প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] সুন্দরবনে চোরা হরিণ শিকারীরা বেপরোয়া রেডএলার্ট জারি

সাইফুল ইসলাম : [২] সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ ও সুন্দরী বৃক্ষ। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে সম্প্রতি সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্রাসও পেয়েছিল সুন্দরী গাছ পাচার। কিন্তু চলমান করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবে নদ-নদী ও রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ও চোরা শিকারিরা সুন্দরবনে মেতে উঠেছে হরিণ শিকার এবং গাছ পাচারে।

[৩] শুধু বন্যপ্রাণীই নয়, বনের সুন্দরি, পশুর গাছ নিধনসহ বিষ দিয়ে মাছ শিকারের মহোৎসব চলছে বনের ভেতরের নদী-খালে। সংঘবদ্ধ বৃক্ষচোর, বিষ প্রয়োগকারী দুর্বৃত্ত ও চোরা শিকারিদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনে রেড এলার্ট জারি করে টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে চোরা হরিণ শিকারীদের তৎপরতা।

[৪] সুন্দরবনের বাঘের চামড়া ও হরিনের মাংসসহ চামড়া পাচার এখন নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে।

[৫] সেই সাথে গত ২ ফেব্রুয়ারী ৪২ কেজি হরিণের মাংসসহ চোরা শিকারী বাবা-ছেলে, ২২ জানুয়ারী শরখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজার বাসস্টান্ড সংলগ্ন এলাকা থেকে ১৯টি হরিণের চামড়াসহ শরণখোলা উপজেলার দুই বাসিন্দা, ১৯ জানুয়ারী সুন্দরবনের পাহারাদার হিসাবে খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামরাসহ এক জেলে, ৩০ জানুয়ারী ৪৭ কেজি হরিণের মাংস দুই চোরা শিকারী ও ৩১ জানুয়ারী ২২ কেজি মাংসসহ এক চোরা শিকারী পাচারকারী গ্রেফতারের ঘটনায় উঠে এসেছে সুন্দরবনের উদ্বেগজনক চিত্র।

[৬] বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন তথ্য সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ মার্চ ২০২০ থেকে ফেব্রুয়ারীর ৩ তারিখ ২০২১ পর্যন্ত বনবিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের অভিযানে ২৩৪ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়।

[৭] এর সাথে দুই হাজার ৫২৫ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ ও ৯টি নৌকা জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। হরিণ শিকার ও বাঘ ও হরিণের চামড়া পাচারের অপরাধে গ্রেফতার হয় ৩১ চোরা শিকারি।

[৮] এসব ঘটনায় করা ২৩টি মামলায় আসামি পলাতক রয়েছে ৫৫ জন। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার এ জেলে বনজীবী ও চোরা শিকারীদের কাছ থেকে গত ১১ মাসে ২৪টি জীবিত হরিণ, ১০টি হরিণের মাথা, ৩০টি পা জব্দ করা হয়। গত ২০১৯ সালের ২২ মে সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘ রয়েছে মাত্র ১১৪ টি।

[৯] বন বিভাগের তথ্য মতে, জেলে সেজে পূর্ব সুন্দরবন থেকে পাশপারমিট নিয়ে বনে প্রবেশ করে হরিণ হত্যা ও পাচারের অপরাধে বিভিন্ন সময় জেলে ও বনজীবীদের আটক করা হয়েছে। এছাড়া পাশপারমিট বাদেও সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে হরিণ হত্যা ও পাচারের অপরাধেও আটক হয়েছে অনেকে। এর মধ্যে গত ৪ জুলাই সুন্দরবন সংলগ্ন চিলা বাজারের দক্ষিণ পশুর নদীর তীর একটি জেলে নৌকা থেকে ১৫ কেজি হরিণের মাংস ও নৌকা জব্দ করা হলেও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

[১০] এ ঘটনায় ৩জনকে আসামি করে বন বিভাগ মামলা করলেও সবাই পলাতক রয়েছে। গত ২৬ জুলাই সুন্দরবনের চাড়াখালি খালে দুটি জেলে নৌকাসহ ৩০ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হলেও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে বন বিভাগ মামলা করলেও সবাই পলাতক রয়েছে।

[১১] গত ১৫ আগষ্ট সুন্দরবনের কচিখালী অভয়ারণ্য কেন্দ্রের পক্ষিদিয়া চর সংলগ্ন সংরক্ষিত বন থেকে একটি ইঞ্জিন চালিত ট্রলার, ২০০হাত হরিণ শিকারের ফাঁদ ও ২০০ হাত ইলিশ জাল জব্দসহ ৭জন জেলে (বনজীবীকে) আটক করা হয়।

[১২ ] এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়। গত ২৫আগষ্ট সুন্দরবনের মরাপশুর খাল থেকে একটি জেলে নৌকা ও ৪২ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হলেও এ ঘটনাও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে বন বিভাগ মামলা কওে এবং ৫জন আসামীর সবাই পলাতক রয়েছে।

[১৩] গত ২৮ আগষ্ট সুন্দরবনের রায়বাঘিনী খাল সংলগ্ন বনাঞ্চল থেকে হরিণ শিকারের ১৫০ মিটার ফাঁদ, ১টি দা ও ১টি কুড়াল জব্দ করে বন বিভাগ। এ ঘটনায় সুন্দরবনে অবৈধ অনুপ্রবেশের অপরাধে ৩ চোরা শিকারীর নামে মামলা হলেও সবাই পলাতক রয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সুন্দরবন করমজল বণ্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র সংলগ্ন টহল ফাঁড়ির খালের উত্তর পাড় থেকে একটি জেলে নৌকা ও হরিণ শিকারের ৬০ ফুট ফাঁদ জব্দ করে বন বিভাগ।

[১৪] এ ঘটনায় ৪জনকে আসামি করে মামলা করা হলেও সবাই পলাতক রয়েছে। একই দিন সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের পানিরঘাট অফিস সংলগ্ন বনাঞ্চল থেকে হরিণ শিকারের ২০০ মিটার ফাঁদ ও ১টি দা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায়ও ৩ চোরা শিকারীকে আসামি করে মামলা হলেও সবাই পলাতক রয়েছে।

[১৫] গত ১১ অক্টোবর সুন্দরবনের পশুর নদী সংলগ্ন খাল থেকে ১টি নৌকা, হরিণ শিকারের ৩০০ হাত ফাঁদ, ২টি খালপাটা জাল, ৫টি ড্রাম, ৩টি দা ও ১টি কুড়ালসহ ৩ জেলেকে আটক করে সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত স্মার্ট প্রেট্রোলিং এর সদস্যরা। গত ২০ অক্টোবর সুন্দরবনের জোংড়া টহল ফাঁড়ির সীমানা খাল সংলগ্ন বনাঞ্চল থেকে ১টি জেলে নৌকা থেকে ১ কেজি হরিণের মাংস ১০০ মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদ ও ৩টি বৈঠা জব্দ করা হয়।

[১৬] এ ঘটনায় ৪ জেলেকে আসামি করে মামলা করা হলেও সবাই পলাতক রয়েছে। গত ৩০ নভেম্বর সুন্দরবনের কটকা অভয়ারণ্যের জামতলা এলাকা থেকে ১টি হরিণের শিং, ৩৭৫ ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ ও ১টি দা সহ ৫ চোরা শিকারীকে আটক করে বন বিভাগ।

[১৭] এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।সুন্দরবনকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দুভাগে ভাগ করা হয়েছে। বাগেরহাট জেলার শরণখোলা রেঞ্জ ও চাঁদপাই রেঞ্জ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ। আর পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগে রয়েছে খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকা।

[১৮] এর মধ্যে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে পুলিশ ও বনরক্ষীরা অভিযানে চালিয়ে চোরা শিকারিদের কবল থেকে ২৪টি জীবিত হরিণ, ৭৯ কেজি হরিণের মাংস, নাইলনের দড়ির ছয় হাজার ৬০০ ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ জব্দ করেছে। এ সময়ে সাতজন চোরা শিকারিকে আটকসহ তাদের কাজে ব্যবহৃত চারটি ট্রলার ও দুটি নৌকা জব্দ করা হয়েছে।

[১৯] গত ২১ ডিসেম্বর সুন্দরবনের কুলতলি খাল সংলগ্ন বনাঞ্চল থেকে কেজি ৮০০ গ্রাম হরিণের মাংস, ৫১টি হরিণ শিকারের ফাঁদ ও ১টি দাসহ ১জনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে ৫ চোরা শিকারীকে আসামী করে মামলা হলেও ৪জন পলাতক রয়েছে।

[২০] এ বছরের ৮ জানুয়ারি সুন্দরবনের সিন্দুরবাড়িয়া খাল থেকে ১টি জেলে নৌকা ও হরিণ শিকারের ৪০০ ফুট ফাঁদ জব্দ করে বন বিভাগ। এ ঘটনায় ৪ জেলেকে আসামী করে মামলা করা হলেও সবাই পলাতক রয়েছে। ১৯ জানুয়ারী সুন্দরবনের পাহারাদার হিসাবে খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামড়াসহ র‌্যাব ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে এক জেলে আটক করা হয়। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

[২১] ২২ জানুয়ারি শরখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজার বাসস্টান্ড সংলগ্ন এলাকা থেকে ১৯টি হরিণের চামড়াসহ শরণখোলা উপজেলার দুই বাসিন্দাকে আটক করে বাগেরহাট ডিবি পুলিশ। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৩০ জানুয়ারী ৪৭ কেজি হরিণের মাংস ২ চোরা শিকারী আটক করে মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের সদস্যরা। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

[২২] গত ৩১ জানুয়ারি ২২ কেজি মাংসসহ সুন্দরবন সংলগ্ন শরখোলা উপজেলার এক চোরা শিকারী আটক করে বন বিভাগ। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর সর্বশেষ ২ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বগুড়া ব্রিজ সংলগ্ন খাল পাড় থেকে ৪২ কেজি হরিণের মাংসসহ চোরা শিকারী বাবা-ছেলেকে আটক করে ডিবি পুলিশ। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

[২৩] শরণখোলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, কিছু অসাধু জেলে বনজীবীদের অপরাধের দায় কিন্তু সকলের উপর দেয়া যাবে না। সুন্দরবন আমাদের মায়ের মত। আমাদের রুজি-রুটি কিন্তু এ বন থেকেই আসে। সুতরাং সকলকে অপরাধি ভাবা যাবে না। তবে সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র রক্ষায় আমাদের সকলের উচিত জেলে ছদ্মবেসে থাকা এসব চোরা শিকারীদের চিহ্নিত করে তাদের আইনের হাতে তুলে দেয়া।

[২৪] শরণখোলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রায়হান উদ্দিন শান্ত বলেন, সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও পাচারের সাথে শুধু যে জেলে বনজীবীরা জড়িত এমনটা নয়। অনেক সহযোগী হিসাবে কোন কোন সময় বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বনরক্ষিরাও এ ধরনের অপকর্মের সাথে জড়িত থাকে।

[২৫] সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জয়নাল আবেদিন বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যে অভিযোগ করেছে তার কোন ভিত্তি নাই। বন বিভাগের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের কোন সত্যতা নেই। মূলত জেলে বনজীবী ও তাদের নেপথ্যে একটি বড় সিন্ডিকেট আছে শরণখোলা রেঞ্জ সংলগ্ন সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায়।

[২৬] এরাই সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও পাচারের সাথে জড়িত। আমাদের কাছ থেকে যারা পাশপারমিট নিয়ে সুন্দরবনে মাছ, কাকড়া ও মধু আহরণ করতে যাওয়া চোরা শিকারীরা জেলে ছদ্মবেসে বনে প্রবেশ করে এ ধরনের কর্মকান্ড করে থাকে।

[২৭] বন বিভাগের বিভিন্ন অভিযানে এরা আটক হওয়ার পর আমরা জানতে পারি এরা জেলে ছদ্মবেশি চোরা শিকারি। শরণখোলা রেঞ্জের জেলেরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন থেকে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

[২৮] সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের তৎপরতা বন্ধে বন বিভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আমাদের নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন সময় হরিণের মাংসসহ চোরা শিকারীরা ধরা পড়ছে।

[২৯] বাগেরহাট পুলিশ সুপার পংঙ্কজ চন্দ্র রায় বলেন, শরণখোলা কেন্দ্রিক একটি বণ্যপ্রানী পাচার চক্র আছে। যারাই মূলত এ হরিণের মাংস, চামড়া ও বাঘের চামড়াসহ বন্যপ্রানীর বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পাচারের সাথে জড়িত। এদের গডফাদারসহ এসব চোরা শিকারীদের ধরতে বাগেরহাট জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ তৎপর রয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত