবে, ঘরবাড়িতে আগুন জ্বলেবে, মানুষের জীবন বিপন্ন হবে? কোনো সাংঘাতিক কাজের জন্য তাদের কারাগারে পাঠানো হলো? মুশতাক আহমেদ নামের এক উচ্চশিক্ষিত লোক বিদেশের লোভনীয় জীবন ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। তিনি প্রথমবারের মতো দেশে বাণিজ্যিকভাবে কুমিরের চাষ শুরু করেন। প্রায় ৬৫টির মতো কুমির বিদেশে রপ্তানিও করেছিলেন। সঙ্গে লেখালেখি করতেন। ‘কুমির চাষের ডায়েরি’ নামে একটি বই লিখেছে। সে ‘মাইকেল কুমির ঠাকুর’ নামে ফেসবুকে একটি পাতা পরিচালনা করতো। ফেসবুকে কিছু সমালোচনামূলক লেখালেখি করেছেন। এজন্য প্রায় সাড়ে নয় মাস আগে তাকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ছয়বার তার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জেলবন্দী সেই মানুষটি ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত আটটার দিকে দুম করে মারা যায়। আগের দিন তাকে আদালতে নেওয়া হয়েছিলো। তখনো সে পূর্ণ সুস্থ। মুশতাকের হঠাৎ মৃত্যু দেশের অধিকাংশ  মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

প্রধান প্রশ্নটি হলো এটা ক হত্যা না স্বাভাবিক মৃত্যু? ক্ষুব্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের নীরবতাকে ভাষা দিয়ে ওই তরুণেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলে প্রতিবাদী মিছিলে মিলেছিলো। তারা কি চায়? ওই তরুণেরা লেখক হত্যার বিচার এবং যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে মুশতাককে আটক করা হয়েছিলো সেটির বাতিল চায়। এই আইনে পুলিশকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একজন পুলিশ অফিসার মনে করলে যেকোনো ব্যক্তিকে এই আইনের অধীনে আটক করতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পদদলিত করা হয়েছে। ওই তরুণদের পরিচয় কী? তারা আমাদের সন্তান এবং অনুজ। তারা লেখাপড়া করে। তারা সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে পারে। তাদের মাথায় এখনো পঁচন ধরেনি। বিবেকবোধ এবং মস্তিষ্ককে তারা কারও কাছে বন্ধক দেয়নি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, মহামারীসহ সমস্ত দুর্বিপাকে তারা মানুষের পাশে দাঁড়ায়, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। নির্যাতিতের পক্ষ নিয়ে সবলের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সীমাহীন সাহসে ওর সমৃদ্ধ। যেকোনো রক্তচক্ষুর চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদ জানানোর দুঃসাহস তাদের রক্তস্রোতে প্রবহমান। তারা নতজানু এবং পদলেহী নয়। এই তরুণেরা আমাদের শ্রেষ্ঠ অংশ। তাদের প্রতিবাদী মিছিলে জীবনকে নৃত্যরত দেখেছি। ‘কালবৈশাখীর হবে যে নাচন/সঙ্গে নাচুক মরণ ও বাঁচন’ এরকম নৃত্যছন্দে তারা উষ্ণ এবং জীবন্ময়। তাদের কারাগারে নেওয়ার দৃশ্য দেখলাম। তরুণ হাতগুলো  শিকলে আটকানো। কিন্তু তাদের সবার মুখে বিজয়ীর হাসি। দৃষ্টি সামনে প্রসারিত। বন্দী হাত তুলে তারা শিকল ভাঙ্গার গান গাইছে। তারা বুঝতে পেরেছে কণ্ঠরোধকদের  ভেতরে ভয় বাসা বেঁধেছে।

সমালোচনামূলক লেখার জন্য মুশতাককে আটক করা হয়েছিলো। এর দ্বারা অন্য সবাইকে ভয় পাইয়ে দেওবার প্রয়াস ছিলো। মানুষকে ভয় দেখিয়ে কণ্ঠরোধ করার প্রচেষ্টায় কেউ কখনো সফল হয়নি। তরুণদের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। দিব্যচোখে দেখতে পেলাম একজন কাজী নজরুল ইসালাম তাদের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে গাইছে-‘তোদের বন্ধ কারায় আসা/মোদের বন্ধী হতে নয়/ওরে ক্ষয় করতে আসা/মোদের সবার বাঁধন ভয়/এই বাঁধন পরেই বাঁধন ভয়কে /করব মোরা জয়’। নজরুল ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে, আমরা স্বাধীন স্বদেশে রয়েছি। ‘শিকল পরা ছল ‘গানটি রচনার পর প্রায় শতবছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু মানসিকভাবে আমাদের শাসকেরা শতবছর পশ্চাতে পড়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে মানুষকে অনুগত ভেড়া বানানোর প্রবল প্রবনতা বিরাজমান। হে মোর দুর্ভাগা দেশ আলোকখন্ডের মতো উজ্জ্বল তোমার তরুণ সন্তানদের জন্য অনিঃশেষ ভালোবাসা। লেখক : প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত