প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গুরু তোমার চরণ তলে

মোহন রায়হান: আমাদের গুরু। বাংলাদেশের প্রবাদ প্রতীম পুরুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প)-এর জনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভণর। কিংবদন্তী ব্যাংকার। অতূল্য মানব। মহান লুৎফর রহমান সরকারের আজ জন্মদিন। কে এই লুৎফর রহমান সরকার? উল্লেখিত বিশেষণগুলো তাঁর মতন একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। যারা খুব কাছে থেকে ওনাকে দেখেছেন, জেনেছেন তারা প্রত্যকেই বলবেন, এলআর সরকার একজনই। খাঁটি বাঙালি। দেশপ্রেমিক। সৎ। নীতিবান। আদর্শে অটল। আপসহীন। পাহাড় সমান ব্যক্তিত্ব। আকাশের মতন উদার। সমুদ্রের মতন অতল হৃদয়বান একজন বিশাল মানুষ ছিলেন।

যে মানুষটি কোনো রাজনীতিবিদ কিম্বা রাষ্ট্র নায়ক না হয়েও বদলে দিতে চেয়েছিলেন লক্ষ শহীদের রক্ত আর মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত দেশটাকে। সত্যিকার সোনার বাংলা গড়তে। শাসনে ভাষণে নয়। বাস্তবে। প্রকৃত প্রমাণে। উদাহরণ সৃষ্টি করে।
উনি বলেছিলেন, যে দেশের যুব সমাজ ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছে, সে দেশের যুবশক্তি কেন বেকার হয়ে চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরবে? কেন দেশের ব্যবসা-বানিজ্যে অসৎ লুটেরারা নেতৃত্ব দেবে? কেনো দারিদ্রতার জন্য উচ্চ শিক্ষা নিতে পারবে না দরিদ্র জনগোষ্ঠী? কথায় নয় কাজে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন এই মানবপ্রেমী, সৃজনশীল ব্যাংকার।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসংস্থান প্রকল্প (বিকল্প), খন্ডকালীন চাকরি, শিক্ষা ঋণ প্রকল্পসহ নানা কর্মসংস্থানমূলক ও শিক্ষা বিস্তার প্রকল্প। শিক্ষাসনদ জমা রেখে- বিকল্প ডেন্টাল ক্লিনিক, বিকল্প পিপি ক্যাপ, বিকল্প ফার্মেসি, বিকল্প টেক্সটটাইল, বিকল্প মুদ্রণ, বিকল্প প্রিন্টিং প্রেসসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান প্রকল্প প্রতিষ্ঠার জন্য ঋণ দিয়েছিলেন শিক্ষিত তরুণদের। দরিদ্র ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষার জন্য দিয়েছিলেন শিক্ষা ঋণ। পড়ালেখার পাশাপাশি খন্ডকালীন চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রের। সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ ডিগ্রীধারীদের দিয়ে চালু করেছিলেন, বিকল্প ট্যাক্সী সার্ভিস, বিকল্প মিনিবাস সার্ভিস। আজকের উবার সার্ভিসের স্বপ্ন সরকার সাহেব দেখেছিলেন ৩৫ বছর আগে। সারাদেশে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি। ধন্য ধন্য রব উঠেছিল চারদিকে। বেকারত্ব, ক্ষুধা, দারিদ্র্যের চরম হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত দেশে এক নতুন আশার আলো, নতুন স্বপ্নের বীজ রোপন করেছিলেন তিনি।

কিন্তু প্রতিহিংসাপরায়ণ, স্বৈরশাসক, অবৈধ ক্ষমতা দখলদার এরশাদ জান্তা এবং দেশের কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সহ্য করতে পারেনি তাঁর এই নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম। এইসব জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো কুক্ষিগত করার হীন চক্রান্তে মেতে উঠেছিল তারা। বিকল্পের ঋণ সুবিধা দিয়ে এরশাদ তার গণধিকৃত “নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ” নামক তথাকথিত ছাত্র সংগঠন দাঁড় করাবার জন্য বিকল্পের নির্বাচন কমিটির প্রধান করার নাম প্রস্তাব করেছিল, সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রসমাজের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে এরশাদের সাথে যোগ দেয়া তৎকালীন ডাকসুর জিএস কুলাঙ্গার জিয়াউদ্দিন বাবলুর নাম! কিন্তু অকুতোভয় সাহসী, দৃঢ়চেতা লুৎফর রহমান সরকার ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করলে তাঁকে ও তাঁর সহকর্মী সে সময়ের সোনালী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার দেশের আরেক কৃতি ব্যাংকার এ, কিউ সিদ্দিকীসহ বিকল্পের সঙ্গে জড়িত আরো কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার এবং দ্রুত সামরিক আদালতে বিচার করে দুবছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। প্রতিবাদে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রসমাজ ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসে। বিকল্প সদস্যরা সচিবালয় ঘেরাও, বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও, অবস্থান ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি ও আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁদের মুক্ত করে আনে।

এরশাদের পতনের পর তিনি আবার ব্যাংকিং জগতে ফিরে আসেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন, প্রাইম ব্যাংক। তাঁর অনন্য ব্যাংকিংসেবা এবং বিকল্প, শিক্ষা ঋণ প্রকল্প, খন্ডকালীন চাকরিসহ নানা গণমুখী কর্মকাণ্ডের পুরস্কার স্বরূপ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত হন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অবসর নিয়েও থেমে থাকননি তিনি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংক। বলা বাহুল্য তার পরিচালিত সব ব্যাংকই ছিল সফল ও খ্যাতিমান।

লুৎফর রহমান সরকার শুধু একজন ব্যাংকারই ছিলেন না। তিনি ছিলেন আদমজী পুরস্কার পাওয়া একজন লেখক এবং এদেশের সকল প্রগতিশীল শিল্প সাহিত্যের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক। এমন কোনো পত্রপত্রিকা ছিল না সে সময় যার পৃষ্ঠপোষকতা তিনি করেননি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পেছনেও তাঁর আছে বিশেষ অবদান। তিনি ছিলেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাষ্টি বোর্ডের মেম্বর। জাতীয় কবিতা উৎসব আয়োজন এবং কবিতা পরিষদ গঠন তাঁর সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব হতো না।
আমাদের সামনে সততা, আদর্শ, নৈতিকতা, মানবিকতার, শ্রদ্ধার, ভালোবাসার, অনুসরণ করার এক জাজ্বল্যমান প্রদীপ্ত সূর্য ছিলেন লুৎফর রহমান সরকার। আজ তোমার শুভ জন্মদিনে হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা ঢেলে দিই তোমার পবিত্র চরণ তলে হে গুরু। তুমি আছো। থাকবে আমাদের হৃদয়ে গভীর কন্দরে। আমাদের চেতনার অনিঃশেষ প্রবাহে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত