প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিদ্দিক মাহমুদ : ১০২১ বছর ধরে বাংলাদেশে যারা ইসলামে জন্মেছেন, ইসলামে বড় হয়েছেন, ইসলামে মরেছেন, তারা নাকি ‘সহি’ভাবে কোরআন পড়েননি!

সিদ্দিক মাহমুদ : আনুমানিক ১০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে ইসলাম এসেছে। ইদানীং অনেক ‘পণ্ডিত’ বলা শুরু করেছেন, এই ১০২১ বছর ধরে বাংলাদেশে যারা ইসলামে জন্মেছেন, ইসলামে বড় হয়েছেন, ইসলামে মরেছেন, তারা নাকি ‘সহি’ ভাবে কোরআন পড়েননি, সব ভুল পড়েছেন। এখন দেশে, বিদেশে বড় বড় ‘ইসলামিক সেন্টারে’ লাখ লাখ ডলার খরচ করে ‘সহি’ভাবে কোরআন শিখছেন। কথাটা শুনে হায় হায় করতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার।

আমার বাবা, দাদা, নানা, ১৪ পুরুষ ‘সহি’ ভাবে কোরআন না শিখে তো দোজখে পুড়ে মরছেন! আমি ইসলামের ইতিহাস নিয়ে কিঞ্চিত নাড়াচাড়া করেছি স্কুলে আমাকে আরবি গ্রামার পড়তে হতো, কঠিন সে গ্রামার। নাসারা নাসারা নাসার, নাসারাত নাসারতা নাসারতুম, নাসারতি নাসারতুমা নাসারতুন্না, নাসারতু নাসারনা নাসারনা। এই রকম শব্দরূপ, ব্যাকরণরূপ মুখস্ত করতে হতো। তখন আমার বয়স কতোই বা ১২/১৩ হবে? এছাড়া আরবি সাহিত্য, গল্প, কবিতা, কোরআন-এর ৪০টা আয়াত আর ৪০টা হাদিস আরবিতে মুখস্ত করে পরীক্ষার খাতায় আরবিতে ও বাংলা অর্থ লিখতে হতো। সেটা ‘হিন্দু ভারতে’ ১৯৬২-৬৫ সালের কথা। আজকাল ‘মুসলিম বাংলাদেশে’ স্কুলে কি আরবি শিখছি? নবী করিম (সা.) পৃথিবীতে ইসলাম কায়েম করার পর মদিনাতে তার ‘অফিস’ স্থাপন করেন। তারপর সেই রাষ্ট্র-প্রধানের অফিস সিরিয়ার দামেস্ক, ইরাকের বাগদাদ, ঘুরে ঘুরে কায়রোতে এসে থিতু হয় বহুকাল।

আমি যখন কিশোর, তখন মিশর থেকে প্রথম লং প্লেয়িং রেকর্ডে সমগ্র কোরআন তেলাওয়াত সারা বিশ্বে বিলি করা হয়। এর এক সেট ৩৬টা রেকর্ড আমার এক বন্ধুর চাচা পেয়েছিলেন। সে কালে তিনি পাড়ায় জাস্টিস অব পিস ছিলেন। তিনি কলকাতার যে বাসায় থাকতেন তার ঠিক পেছনের বাড়িতে আমরা থাকতাম। আর সে সময়ে তার সঙ্গে আমাদের বাড়ির খুব ঘনিষ্ঠতা ছিলো। আমরা তার বাসায় গিয়ে প্রায়ই সেই মিশরীয় তেলাওয়াত শুনতাম।

সেই যুগে আরবের ‘মহান’ বাদশাহ রিয়াদে বসে মউজ-মস্তি করতেন, ইসলামের কোনো কাজ করতেন বলে শুনিনি। বরং আমাদের যারা হজ্বে যেতেন তাদের বলতে শুনেছি, ‘একটু বেশি করে শুকনো খাবার নিয়ে যেতে হবে, আমাদের আরবের ভাইরা খুব অভাবে আছেন।’ আর আজ সেই সৌদি বাদশাহ কোরআন রক্ষায় মহা ব্যস্ত হয়ে দেশে দেশে টাকা ছড়াচ্ছেন আর আমাদের ‘সহি’ ভাবে কোরআন শিখাতে আরম্ভ করেছেন। কোরআনে আছে, ‘ওয়া রাত্তিলেল কোরআনে তারতিলা’ ‘(তোমরা) স্পষ্ট উচ্চারণে কোরআন পড়ো।’ বিজ্ঞান বলছে, ভাষা প্রতি ৫০ মাইল অন্তর বদলে যায়। তাই ঢাকার উচ্চারণ আর সিলেটি উচারণ এক নয়। আবার ঢাকার বর্তমান উচ্চারণ, ‘করসে’, ‘খাইসে’, ‘গেসে’ কিন্তু ভদ্র উচ্চারণ নয়। তাই আরবের মক্কার উচ্চারণ, মদিনার উচ্চারণ থেকে আলাদা, রিয়াদের উচ্চারণও আলাদা। জাপানের মানুষ ‘ল’ উচ্চারণ করতে পারে না, ‘র’ বলে। ওরা ‘বাংরাদেশ’ বলে।

আরবরা ‘পাকিস্তান’কে ‘বাকিস্তান’ বলতো। আমার কথা হলো, আমি কোনটা আগে করবো? আমার বাবা-পিতামহের উচ্চারণ শুদ্ধ করবো? না, কোরআন-হাদিসে যে সব নির্দেশ পালন করতে বলা হয়েছে সেটা সঠিকভাবে পালন করবো? আমি হারাম খাবো না, মিথ্যা কথা বলবো না, মানুষকে কষ্ট দেবো না, প্রতারণা করবো না, চারপাশের এতিম-মিসকিন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে সাহায্য করবো, মিষ্টি কথা বলবো, কুৎসিত কথা বলবো না, সকলের উপকার করবো, কারো বাসায় গেলে গৃহকর্তার জন্য উপহার নিয়ে যাবো। আরো কতো কতো নির্দেশ আছে! কোনোটাই তো পালন করি না। অথচ টাকা খরচ করে শুদ্ধ উচ্চারণ শিখছি।

আল্লাহ আমাদের এ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন আমার চারপাশের মানুষদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য, সাহায্য-সহযোগীতা করার জন্য, তার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য। আমার ব্যবহারে আমার প্রতিবেশী কষ্ট পেলো, ভাই কষ্ট পেলো, আর আমি ইবাদত করলাম, চিল্লার পর চিল্লা করলাম, শুদ্ধ উচ্চারণে কোরআন তিলাওয়াত করলাম। এটা ইবাদত না। এটা আল্লাহর নির্দেশনা। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত