প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইমতিয়াজ মাহমুদ: দীপন হত্যা মামলার রায় : কেবল একজন-দুজন লোককে হত্যা করাই কি ঘাতকের উদ্দেশ্য?

ইমতিয়াজ মাহমুদ : দীপন হত্যা মামলার রায় হয়েছে। আটজন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে কোর্ট। আটজনের সবাইকে সাজা দিয়েছে মৃত্যুদণ্ড। দীপনের পিতাকে আমরা সকলেই চিনি। দীপনের স্ত্রীর সঙ্গে আমার একবার কী দুইবার দেখা হয়েছে এলিফ্যান্ট রোডের দীপনপুরে। খবরে দেখলাম তিনিও… ছিলেন মামলার রায়ের সময়। তার শোক, তার সন্তানদের শোক এসব তো আমরা কখনোই বুঝতে পারবো না। আগামী সপ্তাহে অভিজিৎ রায় হত্যা মামলারও রায়ের তারিখ নির্ধারিত আছে। সেখানেও একটা ভালো রায় আশা করছে সরকার পক্ষ।

এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে, অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে এসব তো ভালো খবর। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তো এটাই যে সরকারের পুলিশ ঠিকঠাক মতো তদন্ত করবে,রিপোর্ট দেবে, প্রসিকিউটররা দায়িত্ব পালন করবে ঠিকঠাক মতো, বিচার হবে। সরকারের দায়িত্ব বিচার নিশ্চিত করা, আমরা আশা করি সরকার এই দায়িত্বটা ঠিক মতো পালন করবে। এসব রায় দেখে আশান্বিত হই। কিন্তু এই যে দীপন হত্যাকাণ্ড,অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ড, তারও আগে রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ড, তারও অনেক আগে হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা- এসব ঘটনাকে কী কেবল একেকটি হত্যাকাণ্ড বা হত্যার চেষ্টা হিসাবে দেখা কি ঠিক হবে? না, হবে না। দীপনকে যেদিন হত্যা করা হলো সেদিন টুটুল রনদিপম আর আরও একজনের উপরও হামলা হয়েছিলো। তারা প্রাণে বেঁচে গেছে। হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা হয়েছিলো সে তো বলেছিই।

এই যে হত্যা আর হত্যার চেষ্টা, এসব তারা কেন করে? কী তাদের উদ্দেশ্য? কেবল একজন-দুজন লোককে হত্যা করাই কী এসব ঘাতকের উদ্দেশ্য? না। কেবল একজন-দুজন মানুষকে বা একদল মানুষকে হত্যা করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তারা এসব লোককে হত্যা করেছে বা হত্যার চেষ্টা করেছে একটা বিশেষ কিন্তু কমন উদ্দেশ্য নিয়ে- তাদের যে বিশ্বাস সেই বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন কোন কথা যেন কেউ না বলে।

আপনি বিজ্ঞান আলোচনা করতে চান, দর্শন বলতে চান, ইতিহাস সমাজবিজ্ঞান সাহিত্য গণিত বা যা ইচ্ছা তাই- কিন্তু কোং কিছুতেই আপনি এমন কোনো কথা বলতে পারবেন না যেটা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে না। এটা তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এজন্যই তারা এসব লেখক প্রকাশক ও অ্যাক্টিভিস্টদের উপর হামলা করে-আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে না এমন কোনো কথা কেউ এদেশে বলতে পারবে না।

আমরা এখন বিচার করছি, ট্রায়াল কোর্টে ঘাতকদের সাজা হয়েছে, আশা করি সেগুলো আপিলেও বহাল থাকবে। কিন্তু ঘাতকদের যে উদ্দেশ্য, একটা ভীতি তৈরি করা, যে তাদের বিশ্বাসের বিরোধী কোনো কথা কেউ বলতে পারবে না, বললেই ঘ্যাচাং- এই উদ্দেশ্যটা কী ইতোমধ্যে বহুলাংশে পূরণ হয়নি? আমাদের তরুণ লেখকরা, তরুণ অধ্যাপকরা, তরুণ রাজনীতিবিদরা, তারা কী ইতোমধ্যে খানিকটা নিজেদেরকে সংবরণ করে বা নিবৃত করে নেয়নি? তারা কী নিজেদের উপর একধরনের সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করেনি? নিজেদের চিন্তা নিজেদের কথা নিজেদের আচরণকে কী তারা ইতোমধ্যে শৃঙ্খলিত করেনি? করেছে। কেন করেছে? ভয় থেকে।

এখানে তো এসব ঘাতকেরা সফল। আমাদের রাষ্ট্র ব্যাবস্থার মধ্যে যেসব ব্যক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মধ্যেও কী আপনি একরকম আত্মসমর্পণ বা ঘাতকদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব লক্ষ করেননি? দেশে বাক স্বাধীনতা বিদ্যমান আছে এ কথা বলে তারা কী বলে না যে, কিন্তু বাকস্বাধীনতা মানে এই না যে আপনি যা ইচ্ছা তাই বলতে পারেন? বলে তো। তার মানে কী? মানে হচ্ছে যে রাষ্ট্রযন্ত্রও আপনাকে বলছে যে ওইসব ঘাতকদের পছন্দ নয় এমন কথা আপনি বলতে পারবেন না।

এই অধমের বিনীত নিবেদন হচ্ছে, যে ঘাতকদের বিচার ও শাস্তি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি আপনি তাদের জিতে যেতে দেন। ঘাতকের প্রকৃত শাস্তি হবে সেইটাই- যে না, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা হামলা করে হত্যা করে সেই উদ্দেশ্য পূরণ হতে দেওয়া যাবে না। মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করা যাবে না। মানুষ যা ইচ্ছা তাই বলতে পারবে- এমনকি সেসব কথা যদি কারও কোনো বিশেষ অনুভ‚তিতে আঘাত করে তবুও সেই কথাটি বলতে বাধা দেওয়া যাবে না। এটা যতোদিন আমরা করতে পারবো না, যতোদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের একজন লেখকও একটা কথা বলার আগে চিন্তা করবে কারও অনুভ‚তিতে আবার না আঘাত করে, ততোদিন পর্যন্ত জিতে যাচ্ছে তারাই। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত