প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

টিকা গ্রহণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধিতে অনীহা

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে করোনাভাইরাসের গণ-টিকাদানের চর্তুথ দিন ছিল বুধবার। এ দিন অনেক কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই টিকা গ্রহণ করতে দেখা গেছে আগতদের। অনেকে মাস্ক খুলে ফটোসেশনে মেতে ওঠেন। এ যেন ছিল এক আনন্দ আয়োজন।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, টিকা করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করলেও অন্যান্য সংক্রামক রোগ প্রতিরোধী নয়। ফলে টিকা নেওয়ার অন্তত ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধির মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য টিকা নেওয়ার পর সোশ্যাল ডিসটেন্সিং, মাস্ক পরা আগের মতোই অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু অধিকাংশ টিকাকেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হওয়া এবং নির্ধারিত কেন্দ্র ছাড়া টিকা নিতে না পারায় অনেককে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৭ জানুয়ারি টিকা কার্যক্রম শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত করোনা টিকা গ্রহীতার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৭ হাজার

৭৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় গতকাল ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে ৪০ হাজার ৯০৭ জন, ময়মনসিংহে ৭ হাজার ৫৪৯ জন, চট্টগ্রামে ৩৭ হাজার ৪৫৮ জন, রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৯৭১ জন, রংপুরে ১৪ হাজার ২২৪ জন, খুলনায় ১৭ হাজার ১১৫ জন, বরিশালে ৬ হাজার ১৪৭ জন, সিলেটে ১৭ হাজার ৮০ জনসহ চর্তুথ দিন আট বিভাগে নতুন করে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫১ জন টিকা নিয়েছেন। ড্রাই রানসহ দেশে এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৬৯ জন করোনা টিকা নিয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৬ হাজার ৪২৬ ও নারী ৯১ হাজার ৩৪৩ জন।

এদিকে গত কয়েকদিন একাধিক হাসপাতালের টিকা কেন্দ্রঘুরে সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশে টিকা কেন্দ্রগুলোতে আসা মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া টিকা প্রয়োগের প্রথম দিনে দেশে বেশ কয়েকজন ভিভিআইপি ও ভিআইপিকে দলবল নিয়ে করোনা টিকা নিতে দেখা গেছে। সেখানে কোনো ধরনের সোশ্যাল ডিসটেন্সিং মানা হয়নি। কুষ্টিয়ায় কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে নার্সের পরিবর্তে একজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে ইনজেকশন হাতে নিয়ে অন্যজনের শরীরে পুশ করার ছবি এবং আরেকজন নারী সাংসদকে টিকা দেওয়ার নাম করে ফটোসেশন করতে দেখা গেছে। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব না মেনে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর টিকা নেওয়ার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে টিকাদানের চিত্র :গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মহানগরের ভেতরে হাসপাতালগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ৮৩৭ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন ৯৩০ জন, স্যার সলিমুলস্নাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪২০ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ৩০ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯০৬ জন, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে ৫২২ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৮৬০ জন, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ৪৮০ জন, শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট (মাতুয়াইল) ৪৮২ জন, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে (রাজারবাগ) ৯৯০ জন সচিবালয় ক্লিনিকে ৩০৯ জন করোনার টিকা নিয়েছেন। আর ঢাকা মহানগরে ৪৬টা হাসপাতালে ১৯ হাজার ১১৫ জন টিকা নিয়েছেন। মঙ্গলবার মহানগরীতে এই সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৫১৭ জন।

এদিকে ঢাকার বাইরেও একাধিক কেন্দ্রে নানা অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে করোনার টিকাদান কার্যক্রম। সংকীর্ণ স্থানে বুথ বসানোয় অপেক্ষমাণ মানুষকে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াতে হচ্ছে। এছাড়া টিকা দেওয়ার পর পর্যবেক্ষণ বুথেও স্থান সংকুলান হচ্ছে না বলে টিকা নিতে আসা আগ্রহীরা জানিয়েছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, মানুষের অতিরিক্ত চাপ থাকায় টিকাদান কার্যক্রমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টিকা নিতে আসা আফরোজা বেগম নামে এক নারী অভিযোগ করেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় অনেক সমস্যা আছে। কোনো সিরিয়াল দেওয়া হয়নি। এছাড়াও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও সৌভাগ্যবান যে, আমরা অনেক দেশের আগে টিকা নিতে পারছি।’

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে জোছনা দাশ নামে পঞ্চাষোর্ধ্ব এক নারী বলেন, ‘সকাল সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রথমে এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন বলেছে সিরিয়াল নিতে হবে না। পরে দেখলাপেছন থেকে একজন এসে ভেতরে ঢুকে গেছে। এখানে তো নিয়ম শৃঙ্খলার ব্যঘাত ঘটছে। ডাক্তার-নার্সদের যদি স্বজনপ্রীতি বেড়ে যায় তাহলে আলাদা কার্ড দিতে পারত। আমরা চাই, টিকা গ্রহণের ব্যবস্থাপনা যাতে সুষ্ঠু হয়। দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা অন্যদের বোঝা উচিত।’

তিনি অভিযোগ করেন, ডাক্তার-নার্সদের স্বজন হবে বলে আগে দিতে পারবে আর আমাদের ডাক্তার-নার্স পরিচিত নাই বলে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকব, তা তো হতে পারে না।

এমইএস কলেজের সাবেক শিক্ষক অমলেন্দু দত্ত বলেন, টিকা নেওয়াটা অনেকটা যুদ্ধ জয় করার মতো পরিস্থিতি। টিকা নেওয়ার পর আধাঘণ্টা বসে বিশ্রাম নেব কিংবা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা তা দেখার জন্য বসব, সেই সুযোগ নেই। ফলে বাধ্য হয়ে টিকা নিয়ে বাসায় চলে যেতে হচ্ছে।

জানা গেছে টিকার জন্য নিবন্ধনের সময় টিকা গ্রহণ কেন্দ্রের নাম উলেস্নখ্য করতে হয়। পরে সেখানে কোন তারিখে উপস্থিত থাকতে হবে তা মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়। যদিও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন কোনো কারণে ওইদিন টিকা কেন্দ্রে হাজির হতে না পারলে পরদিন হাজির হতে হবে। তবে নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী এক বিভাগে নিবন্ধন করলে অন্য বিভাগ থেকে টিকা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক মানুষকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। কারণ কেউ রাজশাহীতে টিকার নিবন্ধন করে ঢাকায় আসলে নির্ধারিত কেন্দ্র ছাড়া তাকে টিকা দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া প্রথম ডোজের চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ টিকা নেওয়ার নির্ধারিত দিনে যদি কারও জ্বর বা শারীরিক সমস্যা থাকে সে ক্ষেত্রে টিকা নেওয়া যাবে না।

এ ছাড়া অনেকে অভিযোগ করেন, সুরক্ষা অ্যাপে রেজিস্ট্রশন করে তা প্রিন্ট আউট করতে হয়। তারপর নির্দিষ্ট তারিখে উপস্থিত হয়ে রেজিস্ট্রেশন কপি প্রিন্ট করে তার উপর নোটিশ বোর্ডে থাকা সিরিয়াল নম্বর বসিয়ে টিকাদান বুথের সামনে বসতে হয়।

আর যারা অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি তাদেরকে হাসপাতালের রেজিস্ট্রশন বুথে যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দেখালেই রেজিস্ট্রেশন করা যায়। তবে অনেক চিকিৎসক ও হাসপাতাল স্টাফদের স্বজনপ্রীতির কারণে দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে সামাজিক দূরত্ব মানার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে। –যায়যায়দিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত