প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফরেন বডি যখন লোকাল বডি !

ডেস্ক রিপোর্ট : বিকৃত যৌনরুচির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যের প্রসার দেশের বাজারে ক্রমেই বাড়ছে। যে কেউ একটি কল করেই অনলাইনের বিভিন্ন নামি-বেনামি প্রতিষ্ঠান থেকে মারাত্মক ক্ষতিকর এসব পণ্য হাতে পেয়ে যাচ্ছেন। এসব পণ্যের ভেতর রয়েছে যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রা ট্যাবলেটও। এই ট্যাবলেট কিনতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বাধ্যতামূলক হলেও যে কেউ ফার্মেসিতে বা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে কিনতে পারছেন। সময়নিউজকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ধরনের পণ্য আমাদের তরুণ সমাজকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাতেও এসব পণ্য ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে। মাদকের ভয়াল ছোবলের মতোই বিকৃত যৌনরুচির এসব উপাদান বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। প্রশ্নের মুখে পড়েছে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ।

সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে ধর্ষণের পর রক্তক্ষরণে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আনুশকা নূর আমিন নামের ঐ ছাত্রীর দেহে ‘ফরেন বডি’র আলামত মিলেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনুশকার ময়নাতদন্ত হয়। সেখানকার ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কে এতটা ভয়াবহ পরিণতি হওয়ার কথা নয়। শরীরের নিম্নাঙ্গে কোন ‘ফরেন বডি’ জাতীয় কিছু একটা ব্যবহার করা হয়েছে। এক কথায় সেখানে বিকৃত যৌনাচার করা হয়েছে।

এদিকে দেশে ইয়াবা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলেও অন্যান্য যৌন উত্তেজক ওষুধ নিয়ে নেই কোনও তৎপরতা। দেশের বাজারে ‘পাওয়ার’ নামে অবাধে ছড়িয়ে পড়ছে এসব ওষুধ। আর এসব পাওয়ারের ফাঁদে পড়ে আক্রান্ত হচ্ছে যুবক-যুবতীরা। সূত্রে জানা যায়, আমদানি ও বিপণন নিষিদ্ধ এসব উত্তেজক ওষুধের বাণিজ্য চলছে গোপনে। দেশের বাজারে এসব ওষুধ আসছে বিভিন্ন চোরাপথে। বিক্রেতারা এসব ওষুধকে ‘পাওয়ার’ বলে অভিহিত করছেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা ও সারা দেশের খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা রাজধানীর মিটফোর্ড ও চানখাঁরপুল থেকে দেশি-বিদেশি উত্তেজক ওষুধ কিনে এলাকায় চড়া দামে বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতারা এসব ওষুধকে পাওয়ার বলে ডাকেন। অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে তারা পাওয়ারও নিয়ে নেন প্রয়োজনমতো। শাহবাগ, ধানমন্ডি, শেরে বাংলানগরসহ সবখানেই পাওয়ার খুচরা বিক্রি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও মাদকবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওষুধ এক ধরনের মাদক। আসক্তি বাড়ানো ওষুধগুলো শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এক শ্রেণির অপচিকৎসায় এ ধরনের ওষুধের মাধ্যমে যৌন দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা চালানো হয়। ওই সব কথিত চিকিৎসক এ ধরনের ওষুধ-বাণিজ্যের সিন্ডিকেটেও জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কয়েকজন ওষুধ বিক্রেতা জানান, সরদার মার্কেটকে বলা হয় ইন্ডিয়ান মার্কেট। এ মার্কেটের নিচতলার দোকানগুলোতেই পাওয়ার ওষুধ বেশি বিকিকিনি হয়। এ ছাড়া হাবিব মার্কেটসহ সব মার্কেটে এখন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি হয়। রাজধানীর অভিজাত এলাকার ওষুধের দোকানেই বিক্রি বেশি। উচ্চবিত্ত শ্রেণির যুবক-যুবতীরা এসব ওষুধ খাচ্ছে। কিছু উত্তেজক ওষুধ খেলে চেহারার লাবণ্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এ কারণে শখ করে খায় অনেকে। উত্তেজনার পাশাপাশি নেশার কারণে ইয়াবা বেশি প্রচলিত হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আইসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, ইন্টাগ্রাসহ বিভিন্ন ওষুধে আসক্ত হয়ে পড়েছে যুবসমাজ।

বিভিন্ন ফার্মেসির বিক্রেতারা জানান, বাজারে ভারতের ইন্টাগ্রা’ ৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। আমেরিকার ভায়াগ্রার প্রতি ট্যাবলেটের মূল্য ৭৫০ টাকা। ভারতের সেনেগ্রা ও কামাগ্রা প্রতি ট্যাবলেট ৫০ থেকে ৭০ টাকা। সেনেগ্রা, টেনেগ্রা, ফরজেস্ট, ক্যাবেটরা, টার্গেট ও ইডেগ্রা বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানান বিক্রেতারা। অধিকাংশ ওষুধের গায়ে মূল্য, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ লেখা থাকে না। আমেরিকার টাইটানিক এক বোতলের দাম চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। খুচরা ট্যাবলেট ৪০০ টাকা। টাইটানিকে ইয়াবার মতো উত্তেজনার পাশাপাশি নেশা হয়। তাই ইয়াবার ক্রেতারা কেউ কেউ টাইটানিক সেবন করছেন। কম দামে পাওয়া যাচ্ছে চীনের জিয়ংবার। একটি ট্যাবলেটের দাম ৭০ টাকা। জিনসিন পাস ৯০০ টাকার দরে বিক্রি হয়। পাওয়া যাচ্ছে দেশে তৈরি উত্তেজক ওষুধও।

মিটফোর্ডের ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অভিযানের অভাবেই এসব ওষুধ বিক্রি হয়। তাই অনেকে দোকানে নিষিদ্ধ উত্তেজক ওষুধ রাখেন। বিদেশি আমদানি-নিষিদ্ধ ওষুধের আদলে এখন দেশি কোম্পানি উত্তেজক ওষুধ বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে। ওষুধ প্রশাসন ওই সব ওষুধের অনুমোদনও দিয়ে থাকে।

ওষুধ প্রশাসন কর্মকর্তারা বলেন, উত্তেজক ওষুধ হিসেবে যেসব ওষুধ বাজারে বিক্রি হয় তা ভেজাল এবং অনুমোদনহীন। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেরা তৈরি করে বিদেশি সিল লাগিয়ে দিচ্ছেন। ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ক্ষতিকর সব উপাদান আছে।
উত্তেজক ওষুধে আসক্ত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে কৌতূহলেই খাওয়া শুরু করেন তারা। ভালো লাগা থেকে এখন আসক্তি ও নেশা। কেউ কেউ বিশেষ শারীরিক ক্ষমতা বাড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করেন। পরে ওষুধ না খেলে তারা স্বস্তি পান না।

জানা গেছে, কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ এবং উত্তরাঞ্চলের ভারতের সীমান্ত হয়ে ইয়াবার সঙ্গে উত্তেজক ওষুধের চালান আসে দেশে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত দু’বছর আগে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন লাগেজ আমদানি-নিষিদ্ধ ওষুধ আটক করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। তবে লাগেজ বহনকারী সন্দেহভাজন পাকিস্তানি নাগরিক পালিয়ে যায়। ২০০৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকালে কার্গো ভিলেজে পড়ে থাকা পাঁচটি বড় কার্টন কাস্টমস কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতিতে খুলে দেখেন কয়েক হাজার পিস উত্তেজক ওষুধ।

ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক মো. আজিজুল ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন । উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই বিষয়গুলোকে সোশিও-কালচারাল (সামাজিক-সাংস্কৃতিক) প্রেক্ষিতে নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু একটা ‘সেক্টর’ থেকে ভাবলে তা ভুল হবে। বর্তমানে আমরা ডিজিটালাইজেশনের নামে প্রগতির অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছি। পশ্চিমা কালচারের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা বড় বিপদ ডেকে আনছি।

মধ্যবিত্তের যে সংস্কৃতি তা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে বিকৃত যৌন লালসা সমাজে জায়গা করে নিচ্ছে বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক। তিনি বলেন প্রতিষ্ঠান শিক্ষা দিচ্ছে না, সন্তান কী করছে তার খোঁজ রাখছি না আমরা।

দেশে সেক্স এডুকেশন দরকার কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে এই অধ্যাপক বলেন, আমি এটা বলব না যে দরকার নেই আবার এটাও বলব না ঢালাওভাবে দরকার আছে। এটার জন্য হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত টিম জানাবে ঠিক কতটুকু যৌনশিক্ষা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ মাথায় রেখে আমাদের জন্য জরুরি।

ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী যেকোনো ধরনের অবৈধ পণ্য বিক্রি অপরাধ। এজন্য আইনে জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী নিয়ম ভঙ্গ করে ওষুধ বিক্রি করা অপরাধ। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভায়াগ্রা বিক্রি করলে অন্যান্য আইন ছাড়াও এই আইনে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এসব অবৈধ পণ্য বিক্রির বিরুদ্ধে করণীয় কী তা জানতে চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক ও সরকারের উপসচিব মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, অবৈধ পণ্য বিক্রি করলে ভোক্তা অধিকার আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। আমরা অভিযোগ পেলেই মহাপরিচালক স্যারের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্থা নেব। এখন কেউ ফেসবুকে পেজ খুলে বা ইউটিউবে চ্যানেল খুলে এসব বিক্রি শুরু করলে হুট করে আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। এজন্য দেশের কোথাও এমন পণ্য বিক্রি হলে আমাদেরকে জানানোর অনুরোধ করছি।

এসব অবৈধ পণ্য যেন দেশের ভিতরে ঢুকতে না পারে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে আরো সচেতন থাকার আহ্বান জানান মনজুর শাহরিয়ার।

এদিকে ভায়াগ্রাখ্যাত এসব ওষুধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু অভিযান চালালেও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ‘যৌন উত্তেজক’ বলে প্রচার করা অনুমোদনহীন দেশীয় ওষুধের বাজারও বাড়ছে।

চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, পুরুষ-মহিলাদের মধ্যে ২ থেকে ৫ শতাংশের দুর্বলতা থাকতে পারে। ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশের মানসিক সমস্যা। সে জন্য বিভ্রান্ত হয়ে উত্তেজক ওষুধ খায় অনেকে। এসব ওষুধ হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি কমে যায়। এতে লিভার ও নার্ভ ড্যামেজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)’র মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, কোনো ওষুধই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়। ইদানীং দেশে যুব সমাজের মধ্যে যৌন উত্তেজক ওষুধ সেবনের মাত্রা বেড়ে গেছে। এতে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। হতে পারে জটিল রোগও। তাই এই ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক এক নেতা বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী প্রকাশ্যেই উত্তেজক ওষুধ বিক্রি করেন। কেউ কেউ অকারণে ব্যবহার করছে এই ওষুধ। আগে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে আসলেও এখন ভারত থেকেই বেশি আসছে যৌন উত্তেজক ওষুধ। নীতিমালা নেই। ক্রেতা-বিক্রেতার সচেতন হওয়া উচিত। ঢালাওভাবে বিক্রি করা উচিত নয়। এই ওষুধ ব্যবহারে কঠিন হওয়া উচিত বলে এই নেতা মনে করেন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা যাবে না।
সূত্র- বিডিমর্নিং

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত