প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. জাহিদ হোসেন: এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু একটা গুরুত্বপূর্ণ লিংক হবে

ড. জাহিদ হোসেন: পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যখন গাড়ি চলাচল করবে তখনই আমরা পদ্মা সেতু থেকে উপকার পাবো। তার আগে পাবো না। আমরা যদিও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করেছি, সেতুর মূল কাঠামো দাড় করিয়ে। এর সবগুলো স্পেন বসানো হয়েছে, কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হতে এখনো দেড় বছর সময় লাগবে। এটা মনে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে পদ্মা সেতু চালু হতে যতো দেরি হবে এর উপকারগুলোও ততো পিছিয়ে যাবে। পদ্মা সেতুর অবদান অর্থনীতিতে পেতে হলে আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটা হলো কতো তাড়াতাড়ি এটাকে চালু করা যায়, গাড়ি এবং রেল চলাচলের জন্য। কারণ পদ্মা সেতু নির্মাণে সবচেয়ে কঠিন যে কাজটা র্ছিলো সেটা শেষ। এখনো অনেক কাজ বাকি কিন্তু সেগুলো কারিগরি ভিত্তিতে এতোটা চ্যালেঞ্জিং নয়। পদ্মা সেতু চালু হলে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু উপকার পাওয়া যাবে। এগুলোর জন্য আর কিছু করতে হবে না। তার মধ্যে একটি হলো জনভোগান্তি কমবে, যেটা ফেরি চলাচলের জন্য হতো। যারা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে এদিক থেকে যাওয়া আসা করে। তাদের ফেরি ঘাটে গিয়ে যে জনভোগান্তি পোহাতে হতো, এখন সেটা আর থাকবে না। যাতায়াত অনেকটা প্রকৃতি নির্ভর ছিলো। নদীর পানি যদি খুব কমে যায় তাহলে ফেরি চলবে না, নদী খুব উত্তাল হয়ে গেলে ফেরি চলে না, ঘনকুয়াশা থাকলে ফেরি চলে না। অনেক কিছুই আগে জানা সম্ভব না। তাই নদীর ঘাটে গিয়ে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অনেক সময় দিনের পর দিন। এই যে জনভোগান্তি এটা টাকার অঙ্কে হিসাব-নিকাশ করা খুব কঠিন। পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য আমাদের আর প্রকৃতি নির্ভর থাকতে হবে না। এটা একটা বিরাট উন্নয়ন আমি বলবো।

দ্বিতীয়ত ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যাতায়াতের সময়টা অনেক কমে যাবে। অনেকেই হিসাব করে বলে পদ্মা সেতুর কারণে ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দূরত্ব একশ কিলোমিটার কমানোর সমান হবে। একশ কিলোমিটার কম হলে যে সময়টা কম লাগতো, পদ্মা সেতুর কারণে ঠিক একই সময় বা তার বেশি সময় কমবে। এর ফলে পবিবহনের তেল খরচ, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক কমে যাবে। এগুলো একেবারে তাৎক্ষণিক। উপকারের জন্য শুধু পদ্মা সেতুটা যানবাহনের জন্য খুলে দিলেই হবে। পদ্মা সেতুর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। এটি প্রধানত একটি কৃষি প্রধান অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলোতে শিল্পায়ন হয়নি এবং এর একটি বড় কারণ হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশেষ করে বন্দরের সঙ্গে ও অভ্যন্তরীণ বড় বড় বাজারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ। পদ্মা সেতুর ফলে এই সমস্যাটার সমাধান হবে কিন্তু আসল বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান আমরা পাবো কিনা সেটা নির্ভর করছে বিনিয়োগের পথে অন্যান্য বাধাগুলো দূর করা যাবে কিনা তার উপর। একটি নতুন বিনিয়োগ করতে গেলে যেসমস্ত আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে হয়, এই জটিলতার কারণে যে দেরিটা হয়, অর্থায়নের অভাব, জমি পাওয়াতে জটিলতার মতো সমস্যাগুলো যদি সমাধান করে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে পদ্মা সেতুর কারণে বিনিয়োগের যে সুযোগ তৈরি হবে সেটা কাজে লাগানো যাবে। বিনিয়োগগুলো যদি বাস্তবে পরিণত করা যায় তাহলে বাংলাদেশের মোট জিডিপি এক দশমিক দুই শতাশ থেকে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু পদ্মা সেতু শেষ করলেই যে এই সুফলটা পাবো তা না। কারণ এই বিনিয়োগের পথে তো আরো অনেক ধরনের বাঁধা রয়েছে। দক্ষশ্রমিকের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমি কেনা-বেচার জামেলা নিরসন, বন্দর ব্যাবস্থাপণায় দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারলে পদ্মার সেতুর ফলে বিনিয়োগ বাড়বে, বাণিজ্য বাড়বে।

তৃতীয়ত পদ্মা সেতু শুধু আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে না আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে দূরত্ব কমে যাওয়ায় ভারত, ভুটান, নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে যে বাণিজ্য রয়েছে সেখানে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু একটা গুরুত্বপূর্ণ লিংক। এখানে সংযোগে অনেক দুর্বলতা, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিলো ফেরি পারাপার। সেটা এখন আর না থাকায়, এই দুর্বলতাটা কেটে যাবে। কাজে আঞ্চলিক বাণিজ্যেও পদ্মা সেতুর একটি প্রভাব পড়বে। যদিও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও অনেক জটিলতা আছে, ট্যারিফ ব্যারিয়ার, নন ট্যারিফ ব্যারিয়ার এবং আমাদের বর্ডারের কাস্টমস পদ্বতিগুলো একেক দেশে একেক রকম। এগুলো একিভূত করতে পারলে আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে দেখা যাবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো এখনো পদ্মা সেতু চালু হয়নি। বলা হচ্ছে ২০২২ সালের জুন মাসে সেতুটা চালো হবে, সেটি যেন আর দেরি না হয়। বরং আসল যে টার্গেট ছিলো, ডিসেম্বর ২০২১ এর মধ্যে যদি আমরা পদ্মা সেতু চালু করতে পারি তাহলে লাভবান হবো। দেরি হওয়ার কারণে আমাদের বাজেট আরও বেড়ে গেছে। আমরা যতো দেরি করবো আমাদের বেনিফিট এবং কস্টের ব্যাবধান ততো বেড়ে যাবে। সেজন্য এটা যতো দ্রুত শেষ করা যায় ততোবেশি উপকার আমাদের অর্থনীতি পাবে।
লেখক পরিচিতি : বিশ^ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি লেখেছেন আমিরুল ইসলাম

সর্বাধিক পঠিত