প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একনজরে ভারতের বাজেট

রাশিদ রিয়াজ : ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন আগেই বলেছিলেন, এবছর এমন বাজেট হবে যা আগে কখনও হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, গত বছর কোভিড মহামারীর মধ্যে চার-পাঁচটি মিনি বাজেট পেশ করা হয়েছিল। তাতে যে ব্যবস্থাগুলি নেওয়া হয়েছিল, তাও এবারের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রথমবারের মত ভারতের বাজেট হল ‘পেপারলেস’। অন্যান্য বছর অর্থমন্ত্রীরা যেমন কাগজ দেখে বাজেট পড়েন, এবার তা হয়নি, দেশটির অর্থমন্ত্রী বাজেট ভাষণ দিলেন ট্যাবলেট কম্পিউটার দেখে। সেই কম্পিউটার ভারতে তৈরি। পরে অনলাইনেও দিয়ে দেওয়া হয় বাজেটের সফট কপি। টাইমস অব ইন্ডিয়া/ব্লুমবার্গ

গত বছর মার্চের শেষে ভারতে লকডাউন জারি হয়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। ২০২০-২১ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের জাতীয় উৎপাদন সংকুচিত হয় ২৩.৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ২০২০-২১ সালের আর্থিক বছরে অর্থনীতি ৯.৬ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ২০২১ সালের ভারতের আর্থিক প্রবৃদ্ধি হবে ৫.৪ শতাংশ। আইএমএফ বলেছে, জিডিপি বাড়বে হবে ১১.৫ শতাংশ হারে। ব্লুমবার্গের ধারণা, তা হবে ৯.২ শতাংশ হারে।

ভারতের অর্থমন্ত্রী তার বাজেট ভাষণে বলেছেন, ২৭ লাখ কোটি রুপির বেশি আত্মনির্ভর প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে। স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতে ২শ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করে অর্থনীতিবিদরা বলছে মূলত চীনের সঙ্গে এ খাতে টেক্কা দিতেই এধরনের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ২ লাখ ৮৩ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। এ বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩৭ শতাংশ। কোভিড টিকার জন্য দেওয়া হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি জেলায় হবে স্বাস্থ্য ল্যাবরেটরি।
এছাড়া বস্ত্রশিল্পের জন্য আলাদা পার্ক তৈরি হবে। কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করতে ভারত সরকার বদ্ধপরিকর। রফতানি ও কর্মসংস্থানের জন্য বিশ্বমানের কাঠামো হবে। পরিকাঠামো উন্নয়নে দেওয়া হবে ঋণ। ৩ বছরে ঋণ দেওয়া হবে ৫ লাখ কোটি রুপি। পুরনো গাড়ি দ্রুত বাতিল করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গে ৬৭৫ কিলোমিটার স্টেট হাইওয়ে তৈরি হবে। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি রাস্তা মেরামত করা হবে। ৩৫০০ কিলোমিটার স্টেট হাইওয়ে তৈরি হবে তামিলনাড়ুতে। ১১০০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হবে কেরালায়। মুম্বাই থেকে কন্যাকুমারী হাইওয়ে তৈরি হবে। অসামে ১৯ হাজার কিলোমিটার রাস্তা মেরামত হচ্ছে।

ভারতের অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মূলধনী খাতে। গোমো থেকে ডানকুনি ফ্রেট করিডোর ছাড়াও খড়্গপুর থেকে বিজয়ওয়াড়া ফ্রেট করিডোর হবে। ১০০ শতাংশ ব্রডগেজ রুটের ইলেকট্রিফিকেশন হবে। জাতীয় রেল প্ল্যান তৈরি হয়েছে। রেলে নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। রেলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি। তার মধ্যে ১ লাখ কোটির বেশি মূলধনী প্রকল্পে। মেট্রো ও বাস সার্ভিসের জন্য ১৮ হাজার কোটি রুপি খরচে ২০ হাজার বাস রাস্তায় নামবে। পাওয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচারে গত ছ’বছরে ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। ফলে ২.৮ কোটি মানুষ উপকৃত হয়েছেন। নির্মলা সীতারমন বলেন বিদ্যুৎ সরবরাহে মনোপলি আছে। এটি ভাঙ্গতে একাধিক ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আনতে চাই। তাতে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। একটা নতুন হাইড্রোজেন এনার্জি মিশন তৈরি হবে। বড় বন্দরগুলির ম্যানেজমেন্ট তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি হতে। এই খাতে কিছু ভর্তুকি দেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারতে এখন পুরোনো জাহাজগুলি রিসাইকেল করার চেষ্টা হচ্ছে। ৯০টি জাহাজ পুনর্র্নিমাণ করা হচ্ছে। ইউরোপ ও জাপান থেকে আরও জাহাজ ভারতে এসে রিসাইকেল করা হবে। এর ফলে ১.৫ লাখ কর্মসংস্থান হবে। শহরে গ্যাস ডিশট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক আরও প্রসারিত হবে। সেবি অ্যাক্ট ও গভর্নমেন্ট সিকিউরিটি অ্যাক্ট কিছু পরিবর্তন করছি। কর্পোরেট বন্ড মার্কেটকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলেন নির্মলা সীতারমন। তিনি জানান গোল্ড এক্সচেঞ্জ রেগুলেটরি অথরিটি তৈরি হবে। ১০০০ কোটি রুপি সোলার এনার্জি খাতে ব্যয় হবে। ইনসিওরেন্স অ্যাক্ট বদলানো হচ্ছে। বিমা কোম্পানিতে ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তৈরি হবে। ব্যাঙ্কের ডিপোজিট ইন্সিওরেন্স গতবার ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ করা হয়েছিল। যে ব্যাঙ্কগুলি এখন সমস্যায় আছে, তাদের আমানতকারীরা যাতে ইন্সিওরেন্সের টাকা পান, তার পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। ছোট কোম্পানির সংজ্ঞা বদলিয়ে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত যাদের টার্ন ওভার তাদের ছোট কোম্পানি বলা হবে।

নির্মলা সীতারমন বলেন কোভিড সত্ত্বেও পণ্য পরিবহণ চালু রয়েছে। ২০২১-২২ সালে এলআইসি-র শেয়ার বাজারে বিক্রি হবে। ভারতের রাজ্যগুলিকে বলা হয়েছে যে বিপুল পরিমাণ জমি পড়ে আছে, তা মনিটাইজ করতে হবে। এর ফলে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা বিনিয়োগ করা যাবে। আমরা ধরে নিচ্ছি ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা এধরনের বিলগ্নিকরণ থেকে পাওয়া যাবে। পি এস এ সিস্টেমের প্রসার ঘটাচ্ছি। পঞ্চদশ ফিনান্স কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সেন্ট্রালি স্পনসরড প্রকল্প আরও বাড়াচ্ছি। মাল্টি স্টেট কো-অপারেটিভের প্রসার ঘটবে। ২০২০-২১ সালে ৭৫ হাজার কোটি টাকা কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। ৪৩.৬ লাখ কৃষক এর ফলে উপকৃত হয়েছেন।

ভারতের অর্থমন্ত্রী বলেন ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কৃষকদের থেকে ফসল কেনা হবে। কৃষকদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে ১৫.৫ লাখ কোটি টাকা। মৎস্যচাষিরাও ঋণ পাচ্ছেন। ১.৮৬ কোটি কৃষক অনলাইন কৃষি বাজারের দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন। আধুনিক মৎস্যচাষের জন্য বন্দর নির্মাণে আমরা বরাদ্দ বাড়াচ্ছি। এর ফলে অনেক কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এক দেশ এক রেশন কার্ড চালু হবে। যারা পরিবার থেকে দূরে আছেন, তারাও এই কার্ড দেখিয়ে রেশন পাবেন। ৩২টি রাজ্যে এই প্রকল্প চালু হবে। তাছাড়া ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশনের জন্য স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া নামে নতুন প্রকল্প হল। এমএসএমই সেক্টরের সাহায্যে বরাদ্দ করা হচ্ছে। ১৫ হাজার স্কুলকে নতুন এডুকেশন পলিসির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করছি। হায়ার এডুকেশন কমিশন তৈরি হবে। তার আওতায় ইউনিভার্সিটি, কলেজগুলি থাকবে। লাদাখে উচ্চশিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা হচ্ছে। আদিবাসী এলাকায় ৭৫৮টি নতুন বিদ্যালয় ও তফসিলি জাতিদের জন্য পোস্ট ম্যাট্রিক স্কলারশিপ স্কিমে বরাদ্দ বাড়বে। চার কোটি ছাত্র উপকৃত হবেন। প্রফেশনাল অ্যাপ্রেনটিসশিপ ট্রেনিং স্কিম চালু হচ্ছে। ডিজিট্যাল ট্রানজাকশনের জন্য ৫ হাজার কোটি বরাদ্দ রয়েছে। ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ ট্রানস্লেশন মিশন চালু হবে। আমাদের আইনি ব্যবস্থা আরও উন্নত করা হবে। ন্যাশনাল নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কমিশন তৈরি হবে। চা শিল্পের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

ভারতের অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন ৯.৫ শতাংশ রাজকোষ ঘাটতি হয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বাজার থেকে ধার করবে। ৮০ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তোলা হবে। ২০২১-২২ সালে রাজকোষ ঘাটতি ৬.৮ শতাংশ হতে পারে। বাজার থেকে ১২ লাখ কোটি টাকা ধার করা হবে।

এফআরবিএম অ্যাক্ট বদলানো হচ্ছে। রাজ্যগুলি করের ৪১ শতাংশ পাবে। তবে করদাতাদের ওপরে যথাসম্ভব কম চাপ দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রত্যক্ষ করে সংস্কার করা হয়েছিল। রিবেট বাড়ানো হয়েছিল। আমরা সিনিয়র সিটিজেনদের ছাড় দিয়েছি। বয়স্ক নাগরিকদের জন্য আমরা বিশেষভাবে চিন্তিত। যাদের বয়স ৭৫ বা তার বেশি, তাদের সুদের আয়ে সম্পূর্ণ ছাড়। ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট রি-ওপেন তিন বছরের মধ্যে করতে হবে। কর নিয়ে মামলা কমাতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য জিরো কুপন বন্ড যাতে সহজে বাজারে আসে তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নির্মলা সীতারমন বলেন কম দামে যাতে বাড়ি পাওয়া যায়, তার জন্য ট্যাক্স হলিডে আরও কিছুদিন বাড়ানো হল। গৃহঋণের সুদ ১.৫ লাখ রুপি করমুক্ত। স্টার্ট আপদের জন্য ট্যাক্স হলিডে আরও বাড়ানো হল। জিএসটি চালু হয়েছে চার বছর আগে। তা আরও সহজ করা হয়েছে। শুল্ক নীতি তৈরি করা হয়েছে দেশীয় শিল্পের দিকে লক্ষ্য রেখে। ৮০টি পুরানো নিয়ম পুনর্বিবেচনা করব। এনআরআইদের ডবল ট্যাক্সেশন যাতে না হয়, তার জন্য নিয়ম পরিবর্তন করা হবে। মোবাইল ও চার্জার রফতানি করছি। তাদের ওপরে ২.৬ শতাংশ রফতানি শুল্ক ধার্য করা হল। আগে শুল্ক দিতে হত না। সোনা ও রুপোর ওপরে আমদানিশুল্ক কিছুটা বদলাবে। সোলার লণ্ঠনের ওপরে শুল্ক বাড়ানো হল। টানেল বোরিং মেশিনের ওপরে আমদানি শুল্ক বাড়ানো হল। বস্ত্রশিল্প ও চামড়া শিল্পের ওপরে আমদানিশুল্কের পরিবর্তন ঘটবে। তুলোর ওপরে আমদানি শুল্ক বাড়ানো হল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত