প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: উন্নত জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে মাতৃভাষার সার্বজনীন প্রয়োগ অপরিহার্য

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্ ‍ুয়ারি মাতৃভাষা বাংলাকে পকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চক্রান্তের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঢাকায় পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য আর কোনো জাতিকে আন্দোলন-সংগ্রাম ও বুকের তাজা রক্ত ঢেলে এভাবে মাতৃভাষাকে আদায় করতে হয়নি, এর প্রয়োজনও হয়তো পড়েনি। পূর্ব বাংলার জনগণ ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য যে পাকিস্তান রাষ্ট্র পেতে সবচাইতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলো, পাকিস্তান নামক সেই রাষ্ট্রটি লাভের আগেই রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার প্রস্তাব থেকে বাস্তবায়নে শক্তি প্রয়োগ শুরু হয়। পূর্ব বাংলার জনগণ পকিস্তান রাষ্ট্রে স্বাধীনভাবে বসবাসের যে স্বপ্ন দেখেছিলো, এটি শুরুতেই ধাক্কা খায় এবং অচিরেই মাতৃভাষা রক্ষা করার জন্য রাস্তায় আন্দোলন-সংগ্রামে নামতে হয়। ৪ বছর সেই আন্দোলন করেও পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীকে নিবৃত্ত করা যায়নি, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠায় জোর-জবদস্তিমূলক অবস্থান থেকে।

ফলে পূর্ব বাংলার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে ছাত্র সমাজ মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে বহু প্রাণের বিনিময়ে ছাত্রসমাজ বাংলাকে রক্ষার জন্য তাদের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে। সেই থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু শহীদ দিবস নয়, জাতি সত্ত্বার আবেগ, ভাষা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বোধেরও নতুন ভাবে উন্মেষ ঘটানোর এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস হয়ে উঠলো।

গোটা পাকিস্তানের শাসনকালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নিলেও বাংলাভাষা ও বাঙালি জাতির মর্যাদা পকিস্তান রাষ্ট্রে দেওয়া হয়নি। সে কারণেই স্বায়ত্তশাসন, জাতিগত অধিকার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা ইত্যাদি নিয়ে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে লড়াই সংগ্রাম জোরদার করতে হয়েছিলো। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবি পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধীনতার মহা সনদ হিসেবে উত্থাপন করেন। শুর হয় ৬ দফার আন্দোলন যা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং রাজনৈকি নেতৃত্ব থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে তা স্বাধীনতার ১ দফায় রূপান্তরিত হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধ সেই রূপান্তরেরই উচ্চতর পর্যায়- যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র নামে আবিভর্‚ত হয়, পাকিস্তান বিতারিত হয়। মাতৃভাষা বাংলার আন্দোলন ২৩ বছরে বাঙালি জাতিকে কতোটা শক্তি যুগিয়েছিলো তা পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতির  উত্থান বিকাশ ও পরিণতি থেকে ধারণা লাভ করা যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সে কারণেই বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে প্রয়োগরে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে ২৫ এপ্রিল তারিখে সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রয়োগে নির্দেশনাও তিনি দিয়েছিলেন।

তবে মাতৃভাষা হিসেবে বাংলাকে সাধারণ ভাবে ব্যবহারে বেশি মনোযোগী হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগত দুর্বলতা আমরা প্রথম থেকেই লক্ষ্য করে আসছি। এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিলো ওই পরিবেশিক মানসিকতা এবং পাকিস্তানকালের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার যে কারণে আমরা ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফার্সি ইত্যাদি ভাষাকে যে ধরনের কৌলিন্যতা প্রদান করে থাকি বাংলাকে রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার ও উন্নয়নে ততোটা মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে। এ ধরনের মনোবৃত্তির পেছনে আমাদের দুনিয়ার রাষ্ট্র ও জাতি সমূহের উন্নয়ন অগ্রগতি ও জীবন-জীবিকায় মাতৃভাষার অবস্থান সর্ম্পকে ধারণাগত বিভ্রান্তি যথেষ্ট পরিমাণ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

১৯৫২ সাল থেকে শহীদ দিবস পালন করি মাতৃভাষা বাংলার কথা বলি এবং ১৯৯৯ সাল থেকে ইউনেস্কোকর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভে আমরা আত্মতৃপ্তির প্রকাশ ঘটাই, কিন্তু মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার চর্চায় দ্বিচারিতা করেই যাচ্ছি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও প্রমিত বাংলার যথেষ্ট চর্চা হচ্ছে না অথচ, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার বিস্তার এখন আর শুধু উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মধ্যবিত্তও এবং উঠতি মধ্যবিত্তের মধ্যেও প্রবলভাবে জেকে বসেছে। সে কারণে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায়  ইংরেজির প্রতি যে ধরনের অর্থবিত্ত খরচ করার মানসিকতা উঠতি ও বিত্তশালীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা জাতি হিসেবে আমাদের চেতনাগত দুর্বলতারই প্রকাশ ঘটায়। ইংরেজি ছাড়াও দেশে আরবি, উর্দু এবং ফারসি ভাষায় শিক্ষা লাভের নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু এগুলোর কোনোটি মানসম্মত শিক্ষাদান কিংবা দক্ষ জনগোষ্ঠী গঠনে মোটেও ভ‚মিকা রাখার মতো নয়।

এছাড়া আমাদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজিকে বাহ্যিক ভাবে গুরুত্ব দিয়ে প্রায় ১০-১২ বছর যেভাবে শিক্ষাক্রমে অর্থ ও শ্রমের অপচয় করা হচ্ছে তাতেও আমাদের বোধদয় খুব একটা হচ্ছে না। কারণ বিদেশি ভাষা শেখা ও শেখানোর কিছু নিয়ম-পদ্ধতি রয়েছে সেটি অনুসরণ করা হলে শিক্ষার্থীরা ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যেই যেকোনো একটি বিদেশি ভাষার শিক্ষা দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম। কিন্তু আমরা ভাষা শেখানোর পদ্ধতি অবলম্বন না করায় বিদেশি ভাষা ইংরেজি, আরবি, উর্দু ও ফারসি প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

অথচ উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীগণ স্কুল জীবনের প্রথম কয়েক বছর শুধু যার যার মাতৃভাষায় শিক্ষাক্রম অতিক্রম করে। একটি নির্দিষ্ট বয়স ও শ্রেণি অতিক্রম করার পর শিক্ষার্থীগণ নিজেদের পছন্দ মতো যেকোনো একটি বিদেশি ভাষা শেখার ব্যবস্থাপনায় অর্ন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের শেষ হয় তাদের মাতৃভাষাতেই, বিদেশি ভাষা তাদের কেবলমাত্র উচ্চতর শিক্ষায়, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষার জন্য যতোটুকু প্রয়োজন তার জন্য তাদের সেভাবে দক্ষ করে তোলো হয়। কিন্তু মাতৃভাষায় যেকোনো বিষয়ে জ্ঞানচর্চার কোনো ব্যত্যয় ঘটে না, এতেই আমরা জাপান, কোরিয়া, চীন ইউরোপের যেকোনো রাষ্ট্র সফর কালে দেখতে পাই।

এসব উন্নত দেশে সবাই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যার যার মাতৃভাষাতেই লেখা পড়া ও গবেষণা করে থাকে। বিদেশি ভাষা তারা কেবলমাত্র নিজেদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী শিখে থাকে। সেক্ষেত্রে যারা বিশেষজ্ঞ তারা প্রয়োজনে একাধিক বিদেশি ভাষা শিখেন, কিন্তু বিদেশি ভাষার ব্যবহার তারা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োজনীয় জায়গার বাইরে কোথাও করেন না।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবকিছুই তারা মাতৃভাষাতে করে থাকেন এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য যেমন দেখা যায় না, বিদেশি ভাষার নামে অর্থ ও মেধার অপচয়ও তেমন ঘটে না। আমরা বিষয়টি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সরূপ উন্মোচনে খতিয়ে দেখতে পারি। মাতৃভাষার প্রতি আবেগ, ভালোবাসা এবং জ্ঞান ও দক্ষতা তখনই পরিপূর্ণভাবে তৈরি হবে যখন আমরা সমগ্র শিক্ষাজীবন মাতৃভাষায় মানসম্মত উপায়ে লাভ করতে পারবো। এখন প্রথম শ্রেণি থেকে যেভাবে একাধিক মাতৃভাষার বাহিরে একাধিক (ইংরেজি,আরবি) ভাষা নিয়ে যেভাবে শিশুদের পঠন-পাঠন দিতে চাই তা মোটেও বৈজ্ঞানিক নয়।

এই চাপ শিশুরা বহন করতে পারে না কিন্তু আমরা জোর করেই অবৈজ্ঞানিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় যেভাবে পঠন-পাঠন দিচ্ছি তাতে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষা এবং অন্য বিদেশি ভাষাগুলোর দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এটি আমরা দেখেও দেখছি না, বুঝেও বুঝছি না। কারণ আমরা শিক্ষা বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাই রাখি না। এ কারণে আমাদের  মেধা, মনন ও অর্থের অপচয় হচ্ছে, জাতিগত বোধ , বিশ্ব সভ্যতায় আমাদের অবস্থানগত ধারণাও বিভ্রান্তিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। সে কারণে আর্šÍজাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের উচিত হবে উন্নত দেশ ও রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া। লেখক : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত