প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: অকল্যাণের ছেলেখেলা

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী:  মরে যাবার পরেও তাঁর মুখে হতাশার চিহ্নটা অবিকল রয়ে গেছে পুরো মুখ জুড়েই। কে জানে মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে মানুষ কি দেখতে পায়? এরা ‘প্রান’ বিষয়টাকে কত ভাবেই না বর্ণনা করে গেছে, বোকার দল সব। যে এর স্বাদ অনুভব করেনি সে কিছুতেই মৃত্যুর সংজ্ঞা লিখতে পারবে না। আবার যে লিখতে পারবে তাঁর পক্ষে কলম হাঁতে নেবার সুযোগ হবে না। মানুষ বড় বেশি অদ্ভুত আর কল্পনাপ্রবন- খাটিয়ায় শুয়ে শুয়েই ভাবছিল সাদা কাপড়ে মোড়ানো শবটি। সে ভাবছিল মৃত্যুর পর এই যে দ্বিতীয় জীবন শুরু হল, এখানে সে অনেক বেশি স্বাধীন। তবে আরেকটা ব্যাপার তাঁকে বিষ্মিত করলো। মৃত্যু সংবাদ পেয়ে-ই তাঁর স্ত্রী সর্ব প্রথম মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলেছে। তারপর কেঁদে টেদে বেহুশ হচ্ছে, হুশ ফিরছে, আবার বেহুশ হচ্ছে আবার হুশ ফিরছে……… সব-ই সাজানো।

 

সরকারের সাবেক এই শীর্ষ কর্তা আজীবন কাজ করেছেন অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে। এখন তিনি যা দেখছেন, তা হলো যার জন্য সারাটা জীবন খুইয়েছেন, সেই স্ত্রী কান্নার নাটক পরিবেশন করছে। বাইরে যারা অপেক্ষমান তারা অনেকে-ই মনে মনে সন্তুষ্ট। সবচে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো- যখন ইচ্ছে চাইলেই যে কারো দেহে সে প্রবেশ করতে পারছে, যখন ইচ্ছে বাইরে এসে মানুষের কার্যকলাপ দেখতে পারছে, নিজে নিজে চিন্তা করতে পারছে। সবচে বেশি পারছে মানুষের মনের কথা বুঝতে। কে কি চিন্তা করছে, কি কি করে এসেছে, কে অজু ছাড়াই টুপি পড়ে বসে আছে সব কিছুই সে জানে। বেঁচে থাকলে এই সবের কিছু কোনোদিনই জানা সম্ভব হতো না । একটা বিষয়ে সে এক ধরনের শিহরন অনুভব করছে- কেউ তাঁর কথা শুনছে না। সে কানের কাছে গিয়ে চিৎকার করে চেষ্টা করে এসেছে। লাভ হয়নি। কেউ তাঁর কোন কথা শুনেনি। এমনকি ফিরেও তাকায়নি কেউ।

 

একটা সময় ছিল যখন সরকারের নীতি নির্ধারকেরাও তাঁর ভয়ে কাঁপত। সে দোষীর দিকে জীবনে দুইবার তাকানোর প্রয়োজন কখনো-ই অনুভব করেনি।

 

বাবলু, জামিল সাহেবের দ্বিতীয় সন্তান। পিতাকে সে ঈশ্বর জ্ঞান করে। সেই বাবলুই এখন চোখ মুছতে মুছতে খাটিয়া ধরে এগুচ্ছে। দলটা যাচ্ছে গোরস্থানের দিকে। কথাটা মনে হতেই জামিল সাহেবের বুকটা প্রচন্ড মোচড় দিয়ে উঠল। এরা কি এখন তাকে একা ফেলে চলে আসবে? কবরের ভিতর কি সত্য সত্যই বড় বড় সাপ বের হয়? এসব ভাবতে চাইছে না জামিল সাহেব নামের এই মহানগর এই দেশ দাবড়ে বেড়ানো পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মি জামিল ইমাম বিপিএম, পিপিএম। আতংকে তাঁর বমি করতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাপ ছাড়া বাবলু নামের এই ছেলেটা একটা দিনও থাকতে পারবেনা। জামিল সাহেবের একবার ইচ্ছা হল, লাফ দিয়ে খাটিয়া থেকে নিচে নেমে আসে, ছেলের হাত ধরে দুর কোথাও চলে যায়। এই পরিবারে এক বাবলু ছাড়া আর কেউ তাকে ভালবাসে না- এই সত্যের প্রমান মিলল কিছুক্ষন মাত্র আগে। মারা যাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই স্ত্রীর গোপন উলঙ্গ উল্লাস প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছে এ জনমের সকল কালী-ই বাবলুর মা জানত। মহিলা কাঁদছিল অঝোরে। এসবের মাঝেই তাঁর পুলক ছিল। সে মনে মনে দেখতে চাইছিল, আল্লায় জামিল সাহেবের হাত দুটো আর লিঙ্গটার কি ব্যাবস্থা করেন। নিজের এতকালের জীবন সঙ্গিনীর এমন চাপা উল্লাসে মৃত জামিল সাহেবের আত্মা ভেঙ্গে খান খান হয়ে গিয়েছে।

 

সরকারের চির অনুগত এই পুলিশ মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন নিষ্ঠার সাথে। সামান্য আলুর দোষ ছাড়া বলতে গেলে আপত্তিকর কিছু তাঁর চরিত্রে ছিল না। শুধু অল্প বয়সী কোন মেয়েকে ধরার সুযোগ পেলে এমন কায়দা করে বুকে চিপা দিয়ে ধরতেন যেন পরবর্তীতে এই মেয়ে জীবনে কোনদিন আর ‘রা’ শব্দটাও না করে। এইসব নিয়া বড় কোন অভিযোগ চাকরি জীবনে সামনে আসে নাই। ভদ্রলোক বেশ সাবধানী ছিলেন। এক পায়ুকামী সাংবাদিক মতি না কি যেন নাম, একবার হাঁতে নাতে পাকড়াও করেও মাফ করে দিয়েছিলেন মৌখিক কিছু শর্তের ভিত্তিতে। সাংবাদিক মতি এক জীবনে এর প্রতিদান দিয়েছে কড়ায় গণ্ডায়। জামিল সাহেবের ক্যারিয়ার ক্লিন রাখার ক্ষেত্রে এই সাংবাদিকের অবদানকে খাটো করার কোন সুযোগ নেই। গত ছয় বছরে ইনি ( জামিল সাহেব ) নিজ হাঁতে ১৮ টা সন্ত্রাসী মৌলবাদীকে পরপারে পাঠিয়েছেন যথারীতি কোন রকম সমালোচনা ছাড়াই। এর মধ্যে এক মে মাসের অপারেশন বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এক রাতে ছয় ছয়জন। ………শালার বাইনচোতেরা চিড়া মুড়ি নিয়া আসছিল দিনের পর দিন অবস্থান ধর্মগট করতে – নিজ মনেই এ বাক্যটা বিড়বিড় করে যাচ্ছিলেন বিশেষ দায়িত্ব পাওয়া এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। শেষ লোকটাকে শিকার করার আগ মুহূর্তে জামিল সাহেব উল্লসিত হয়েই বলেছিলেন,- বাংলার মাটিতে এদের ঠাই হবেনা কখনো। এত কিছুর পরেও তিনি খুবই আস্থাশীল ছিলেন কেউ না জানার ব্যাপারে। কিন্তু আজ দুপুরে মারা যাওয়ার আধাঘন্টার ভিতরেই টের পেলেন, মানুষের মনে নানান কথা ঘুরছে। গরিব আত্মীয় স্বজনদের একটা বড় অংশ এই বাসায় এসে জড় হয়েছে। এদের কারো কারো পেটিকোটের নিচে সুন্দর সুন্দর কাপড়ের সেলাই করা থলি। এরা পাগলের মত এটা সেটা খুজছে। জামিলের মৃত্যু নিয়ে এদের কারো কোন রকম শোঁক নেই। এরা এসেছে বাড়ির সবার মাথা গরম থাকতে থাকতেই জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে…… এরা লাশের আশ পাশ থেকেই চুরির কাজটা করে যাচ্ছে। যে বাসার একজন চোর সেই বাসার সবাই কম বেশি চোর কিনা কে জানে?

 

আজ দিনটাই যেন জামিল সাহেবের জন্য অশুভ ছিল। সকালে ফুরফুরে মেজাজে অফিসে গিয়ে শুনেন রায়ের বাজারে অর্ধ নগ্ন যুবতীর লাশ পরে আছে। যে কনস্টেবল এসে খবর দিল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ভিক্টিমের কোমরের উপর অংশ উদাম নাকি নিচের অংশ উদাম ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও ঘণ্টা তিনেক লেগে যাবে ভেবে নিজেই রওনা হলেন পুলিশ সদর দপ্তরের বড় কর্তা মি জামিল ইমাম। বেশ কিছুদিন ক্যামেরার সামনে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। এই সুযোগে……. এক ঢিলে না হয় বহু বার্ড শিকার হোক। সাংবাদিক গাধাটাকে ফোন দিয়ে স্পটের লোকেশন জানিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন জামিল সাহেব । গিয়ে দেখেন রাস্তার এক আধা বুড়ি ফকিন্নি মরে পরে আছে। এই কেসটা যে কেউ সলভ করতে পারত। অথচ এর জন্যই কিনা আজকের সারাটা দিন মাটি। স্থানীয় থানার একজন সেকেন্ড অফিসারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে অফিসে ফিরে আসার পথেই ফাকা রাস্তায় আচমকা একটা ইটের আঘাতে মারা পড়লেন চির তরুন চির চৌকস এই পুলিশ কর্তা। আর এখন তাকে খাটিয়ায় করে আনা হয়েছে গোরস্থানের ইদ্গাহে। সামান্য কিছু পরিচিত বান্ধু বান্ধব এসেছে, এসেছে কিছু আত্মীয় স্বজন কিন্তু তারপরেও পুরো প্রান্তর যেন বড্ড ফাকা ফাকা লাগল। দুটো অপরিচিত কিশোর এসেছে, কথা বলছে ফিসফিস করে চাপা গোঙ্গানির মত আওয়াজ করে। আশ্চর্য এতক্ষন খেয়ালই করা হয়নি ওই ছেলে দুটোর আশ পাশেই হাঁটাহাঁটি করছে জামিল সাহেবের মতই আরেকটা আত্মা। কত সাবলীল আনন্দময় চলাফেরা। মজার ব্যাপার, এই তিনজনকেই জামিল সাহেবের কাছে পরিচিত পরিচিত মনে হল। কিশোর দুটি দু ভাই এটা প্রায় নিশ্চিত কিন্তু ছায়ার চেহারা এখনো ভাল ভাবে চিনতে পারেননি সদ্য সাবেক এই পুলিশ কর্তা।

 

ইমাম সাহেব জানাজার নামাজ শুরু করে দিয়েছেন। জামিল সাহেবের কেন যেন অস্থির লাগছে। ছেলে দুটো নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন বাবলুর বিষয়ে কথা হচ্ছে। এরা বাবলুকে খুন করতে এসেছে, গলা কেটে খুন করবে। তাঁদের চোখ আনন্দে চকচক করছে । জানাজার নামাজে দুজন এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যে, বাবলু চাইলেও পালাতে পারবে না। বাবলু ঢাকার খোঁয়াড়ে বড় হয়েছে। দুনিয়াদারি চেনে কম। সাদা ছায়াটা জামিল সাহেবের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে – মুখ ভর্তি হাসি। ও আচ্ছা , এই লোকটি তাহলে ছেলে দুটোর বাবা। মানুষ খুন করতে করতে এক সময় হাত নিশপিশ করত। সারাক্ষন ইচ্ছে করত একটা গুলি করি। খুন করাটাও এক সময় নেশায় পরিনিত হয়। তখন খুন না করলে আর কিচ্ছু ভাল লাগেনা। এই ছেলেখেলা তাকে পেয়ে বসেছিল। তবে বেশিদিন না। অল্প কয়দিন পরেই খুনের এই খেলা বন্ধ করে দেন তিনি । জামিল সাহেব জানতেন বিষয়টা চুকে গেছে কিন্তু এখন দেখছেন এই ঘটনা নতুন ভাবে দৃশ্যায়ন হচ্ছে। জামিল সাহেব ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, এই সামান্য ঘটনাটাও এক সময় এভাবে ফিরে আসবে। সব কিছুর হিসেব হবে। সব কিছুর হিসেব হবে…………

বিঃদ্রঃ জানাজায় এত মানুষ হয়েছে যে স্থান সঙ্কুলান করা যাচ্ছে না। ইমাম সাহেব গত ত্রিশ বছরে এত মানুষ কোন জানাযায় দেখেননি। জানাজা পড়ানোর সময় মনে হল আজ তাঁর পিছনে শুধু মুসুল্লিই না, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ফেরেস্তাও যেন সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছে। এত এত অচেনা মানুষ এল কোত্থেকে ? চরম বিচলিত ইমাম কিছুটা এলোমেলো অবস্থায় জানাজার নামাজ শেষ করলেন। লাশ কবরে শোয়ানোর সময় তার মনে হল এখান অন্য কোন আলো এসেছে, অপার্থিব কোন আলো। পুরো কবর যেন ঝলমল করছে সে আলোয় । ইমাম সাহেব দ্রুত তিন চাকা মাটি কবরে রেখে বাবলুর জন্য হাত তুললেন, মহান আল্লাহর দরবারে কি চাইবেন কি বলবেন কোনকিছু আজ মাথায় আসছে না । পুরো মাথা যেন কিছুক্ষনের জন্য ফাকা হয়ে গেছে । তার চোখ বেয়ে অনবরত পানি পড়ছে । তিনি যেন জীবনে এই প্রথম স্বর্গবাসী বিশেষ কোন মেহমানকে বিদায় দিয়ে এলেন । বোকা, ভিতু আর জামিল সাহেবের ন্যাওটা বাবলু কাল রাতে খুন হয়েছে । আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন। আমিন।

( পুরোটাই কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কোনও ব্যক্তির সঙ্গে এই লেখায় বর্ণিত ঘটনাবলীর কোনও মিল নেই)

লেখক: ডেন্টাল সার্জন, কলামিস্ট

সর্বাধিক পঠিত