প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ওড়নার গিটেই লুকিয়ে ছিল নুপুর হত্যা রহস্য!

সুজন কৈরী: আদালতের নির্দেশে দায়িত্ব পাওয়ার ১১ দিনের মাথায় রংপুরের নীলফামারী এলাকায় আট বছরের শিশু নুরানি আক্তার নুপুর হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রংপুর জেলা কার্যালয়। সেই সঙ্গে গ্রেপ্তার কার হয়েছে শিশুটির ঘাতককেও। গ্রেপ্তার ব্যক্তি হলেন- নিহত শিশুর বাবা নুর মোহাম্মদ।

পিবিআই জানিয়েছে, গত বছরের ৩ এপ্রিল সৈয়দপুরের রসুলপুর রেল কোয়ার্টারের একটি বাসা থেকে নুপুরের লাশ উদ্ধার করে নীলফামারী থানা পুলিশ। এ ঘটনায় শিশু নুপুরের বাবা থানায় অপমৃত্যু এবং পরে পুলিশ বাদি হয়ে হত্যা দায়ের করে।

পিবিআই আরও জানায়, ঘটনার দিন (শুক্রবার) জুম্মার নামায পড়ে স্ত্রী সন্তানসহ নিজ ঘরে গল্প করছিলেন ঘাতক পিতা নুর মোহাম্মদ। ওই সময় স্ত্রী তার ছোট সন্তানসহ ঘুমিয়ে পড়েন। তার বড় সন্তান নুপুরসহ নুর মোহাম্মদ পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। এক সময় তিনিও ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে জেগে আসরের নামায পড়ার সময় তিনি দেখতে পান, তার কন্যা মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে আছে। তিনি আর্তচিৎকার করেন এবং স্ত্রীসহ কন্যাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এমন একটি গল্প দিয়ে নুর মোহাম্মদ শুরু করেছিলেন। কিন্তু পিবিআই’র ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে কন্যাকে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি।

পিবিআই জানায়, থানায় দায়ের হওয়া মামলাটি দীর্ঘ ১০ মাস তদন্তের পর ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরে মামলাটি পিবিআইকে হস্তান্তরের জন্য আদালতে আবেদন করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআই রংপুর জেলাকে নির্দেশ দেন। এরপর পিবিআই মামলার তদন্তভার গ্রহন করে এবং এসআই নুরে আলম সিদ্দিকের উপর তদন্তভার অর্পন করে। তদন্তভার গ্রহন করে মামলা সংশ্লিষ্ট আলামত ১টি নীল রংয়ের লেহেঙ্গার ওড়না জব্দ করে তদন্তকারী কর্মকর্তা। সেই সঙ্গে পিবিআই রংপুরের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেনসহ একটি অভিজ্ঞ টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় ও আলামত ওড়নায় দেয়া গিট দেখে পিবিআই পুলিশের সন্দেহ হয়। এরপর শিশুটির পিতা নুর মোহাম্মদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে যান।

পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ পিবিআই’র অভিজ্ঞ টিম শিশুটির বাবাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় নুর মোহাম্মদ জানান, তার মেয়ে খেলতে গিয়ে মারা গেছে। কখনো বলেন তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। পিবিআই’র সন্দেহ হয় ৮ বছরের একটি শিশু ওড়নায় এরকম গিট দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। ঘটনাস্থলের অবকাঠামো, ওড়নার গিট ও কাপড় শুকানোর হালকা রশিতে কখনোই শিশু নুপুরের আত্মহত্যা সম্ভব নয়। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিজ্ঞান সম্মত জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ঘাতক বাবা নুর মোহাম্মদ জানান, তিনি সৈয়দপুরের রসুলপুর রেল কোয়ার্টারে স্ত্রী সন্তানসহ ৫ থেকে ৬ বছর ধরে থাকেন। ঘটনার দিন জুম্মার নামাজ শেষে তার মেয়ে নুরানি আক্তার নুপুর ও তার ছোট ছেলে সাত বছরের আবু সোহানসহ খাবার শেষে বাড়ির মেইন গেইট ও ঘরের দরজা বন্ধ করে কোয়ার্টারের উত্তর দিকের ঘরে গল্প করছিলেন। এ সময় তার ছোট ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। নুর মোহাম্মদ ছেলে-মেয়েকে বকাঝকা করেন। এরপর মেয়েকে নিয়ে পাশের ঘরে টিভি দেখতে যান। নুপুর টিভি দেখছিল এবং নুর মোহাম্ম্দ এনড্রয়েড মোবাইল ফোনে ব্যস্ত ছিলেন। ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর নুপুর মোবাইল ফোনটি চায়। এজন্য নুর মোহাম্মদ মেয়েকে ফোন না দিয়ে ধমক দেন। কিন্তু এরপরও নুপুর মোবাইল ফোনের জন্য জেদ ধরলে এবং তার বাবাকে গালিগালাজ করে। এতে নুর মোহাম্মদ ক্ষিপ্ত হয়ে নুপুরের গলা চেপে ধরেন। কিছুক্ষন পর নুপুর নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং মারা যায়। মেয়ের মৃত্যু হলে ঘাতক বাবা ঘরের মধ্যে কাপড় শুকানোর রশিতে নুপুরের লেহেঙ্গার ওড়না বেধে আত্মহত্যার ঘটনা সাজান এবং আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন।

পিবিআই’র রংপুর কার্য়ালয়ের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন জানান, দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় শিশু নুপুর হত্যার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। ঘাতক পিতাকে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে আসামি নুর মোহাম্মদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

সর্বাধিক পঠিত