প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চীনের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘিরে নতুন করে হতাশা

বিবিসি বাংলা: সরোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়ার পর তিন বছরেও তাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। ইতোমধ্যে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ থমকে গেছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা এখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের অবস্থান বোঝার জন্য অপেক্ষায় থাকার কথা বলছেন।

এদিকে, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতার পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মাঝে নতুন করে হতাশা দেখা দিয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ নূর বলেছেন, অং সান সু চির সরকারের সময়ে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সাথে একটা আলোচনা চলছিল। এখন মিয়ানমারের সেনা সরকার এ ক্ষেত্রে কী অবস্থান নেবে- এ নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীই নির্যাতন করে আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কিভাবে আমরা সেই সেনাবাহিনীর ওপর আশা করতে পারি?’

অন্যদিকে, মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের কিছু দিন আগেই গত ১৯ জানুয়ারি দেশটির সাথে বাংলাদেশ এবং চীনের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে। এক বছরের বেশি সময় পর এই বৈঠকে আবার আলোচনার দিন ঠিক করা হয়েছিল ৪ ফেব্রম্নয়ারি। তবে নির্ধারিত এই বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সৈয়দা রোযানা রশীদ বলেছেন, আগের সরকারের সাথে সেনা সরকারের অবস্থানের কিছু পার্থক্য হবেই। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এখন একটা ছেদ হবেই। সেজন্য রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে নতুনভাবে কৌশল নিতে হবে। অন্যভাবে চাপ দিতে হবে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি সই হয়েছিল ২০১৮ সালে জানুয়ারি মাসে। প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় সেই চুক্তিকে মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে বাংলাদেশ সরকার।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘সরকার বা সরকারের এগ্রিমেন্ট (চুক্তি) হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বিশেষে এগ্রিমেন্ট হয়নি। সুতরাং দ্য প্রসেস শুড কন্টিনিউ। আর আমাদের ইতিহাস আছে, আগে যখন মিয়ানমারে সামরিক সরকার ছিল, সেটা ‘৭৮ সাল বা ‘৯২ সাল বলেন, সামরিক সরকারের সময়ই প্রত্যাবাসনটা হয়েছে। সো হোয়াই নট দিজ টাইম? রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চলমান থাকবে- আমরা সেটা আশা করি।’

সেনাবাহিনীই ‘মূল ভূমিকায়’ : অং সান সু চি ক্ষমতায় থাকাকালে সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে পালিয়ে আসে। সেজন্য সেনাবাহিনীকে মূল অভিযুক্ত করা হলেও মিজ সু চি রোহিঙ্গাদের পক্ষে শক্ত কোনো অবস্থান নেননি।

সাবেক একজন কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমারের আগের সরকারের নেতৃত্বে মিজ সু চি থাকলেও প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে দেশটির সেনাবাহিনীই মূল ভূমিকায় ছিল এবং সেজন্য এখন অবস্থানে পার্থক্য হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে তার ধারণা।

তিনি আরও বলেন, ‘গত তিন বছর ধরে যে কার্যক্রম হয়েছে, মিয়ানমার সরকার একেবারেই সেগুলো থেকে সরে যাবে তা মনে করছি না। কারণ সরকারের সামনে সু চি থাকলেও সামরিক বাহিনীই এই বিষয়টাতে বেশ ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। এখন তারাই তো ক্ষমতায় এসেছে সু চিকে সরিয়ে দিয়ে। কাজেই রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে যেটুকুই নাড়াচাড়া বা অগ্রগতি হচ্ছিল, তা থেকে তারা সরে যাবে বলে আমার মনে হয় না।’

রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক

এদিকে, বাংলাদেশের কক্সবাজারে টেকনাফ এবং উখিয়ায় ৩৪টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছেন। শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার শিউলী শর্মা। বিভিন্ন শিবিরে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে তিনি ধারণা পেয়েছেন যে, মিয়ানমারে এখনও যে রোহিঙ্গারা আছেন, তাদের আবার সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় কিনা- শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এমন আশঙ্কা কাজ করছে। ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে, টেনশন বেড়েছে।

চীনের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিলেও মিয়ানমারের সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন করে রোহিঙ্গা যাতে না আসে এবং এখানে থাকা শরণার্থীদেরও যেন ফেরত পাঠানো যায়, সেজন্য এখন চীনের সহায়তা নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘পরিস্থিতি সামলাতে চীনের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আমরা সবার কাছে অ্যাপ্রোচ করেছি। আমরা মিয়ানমারের কাছে অ্যাপ্রোচ করেছি। সব রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালতেও আমরা গেছি। এবং চীন এ ব্যাপারে কিছু অগ্রসর হয়ে এসেছে। জাপানও এগিয়ে এসেছিল। তবে চীন অনেক অগ্রসর হয়েছে। আমরা চীনকে আস্থার মধ্যে রেখেছি। আমাদের পশ্চিমা অনেক বন্ধু রাষ্ট্রের একটা উৎকণ্ঠা যে এখন বোধহয় আরও রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে আসতে পারে। আমরা বর্ডার সিকিউর করে রেখেছি। আগে যারা এসেছিল। আমাদের জনগণই তাদের গ্রহণ করেছিল। এখন আমাদের জনগণ আর তাদের গ্রহণ করার মুড়ে নেই। এখন এই ধরনের দুর্ঘটনা হলে অন্যরা নিয়ে যাক। আমরা নিতে রাজি নই।’

পরিশেষে মিয়ানমারের পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করা সহসাই সম্ভব নয়- সেটা নিশ্চিত বলা যায়। এখন মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের আলোচনা শুরু করার ক্ষেত্রে চীনের ওপরই নির্ভর করতে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত