প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আসল মায়ের কোলে ছোট্ট হাবিবা

নিউজ ডেস্ক: মিরপুরের শাহ আলীর হাজী রোডের ঝিলপাড় বস্তির সামনে সোমবার মূল সড়কে ছোট্ট দুই বোন খেলছিল। ওই দিনই শীতের দুপুরে কোমল রোদে ৮ বছর বয়সের লামিয়া আক্তার আয়শা ও পাঁচ মাস বয়সের উম্মে হাবিবার সামনে সুমাইয়া আক্তার মালা নামে মধ্য বয়সের এক নারী এসে হাজির হন। ওই নারী আয়শাকে বলেন, ‘আমি তোমাদের খালা। তোমরা আমাকে চেনো না। তোমাদের মা আমার বোন। তোমাদের চিপস ও খেলনা কিনে দেব।’ এভাবেই ফুসলিয়ে দুই শিশুকে নিয়ে ঝিলপাড় বস্তি এলাকা ত্যাগ করেন ওই নারী। রাইনখোলা বাজারের কাছে এসে একটি দোকান থেকে শিশু দুটিকে পুতুল, ফুল, চকলেট ও খেলনা কিনে দেন তিনি। এরপর তাদের নিয়ে টেকনিক্যাল মোড়ের দিকে রওনা হন। সেখানে গিয়ে কৌশলে আয়শাকে রাস্তার ওপর ফেলে ৫ মাসের হাবিবাকে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসেন মালা। শিশুটিকে নিয়ে ফিরে যান সাভারের হেমায়েতপুরের পূর্বহাটি এলাকার বাসায়। ঘরে শিশুটির আগমন উপলক্ষে মালা তার জমানো ৬ হাজার টাকা দিয়ে নতুন শীতের জামা, দুধ, বিভিন্ন ধরনের খাবার কিনে আনেন। তবে এক দিন পরই ঘোর ভাঙে মালার। পুলিশ ও আয়শার আসল মা-বাবা এসে দরজায় কড়া নাড়ে। মালাকে আটক করা হয়। আর শিশুটিকে মালার কোল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় আসল মা-বাবার কোলে।

এ ঘটনায় পুলিশ বলছে, হয়তো মায়ের ডাক শোনার জন্য মালা শিশুটিকে চুরি করেছেন। অথবা এমনও হতে পারে মালা সংঘবদ্ধ কোনো চক্রের সদস্য। তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। রিমান্ড আবেদন করে গতকাল বুধবার মালাকে আদালতে পাঠানো হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মালা পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে জনৈক আনোয়ার হোসেনের বিয়ে হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে। তবে তাদের সংসারে কোনো সন্তান ছিল না। একটি সন্তানের জন্য ব্যাকুল ছিলেন মালা। তার স্বামী আনোয়ার হোসেনের হেমায়েতপুরে একটি মুদি দোকান রয়েছে। কখনও স্বামীকে জানিয়ে, আবার কখনও না জানিয়ে হেমায়েতপুর থেকে ঢাকায় চলে আসতেন মালা। পরিকল্পনা করতেন লালন-পালনের জন্য কীভাবে একটি শিশু পেতে পারেন। বাচ্চার খোঁজ পেতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন। হাসপাতালের আশপাশে ঘোরাঘুরিও করতেন। সোমবার মিরপুরের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে মালার চোখ পড়ে আয়শা ও তার বোন হাবিবার ওপর। পরে অটোরিকশা করে দুই শিশুকে তুলে টেকনিক্যাল মোড়ে চলে যান। আয়শাকে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করার কথা বলে কৌশলে ছোট্ট শিশুকে নিয়ে পালিয়ে যান মালা। বাসায় ফিরেই স্বামীকে জানান যে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে কিনে এনেছেন তিনি। এরপর মালার কাছে তার স্বামী জানতে চান, কাগজপত্র সব ঠিকঠাক করে শিশুকে আনা হয়েছে কিনা। এর উত্তরে মালা জানান, বাবা-মায়ের সঙ্গে সব বোঝাপড়া ঠিকঠাক করেই শিশুটিকে এনেছেন তিনি।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি আ ফ ম মাহতাব উদ্দিন বলেন, শুধু নিঃসন্তান হওয়ার কারণে শিশু চুরি করেছিলেন নাকি এর নেপথ্যে অন্য ঘটনা রয়েছে তার তদন্ত শুরু হয়েছে। এর আগেও একবার মালা নামে এই নারী কারাভোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে। তখন তার কী অপরাধ ছিল তাও দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই মালা নামে এই নারীকে অনেক চতুর বলে মনে হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বড় সান্ত্বনা হলো, শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় আসল মা-বাবার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া গেছে।

পুলিশের দারুসসালাম জোনের এডিসি মাহমুদা আফরোজ লাকী জানান, সোমবার ‘৯৯৯’ থেকে ফোনে পুলিশকে জানানো হয়, টেকনিক্যাল মোড়ে ৭/৮ বছর বয়সের এক কন্যাশিশুকে পাওয়া গেছে। এরপর পুলিশ দ্রুত সেখানে পৌঁছে আয়শা নামে ওই শিশুকে উদ্ধার করে। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে তার আরেক বোনকে হারানোর তথ্য দেয়। এরই মধ্যে দুই শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। পরে পুলিশ ছোট্ট শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্নেষণ করে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় শিশুটিকে অপহরণ করে নেওয়া হয়েছে। এরপর প্রযুক্তিগত তদন্ত ও অন্যান্য সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে।

দুই শিশুর প্রকৃত বাবা গাড়িচালক দাদন মিয়া জানান, শিশুটিকে উদ্ধারের পর পুলিশ আদালতে হাজির করে। এরপর বুধবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে নিজ সন্তানকে তারা কোলে ফিরে পান। এর আগে দুই সন্তানকে হারানোর পর অনেক খোঁজ করেন তারা। তাদের না পেলে আত্মীয়স্বজন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। ওদের মায়ের কান্নাকাটির ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। ফেসবুকে এসব ছবি ও ভিডিও দেখে সাভার থেকে এক পরিচিত লোক জানান, তাদের এলাকার একটি বাসায় সোমবার রাতে এক শিশুকে নিয়ে আসা হয়। যাকে দেখতে হুবহু আমার শিশুর মতো। এরপর এলাকাবাসীও পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করে। সন্তান ফেরত পেয়ে অত্যন্ত খুশি দাদন মিয়ার পরিবার। সূত্র: সমকাল

সর্বাধিক পঠিত