প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাঈদ তারেক : সু চিরা যে কেন এমন হয়ে যায়!

সাঈদ তারেক : যে দেশে গণতন্ত্র নেই, যে সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না মানুষ প্রাণখুলে কথা বলতে পারে না মতামত প্রকাশ করতে পারে না, সে সমাজ যতো আধুনিক বা অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হোক- হোক সে চায়না, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের শেখ বা বাদশাহশাসিত রাষ্ট্রগুলো বা বাড়ির পাশের মিয়ানমার, এগুলোকে আমি সভ্য দেশ বলি না। এরা অসভ্য, ইতর, বর্বর ও জংলি। মিয়ানমার একটা জাত অসভ্য দেশ। ’৪৮ সালে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বছর কয়েক কোনোমতে চলতে পারলেও ১৯৬২ থেকে- আজ প্রায় ষাট বছর আর্মি ক্ষমতা দখল করে আছে। আর এ কাজটি তারা করতে পারছে প্রতিবেশী চায়নার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। চায়নায় গণতন্ত্র নেই, তারা গণতন্ত্র মানে না। মাও সেতুংয়ের আদর্শ থেকে সরে এসে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী চক্র সেখানে গোষ্ঠী স্বৈরাচার কায়েম করে রেখেছে। তারা চায় তাদের বলয়ে থাকা সরকারগুলোও তাদেরই কায়দায় ক্ষমতা করায়ত্ব করে রাখুক। এতোদিন ধরে মিয়ানমারে তাই হয়ে আসছে।

সেদিন নতুন করে সামরিক আইন জারি বা সামরিক বাহিনীর সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ মিয়ানমারে নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে বহুবার এমন ঘটেছে। মাঝেমধ্যেই ঘটে। সবাই জানে দেশটা চায়নার তালুকদারি সম্পত্তি- এ জন্য কেউ কিছু বলে না। ওটা চায়নাকেই দিয়ে রেখেছে। তারপরও জাতিসংঘ বা আমেরিকার ভয়ে গণতন্ত্রের কিছু ভড়ং করতে হয়, মিলিটারিরা জনগণকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে রেখেছে, মানুষ সেখানে দল করতে পারে, নির্বাচন হয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতা পায় না কখনো। ক্ষমতা রয়ে যায় মিলিটারির হাতে।

এই দেশে গণতন্ত্র কায়েমের জন্য আবিভর্‚ত হয়েছিলেন আধুনিক বার্মার ফাদার অফ দ্য নেশন বা ‘জাতির জনক’ হিসেবে খ্যাত প্রয়াত অং সানের কন্যা সু চি। অং সান মিয়ানমারের রাজনীতিতে একজন সফল এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ব্রিটিশ থেকে মিয়ানমারের স্বাধীনতার জন্য তিনি দেন দরবার করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের সাথে স্বাধীনতার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ’৪৬এর নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগড়িষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে বৃটিশ রাজের অধীনে সরকার গঠন করেছিলেন, প্রধান মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তার স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ীই ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা পায়। কিন্তু সে স্বাধীনতা তিনি দেখে যেতে পারেননি। ’৪৭ সালের ১৯ জুলাই মন্ত্রীসভার বৈঠক করার সময় সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে নিহত হন অং সান। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র বত্রিশ বছর। তার সাথে মন্ত্রী পরিষদের আটজন সদস্যও মৃত্যুবরণ করেন।

পিতা অং সান যখন নিহত হন কন্যা সু চির বয়স তখন মাত্র দুই বছর। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা রেঙ্গুনে। গ্রাজুয়েশন করেছেন দিল্লি ইউনিভার্সিটি এবং লন্ডনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। বছর তিনেক জাতিসংঘেও কাজ করেছেন। এরপর দেশে ফিরে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ’৮৮তে আর্মি শাসনের বিরুদ্ধে একটা বড় আন্দোলন হয়। সু চি তাতে নেতৃত্ব দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ’৯০-এর নির্বাচনে তাঁর দল এনএলডি সংসদের ৮১ শতাংশ আসন লাভ করতে সক্ষম হয়, কিন্তু এবারের মতো সেবারও আর্মি রাজনীতিকদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকার করে। সু চিকে হাউজ অ্যারেস্ট করা হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত তার ২১ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ১৫ বছর অন্তরীণে কাটান। এ সময় তার মুক্তি এবং বার্মায় গণতন্ত্র কায়েমের জন্য বিশ্বব্যপী দাবি ওঠে। কারা নির্যাতিতা সু চি হয়ে ওঠেন ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’। ২০১০ সালের নির্বাচন তার দল বয়কট করে, অবশ্য ’১২ সালের ৪৫টি শূন্য আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪৩টিতে জয়লাভ করে। সু চি নিজেও সে সেময় এমপি হন।

২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল ভ‚মিধস বিজয় লাভ করে। সংসদের ৮৬ শতাংশ আসন পেয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করে। সাংবিধানিক বাধার কারণে সু চি নিজে রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারেননি তবে সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় নতুন সৃষ্ট ‘স্টেট কাউন্সিলর’ পদ গ্রহন করেন, যদিও মূল ক্ষমতা রয়ে যায় আর্মির হাতে। তারপরও একজন বেসামরিক সরকারপ্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজের দেশকে  গণতন্ত্রের পথে চলা দেশ হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট হন। ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান, যেটা চায়নার পছন্দনীয় ছিলো না। এর মধ্যে জাতীয় নির্বাচন এসে যায়। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সু চির দল সংখ্যাগড়িষ্টতা পায়। জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আর্মি সে নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে দিয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইন জারি করে সু চিসহ তার দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে।

চায়না কখনোই সু চির উত্থানকে সমর্থন করেনি। হতে পারে এখনই তার রাশ টেনে ধরাটা দরকার মনে করেছে। আবার আর্মি বসিয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনা বার্মার অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ব্যপারে আমার জানা-বোঝার আগ্রহ খুবই কম। সেই ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি মগারা (বার্মিজ) বর্বর নিষ্ঠুর অসভ্য। এক সময় এরা বাংলাদেশে ঢুকে বহু লুটপাট হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। বলতে গেলে বার্মা নামের দেশটাকে নতুন প্রজন্ম চিনেছে সু চিকে দিয়ে। গণতন্ত্র মানবিকতা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস করেছেন। সে কারণে বরাবরই তার প্রতি একধরনের সহানুভূতি ছিল। বিশ্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন আইকন হিসেবে তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। সেই সু চি যখন ’১৫তে বার্মার সরকার প্রধান হলেন আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সব খুশি ধুলায় মিশে যায় যখন তিনি ২০১৭ সালে সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা গণহত্যাকে প্রকাশ্য সমর্থন জানালেন।

রোহিঙ্গা গণহত্যায় সমর্থন যুগিয়ে বিশ্বব্যপী সু চি সমালোচিত হন। লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অপরাধ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সু চি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন। এ সময় তার নোবেল প্রাইজ বাতিলে স্বাক্ষর সংগ্রহেরও আহ্বান জানানো হয়। ইতোপর্বে যে সকল সংস্থা গণতন্ত্রের আন্দোলনে আত্মত্যাগের জন্য সু চিকে বিভিন্ন পদক পুরস্কারে ভূষিত করেছিলো তারও একে একে তা প্রত্যাহার করে নিতে থাকে। ১৩ সেপ্টেম্বর ’১৭ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানেও তিনি বিরত থাকেন।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে উপস্থিত হয়ে সু চি রোহিঙ্গাদের ওপর বার্মিজ সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করেন, গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কর্মীকে গ্রেপ্তার করেন। তাদের বিশ্বাসঘাতক বলেও গালমন্দ করেন। আদালতকে নির্দেশ দিয়ে প্রত্যেকের নামে সাত বছর করে কারাদণ্ড ঘোষণা করান এবং এভাবে নিজেকে তিনি একজন স্বৈরাচার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। সর্বশেষ, আম-ছালা দুই-ই হারিয়ে এখন আর্মির হেফাজতখানায় তশরীফ এনেছেন। তদন্ত হচ্ছে। বলা হয়েছে অপরাধী প্রমাণিত হলে তার দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ঈষৎ সংক্ষেপিত। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত