প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডঃ মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান: জাপানের পড়াশুনা এবং চাকুরীর সুযোগ

ডঃ মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান: দেশের বাইরে পড়াশুনা এবং চাকুরী করতে কে না চায়? তার উপর জাপানের মত উন্নত দেশ হলে আর কোন কথা নাই। কিন্তু কিভাবে জাপানে পড়াশুনার ভিসা পাব? জাপানে পড়াশুনা করার জন্য কি ধরণের ভিসা হয়? কি ভাবে সেই ভিসা পাওয়া যাবে? কোথায় যেতে হবে? কি করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন আমাদের কাছে তাই না? আজ আপনাদের এই সকল প্রশ্ন নিয়ে কথা বলব।

জাপানে সাধারনত ছাত্রদের জন্য দুই ধরণের ভিসা হয়। একটা হচ্ছে কলেজ ছাত্র (College Student) ভিসা আর একটা হচ্ছে প্রি-কলেজ ছাত্র (Pre-college Student) ভিসা। তবে বর্তমানে Pre-college Student ভিসার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এই ভিসায় সাধারনত জাপানিজ ভাষা শেখার স্কুল কিংবা ডিপ্লোমা ছাত্রছাত্রীদের জন্য ছিল। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জাপানিজ স্কুল এবং ডিপ্লোমা কলেজের ছাত্রদের জন্যও College Student ভিসা দিয়ে থাকে। আর College Student ভিসার বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েশন থেকে পি এইচ ডি লেভেলে, ডিপ্লোমা কলেজে, জাপানিজ স্কুলে পড়াশুনা করে থাকে। টপ লেভেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে জাপানিজ স্কুলের ছাত্রছাত্রী যারাই College Student ভিসা পায় তারা সবাই জাপানের ভেতরে মুটামুটি সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকে।

জাপানে পড়াশুনা করতে আসা বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে, এবং জাপানীজ ভাষা শেখার স্কুলে প্রতি বছর (এপ্রিল এবং অক্টোবর) দুটি সেশনে এসে থাকে। বাংলাদেশ থেকে যারা জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরড়াশুনা জন্য আসেন তাদের একটা বড় সংখ্যা হচ্ছে বাংলাদেশের উচ্চপদস্ত সরকারী কর্মকর্তা অথবা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এরা সবাই পোষ্ট-গ্রাজুয়েশনের (মাস্টার্স অথবা পি এইচ ডি) প্রগ্রামের জন্য জাপানে আসেন। বাংলাদেশের সরকারী কর্মকর্তা অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সবাই জাপান সরকারের অথবা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে আসেন। এই সকল শিক্ষা বৃত্তি পরিমান সাধারণত জাপানী ১,৪৭,০০০ ইয়েন হয়, যা তাদের জাপানে জীবন যাপনের জন্য দেয়া হয়। এই শিক্ষা বৃত্তি প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন প্রকার ফি প্রদান করতে হয় না। এই শিক্ষা বৃত্তি জন্য বাংলাদেশ থেকে সরাসরি প্রোফেসর, বিশ্ববিদ্যালয়, নিজ নিজ কর্মরত প্রতিষ্ঠান অথবা জাপান দুতাবাস হয়ে আবেদন করতে হয়। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অথবা পি এইচ ডি করতে হলে প্রথমেই তাকে প্রোফেসর ঠিক করতে হবে। যে প্রোফেসর তাকে ছাত্র হিসেবে গ্রহন কতে চান তার গবেষণার বিষয় এবং যে ছাত্র হতে চান তার গবেসষণার বিষয়ে অবশ্যই মিল থাকতে হবে। এরপর ঐ প্রোফেসরের সহযোগিতায় ভর্তি এবং ভিসার সকল প্রসেসিং করতে হবে। এজন্য জাপানী প্রোফেসর এবং কর্মরত প্রতিষ্ঠান যদি ঠিক থাকে তাহলে ভর্তি এবং শিক্ষা বৃত্তি পেতে তেমন কোন সমস্যা হয় না। এছাড়া অতি অল্প সংখ্যক বাংলাদেশী যারা নিজ খরচে জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অথবা পি এইচ ডি করতে আসেন। এদের জন্য অনেক সময় দেশের ফাইনান্সিয়াল সনদ জাপানে এবং জাপান দূতাবাসে দেখাতে হয়।

গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রামে সরাসরি বাংলাদেশ থেকে খুব বেশি ছাত্রছাত্রী আসে না। যারা আসেন তারা সবাই ইংলিশ প্রোগ্রামে এসে থাকেন। জাপানের টপ লেভেলের সরকারী ও বেসরকারি ১৩ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল থার্টি (Golbal 30) নামে একটি প্রোগ্রাম আছে। এই প্রগ্রামে জাপানে এবং জাপানের বাইরে ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি ভাষায় গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রাম শেষ করতে পারে। এই প্রোগ্রামে প্রতি বছর ইউরোপ আমেরিকা থেকে অনেক ছাত্র আসে কিন্তু আমাদের দেশের ছাত্রদের তেমন দেখা যায় না। এই গ্লোবাল থার্টি প্রোগ্রামের জন্য বাংলাদেশের জাপান দুতাবাসে যোগাযোগ করতে হবে। এই প্রোগ্রামের ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই শিক্ষা বৃত্তি পেয়ে থাকে আবার অনেকে নিজ খরচে পরড়াশুনা করে থাকে। তবে জাপানের অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও ইংরেজি ভাষায় গ্রাজুয়েশন করার সুযোগ আছে। যেখানে কিছু বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী প্রতি বছর এসে থাকে। এদের শিক্ষা বৃত্তি ধরণ একেক জনের একেক রকম। জাপানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশীর ভাগ বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য টিউশন ফির ৩০% থেকে ১০০% মউকুফ করা হয়ে থাকে। বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া অবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষা বৃত্তি আবেদন করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষা বৃত্তি এবং টিউশন ফি মউকুফ হয়ে থাকে। এছাড়াও জাপানে অবস্থানরত বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা পার্ট-টাইম কাজ করার অনুমতি পায় যা দিয়ে অনেকেই জাপানের জীবন যাপনের খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি দিতে পারে। আবার অনেকেই ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করে ভিসার সময় বিপদে পড়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি যারা ছাত্র কিংবা গবেষক হিসেবে আসেন তারা অনেকেই জাপানী ভাষা ভাল জানে না বলে জাপানের স্থানীয় কোম্পানি গুলোতে চাকুরীর সুযোগ তাদের জন্য অনেকটাই কম থাকে। তবে এর মধ্যে অনেক বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা ভাল জাপানী ভাষা শেখে জাপানের বড় কোম্পানিতে ভাল চাকুরীও করেন । আবার অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে যারা জাপানী ভাষা না জানলেও গবেষক হিসেবে বিদেশীদের চাকুরী দিয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে হাই প্রফাইলের গবেষক ছাড়া ঐ ধরনণের চাকুরী সুযোগ পাওয়া কঠিন। তবে এইসব হাই প্রফাইলের গবেষকগণ বিশ্বের সকল দেশই চাকুরীর সুযোগ পেয়ে থাকে, শুধু জাপানে নয়।

আবার যারা জাপানী ভাষা শেখার স্কুলে আসে তারা অনেকেই ভাল জাপানী ভাষা জানলেও স্থানীয় কোন ভাল প্রাতিষ্ঠানিক সনদ না থাকায় ভাল চাকুরীর সুযোগ পান না। তবে জাপানিজ স্কুল হচ্ছে জাপানে প্রবেশের একটা সহজ পথ। যদি কেউ এই পথটাকে ভাল ভাবে ব্যাবহার করে তবে এখান থেকে জাপানের অনেক সুন্দর জীবন যাপন করা সম্ভব। জাপানী ভাষা শেখার স্কুল থেকে পাস করে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি এইচ ডি পর্যন্ত করা সম্ভব। অনেকেই সেটা করেছে এবং জাপানে অনেক ভাল চাকুরীতে আছেন। আবার অনেকে জাপানী স্কুলে এসে অবশেষে অবৈধ কিংবা কোন ফ্যাক্টরিতে কাজ করে সারা জীবন পার করে দিচ্ছে। শুধু তাই না সহজ উপায় খুজতে গিয়ে জাপানের মত দেশেও হোটেল কিংবা ফ্যাক্টরিতে চাকুরীর জন্য অন্য বাংলাদেশীকে চাকুরীর জন্য টাকা দিয়ে প্রতারিতও হচ্ছে অহরহ।

যদি কোন ছাত্রছাত্রী এইচ এস সি পাস করে জাপানী স্কুলের এসে থাকে তবে তাকে জাপানী স্কুল শেষ করে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা কোন ডিপ্লোমা কলেজে ভর্তি হয়ে সফল ভাবে শেষ করতে হবে। তাহলে তাদের জন্য জাপানের স্থানীয় কোম্পানিতে চাকুরী সুযোগ আছে। জাপানে আর একটি বিশেষ দিক হচ্ছে যদি কারো চাকুরী করার ইচ্ছা থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার কমপক্ষে এক বছর আগে থেকে তাকে চাকুরীর জন্য আদা জল খেয়ে লাগতে হবে। বাংলাদেশে যেমন পাস না করে চাকুরী খোজা যায় না এখানে সে রকম না। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে সাধারণত তৃতীয় বর্ষের সময় বুঝা যায় সে পাস করবে কিনা। এর উপর ভিত্তি করে সবাই চাকুরী খুজে এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পাস করার ছয় মাস আগেই চাকুরী হয়ে যায়। জাপানের ছাত্রছাত্রীরা প্রতি বছর মার্চ মাসে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে এবং এপ্রিল মাসে চাকুরীতে জয়েন করে। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন প্রকার সেশন জট নাই। বাংলাদেশ থেকে যারা জাপানে এসে জাপানী স্কুল শেষ করে ডিপ্লোমা কলেজে ভর্তি হয় তাদের বেশীর ভাগই শুধু জাপানের ভিসা ঠিক রাখার জন্য ভর্তি হয় এবং ঐ বিষয়ে তেমন কিছু শেখে না। এর ফলে বেশীর ভাগ ডিপ্লোমার ছাত্রছাত্রীরা ভাল কোন চাকুরী পায় না।

আবার যারা বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে জাপানী স্কুলে ভাষা শেখার জন্য জাপানে আসে তারা চাইলে সরাসরি জাপানের সরকারী কিংবা বেসরকারি যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ কিংবা এম এস সিতে ভর্তি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে জাপানী স্কুলে পড়া অবস্থাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে এবং তার পড়াশুনার বিষয়ের সাথে মিল আছে এমন কোন প্রোফেসর মেনেজ করতে হবে।

বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসা জাপানিজ স্কুলের বেশীর ভাগ ছাত্রছাত্রীরাই স্কুলের পড়াশুনা, পার্ট-টাইম চাকুরী, বাসার রান্নাবান্না করে নিজেকে আর বেশি দুর নিয়ে যেতে পারে না। আসলেই আমাদের দেশের একজন ছাত্রছাত্রীর জন্য এটা অনেক কষ্টকরও বটে। একজন জাপানিজ স্কুলের ছাত্রছাত্রীর একদিনের রুটিন হল সকাল ৭ টা ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়া, দুপুর ১টা পর্যন্ত ক্লাস, বাসায় এসে রান্না করে কোন রকম কিছু খেয়ে আবার কাজে যাওয়া। কাজ থেকে রাত ১২টা কিংবা ১ টায় বাসায় ফিরে এরপর ঘুম, আবার পরের দিন সকাল ৭ টায় স্কুল। এভাবেই চলতে থাকে জীবনের রুটিন। যে ছেলে কিংবা মেয়েটির কলেজ শেষে বাসায় ফিরে মায়ের হাতের রান্না খেয়ে দুপুর বেলায় ভাত ঘুম দেবার অভ্যাস। প্রবাস জীবন তাকে ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকার ঋণ মাথায় নিয়ে প্রতিদিন স্কুল, পার্ট-টাইম চাকুরী, রান্না সবই তার একাই করতে হয়। তখন তারা খুজতে থাকে সহজ উপায়ে টাকা উপার্জনের রাস্তা। কারণ বেশী ভাগ জাপানিজ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই বড় অংকের একটা ঋণ কাঁধে নিয়ে জাপানে আসে এবং সবাই চায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ঋণের বোঝা থেকে পালাতে। শুধু তাই নয়, দেশের সকলেই তার দিকেও তাকিয়ে থাকে কবে সে দেশে আসবে এবং সাথে থাকবে তাদের জন্য মেইড ইন জাপান প্রোডাক্ট।

বিদেশে যারা থাকে তারা অনেক টাকা উপার্জন করে, কিন্তু কি ভাবে? এটা যেমন ঐ প্রবাসী তার পরিবারকে বুঝাতে পারে না, তেমনি বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যগণও বুঝার চেষ্টা করে না। এখানে বলে রাখা ভাল যারাই বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারা সবাই প্রবাসের প্রথম তিন থেকে পাঁচ বছর সেই লেভেলের কষ্ট করে নিজেকে ঐ দেশের জন্য যোগ্য করে তুলেছে। যা কিনা একমাত্র সে নিজেই বলতে পারবে। একেক জনের কষ্টটা একেক রকম। কেউ হয়ত মাইলের পর মাইল সাইকেল চালিয়ে কাজ করেছে, কেউ আবার দিনে মাত্র ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে পার করেছে কয়েক বছর, কেউ আবার গবেষণার চাপে কত রাত না ঘুমিতে পাড় করেছেন শুধু সেই বলতে পারবে। একেক জনের ইতিহাস একেক রকম, সে যে দেশেই থাক আর যে দেশেই স্থায়ী হোক কষ্টটা একই শুধু রূপটা ভিন্ন। তবে দেশেও যারা সফল হয়েছে তাদের জীবনেও অনেক কষ্টের ইতিহাস আছে, কিন্তু বিদেশ জীবনের কষ্টের ইতিহাসটা একটু ভিন্ন, যেখানে যুদ্ধ হয় নিজের সাথে নিজেরই, সাথে থাকে বড় অংকের টাকার খেলা। এছারাও আছে মা বাবা ভাই বোন এবং স্বজনদের সাথে লক্ষ মাইলের দূরত্ব। ভাল থাকুক সকল প্রবাসী ভাই ও বোনেরা এই কামনা করছি।

ডঃ মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান, টোকিও, জাপান।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত