প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নবীজি (সা.) এর যুগে বিয়ে ও আজকের সমাজ

শহীদুল ইসলাম: বিয়ের প্রচলন ইসলামের পূর্ব থেকে চলে এসেছে। তবে তৎকালীন সমাজে কয়েক ধরনের বিয়ের রেওয়াজ ছিল। এগুলোর মাঝে কোনো কোনোটি ছিল খুবই অশ্লীল। ইসলাম এসে সেগুলোকে রহিত করে। এবং একটি পদ্ধতি যা মানুষের স্বভাবের কাছাকাছি ছিল সেটিকে আরো সংশোধন করে মুসলমানদের জন্য বিবাহ পদ্ধতি নির্ধারণ করে।
মানুষের জীবনে সামগ্রীক শান্তির জন্য বিবাহ ও তৎপরবর্তী দাম্পত্য জীবন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে কোনোরূপ অবহেলা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাই রাসূল (সা.) বিবাহের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন এবং বলেছেন, যে বিবাহ থেকে বিমুখ থাকবে সে এই উম্মতের দলভূক্ত হবে না।

রাসূল (সা.) এর কর্মপন্থা ও নির্দেশনার আলোকে বিবাহ সম্পন্ন করার একটি পদ্ধতি সামনে এসেছে। তা হচ্ছে কিছু বিষয়ের সমতা পাওয়ার ভিত্তিতে কোনো এক পক্ষের অভিভাবক বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং আত্মীয়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করবে। বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্রী উপযুক্ত হলে তার সম্মতি জেনে নিতে হবে। আর কম বয়সের হলে অভিভাবক তার পক্ষ থেকে মঞ্জুর করবে। অভিভাবক হিসেবে যে কারো মত ধর্তব্য নয়। বরং যাদের মাঝে মেয়ের প্রতি কল্যাণকামিতার বিষয়টি নিশ্চিত যেমন পিতার সম্মতি ধর্তব্য।

বিবাহের পরবর্তী জীবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। সারা জীবন তাকে স্বামীর ঘরে কাটাতে হবে। স্বামীর পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হবে। অথচ তাদের সঙ্গে নেই পূর্বের কোনো পরিচিতি। এজন্য বিবাহে মেয়ের সম্মতিকে ইসলাম খুব গুরুত্ব দিয়েছে। তাই অভিভাবকের অধিকার নেই মেয়ের অসম্মতিতে কারো সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়া। রাসূল (সা.) বলেন, ‘প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিবাহ দেয়া যাবে না সম্মতি ছাড়া।’ (মেশকাত, পৃষ্ঠা-২৭০)

বিবাহের প্রচার
বিবাহের ক্ষেত্রে নবীজি (সা.) এর নির্দেশনা হচ্ছে প্রকাশ্যে আয়োজন করা। মুহাম্মাদ ইবনে হাতেব নবীজি (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, বৈধ এবং অবৈধ বিবাহের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে আওয়াজ দেয়া, দফ বাজানো।’ হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, তোমরা বিবাহের প্রচার করো, এতে দফ বাজাও এবং বিবাহের অনুষ্ঠানের আয়োজন মসজিদে করো।’ (মেশকাত, পৃষ্ঠা নং-২৭২) দ্বিতীয় হাদিসটি দুর্বল। তবে এই অর্থের হাদিস বিশুদ্ধ সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। তাই এতে কোনো সমস্যা নেই। হজরত রুবাইয়া বিনতে মুওয়াজ (রা.)কে যখন স্বামীর ঘরে পাঠানো হয় রাসূল (সা.) তাকে দেখতে যান। ওই সময় ছোট বাচ্চারা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদরের শহীদদের নিয়ে বিভিন্ন কবিতা আবৃত্ত করছিলো।’ (মেশকাত, পৃষ্ঠা-২৭১) উক্ত হাদিস বুখারি শরীফে বর্ণিত হয়েছে। তাই সনদ নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই। প্রকাশ্যে আয়োজনের জন্য মসজিদে বিবাহের আকদ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। বর্তমানে অনেকে গোপনে বিবাহ করে। সাক্ষীদের উপস্থিতে বিবাহের আকদ হলে তা নিঃসন্দেহে বৈধ। তবে এ ধরনের বিবাহ পরিবারের সম্মতিতে হয় না এবং বিবাহ প্রচারের নির্দেশনা তাতে উপেক্ষীত হয়। তাই বিবাহ বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয়।

ওলিমা
পছন্দের পাত্রীর সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হওয়া আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত। ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। এই নেয়ামতের শুকরিয়া হচ্ছে ওলিমা খাওয়ানো। ওলিমা হচ্ছে লৌকিকতা মুক্ত, সামর্থ্যের ভেতরে থেকে আত্মীয় স্বজনের জন্য খাবারের আয়োজন করা। দাওয়াতি মেহমানের সংখ্যা, খাবারের মান কোনটাই ঠিক করে দেয়া হয়নি। ওলিমার দাওয়াত পাওয়ার হকদার ধনী, গরিব সকলে। তবে সামর্থ্য থাকলে বেশি মানুষের আয়োজন করা এবং খাবারের মান ভালো করতে কোন সমস্যা নেই। ওলিমার বিধান হচ্ছে সুন্নত। রাসূল (সা.) বলেন, ‘ওলিমা করো যদিও তা একটা ছাগল দ্বারা হয়।’ (সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং-৩৩৫১) তবে সুন্নত সীমার ভেতর যতক্ষণ থাকে। যখন সীমা ও নবীজি (সা.) এর নির্দেশনা উপেক্ষীত হয় তখন সুন্নত তা সুন্নত থাকে না। বর্তমানে ওলিমায় দ্বীন ও রাসূল (সা.) এর নির্দেশনার পরিপন্থি বহু বিষয় ঘটে। সামর্থ্যের বাইরে ওলিমা করতে গিয়ে সুদি লেনদেনে জড়িয়ে যায় অনেকে। এতে ওলিমার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত হয়। ইসলাম মানুষকে উদারতা শিখায়। নবীজি (সা.) এর চেয়ে প্রিয় কোন মানুষ সাহাবাগণের কাছে ছিলো না। বিবাহ হয়েছে, কিন্তু তিনি সংবাদও পাননি এমন হয়েছে বহু সাহাবার বেলায়। আজকের সমাজে এটা কল্পনা করা যায়?

মেয়ের বাড়িতে খাওয়ার আয়োজন
আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ে বর পক্ষ ওলিমা করে। কিন্তু মেয়ের বাড়িতে বর পক্ষের জন্য খাবারের আয়োজন করার আবশ্যকীয়তা কোথায় থেকে এসেছে? বর পক্ষ ওলিমা না করা কোন দোষণীয় না হলেও কনে পক্ষের এই আয়োজন না করা অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। যারা এভাবে আয়োজন করতে বাধ্য করে এবং খায় তারা মূলত অন্যের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পর একে অন্যের মাল অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে তোমাদের পরস্পর সম্মতিক্রমে কোন ব্যবসা-বাণিজ্য হলে (ভিন্ন কথা)।’ (সূরা নিসা, আয়াত নং-২৯)

রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে বলেন, তোমরা জুলুম করো না, জুলুম করো না, জুলুম করো না! জেনে রেখো, কোনো মুসলমানের মাল অন্যের জন্য হালাল হবে না তার সম্মতি ছাড়া।’ (মুসনাদে আহমদ) তবে কোন চাপাচাপি ছাড়া, স্বেচ্ছায় কোন অভিভাবক যদি আত্মীয়-স্বজনের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী আয়োজন করে তাহলে কোনো সমস্যা নেই। সমাজে যারা শিক্ষিত তাদের মাঝেও এই বিষয়টি পরিলক্ষীত হয়। মূলত দ্বীনদারি থেকে দূরে থাকা ও ইসলামের ব্যাপারে অসম্পূর্ণ ধারণাই এই জুলুমের জন্য দায়ী। সিরাতের কোথাও এমন দৃষ্টান্ত খোঁজে পাওয়া যাবে না।

মহর
আরবের জাহেলি সমাজে বিবাহে মহর নির্ধারণের প্রচলন ছিল। পাত্র কোন মেয়েকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে এবং তার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী মাল খরচ করতে আগ্রহী এই বিষটি প্রকাশের জন্য মহরের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এই আধুনিক সভ্যতায় এসে সমাজের রূপ পরিবর্তন হয়েছে। এখন মেয়ে পক্ষ টাকা দিতে হয়। এর অর্থ হচ্ছে মেয়েকে তার কাছে বিবাহ দিতে এবং তার জন্য টাকা পয়সা খরচ করতে আগ্রহী। অথচ বলা হচ্ছে এটা নারী অধিকার নিশ্চিতের যুগ আর ওটা বর্বরতার যুগ।

রাসূল (সা.) মহরের পরিমাণ ধার্য করে দেননি। কারণ, পাত্রের সামর্থ্যের মাঝে তারতম্য হতে পারে। প্রত্যেকে যেন সামর্থ্য অনুযায়ী মহর নির্ধারণ করতে পারেন সেজন্য এই সুযোগ রাখা হয়েছে। নবীজি (সা.) নিজের এবং স্বীয় মেয়েদের বিবাহে সাধারণত পাঁচশ দিরহাম মহর ঠিক করেছেন। কিন্তু ওই সময়ে অন্য যারা বিবাহ করেছেন কেউ এই পরিমাণকে আবশ্যক মনে করেননি। এর চেয়ে কম বা বেশি মহর নির্ধারণ করে তারা বিবাহ করেছেন। তাই পাঁচশ দেরহাম বা এর সমপরিমাণ অর্থকে আবশ্যক মনে করার কোন কারণ নেই।

কোরআন, হাদিসের আলোচনা ও নির্দেশনার আলোকে প্রতীয়মাণ হয় মহর কোন ওচ্ছিক বিষয় নয় যে, স্বামীর মন চাইলে দিবে না চাইলে দিবে না। মহর আদায় করা স্বামীর উপর আবশ্যক। রাসূল (সা.) হাদিসে এব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্ছারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কম বা বেশি মহর নির্ধারণ করে বিবাহ করেছে এবং তার অন্তরে হচ্ছে সে ওই মহর আদায় করবে না তাহলে সে ব্যভিচারি হিসেবে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করবে। (তবরানি, মুজামুল আওসাত)

মেয়ের পক্ষ থেকে উপঢৌকন দেয়া
পাত্র বা পাত্রী পক্ষ খুশিমনে যা দিবে তা নিতে সমস্যা নেই। তবে সিরাত, সাহাবা চরিত এবং কোরআন, হাদিসের ভাষ্যে কোথাও একথা পাওয়া যায় না যে, পাত্র বা পাত্রী পক্ষ থেকে চেয়ে কিছু নেয়া যাবে। কিন্তু বর্তমানে যৌতুকের নামে অন্যের মাল আত্মসাত করা, পাত্রীর পক্ষ থেকে উপঢৌকনের নামে বিভিন্ন আসবাবপত্র আদায় করা সাধারণ বিষয়। উপঢৌকনের ব্যাপারে ভ্রান্তির কারণ হচ্ছে হজরত ফাতেমা (রা.) এর বিবাহে রাসূল (সা.) এর তরফ থেকে উপঢৌকন হিসেবে কিছু দেয়া। সেখানে ছিলো একটা চাদর, একটা মশক ও একটি গদি যার ভেতরে ইজখির নামক ঘাস ভরা ছিলো। (সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং-৩৩৮৪)।

প্রকৃত বিষয় হচ্ছে ওই সময় আরবে এ ধরনের কোন প্রথা ছিল না এবং নবীজিও (সা.) নিজের অন্যান্য মেয়েদের বেলায় এ রকমের কোনো আয়োজন করেননি। তাহলে শুধু ফাতেমা (রা.) এর বেলায় কেন করলেন? এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন মুহাদ্দিসগণ। হজরত আলী (রা.) এক দিক থেকে মেয়ের জামাতা। কিন্তু তিনি বড় হয়েছেন রাসূল (সা.) এর অভিভাবকত্বে। তাই আলী (রা.) এর অভিভাবক হিসেবে তিনি এগুলোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মেয়ের বিবাহের উপঢৌকন হিসেবে নয়। (মাআরেফুল হাদিস, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা-৪৬০)

বর্তমানে উপঢৌকন ও যৌতুকের চিন্তায় অনেক অভিভাবক বিবাহে বিলম্ব করেন। এ চিন্তা শুধু বাপের মনকে ব্যতিব্যস্ত করে তা নয় বরং মেয়েকেও বিপর্যস্ত করে। বিবাহ কখনো মাথার উপর এসে গেলে অবৈধ পন্থায় ঋণ করে উপঢৌকনের ব্যবস্থা করে। কোনো কোনো অভিভাবক নিজের চলার সম্বলটুকু মেয়ের জন্য বিক্রি করে দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। এগুলো মূলত বর্বরতার যুগের আলামত। ইসলাম এগুলো দূর করেছিলো। দ্বীনদারি ও দ্বীনি শিক্ষা থেকে সরে আসার কারণে আবার সমাজে এসব ছড়াচ্ছে।

উপঢৌকনের তালিকা দিন দিন লম্বা হচ্ছে। রাসূল (সা.) জামাতাকে অভিভাবক হিসেবে সামান্য কিছু দিয়েছিলেন। যা ছাড়া কোনভাবেই চলা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের উপঢৌকনের তালিকায় গাড়ি, বাড়ি, ফ্রিজ, ফার্নিচার থেকে নিয়ে বাদ যায় না কোন কিছুই। বর্তমানে লোকদেখানো প্রবণতা থেকেও এগুলো সীমা ছাড়াচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত