প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী: মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শ নতুন প্রজম্মের মধ্যে ছড়িয়ে না দিলে দেশপ্রেমিক হবে কীভাবে?

শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী: শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা যতোটুকু জানা উচিত ছিলো ততোটুকু সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্ম জানতে পারেনি। এই কথাটির মাধ্যমে আমার আবেগ ও ক্ষোভ চলে আসছে। কারণ শহীদ বুদ্ধিজীবীরা দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সমগ্র দেশে, গ্রামে-গঞ্জে, সকল স্থানে বুদ্ধিজীবীদের চিহ্নিত করে হত্যা করেছে এবং তাদের একটাই উদ্দেশ্য ছিলো বাংলাদেশেকে মেধাশূন্য করা। এই হত্যাকাণ্ড ২৫ মার্চের আপারেশন সার্চলাইট থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চালিয়ের্ছিলো।

এখন পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা নিরূপণ করা যায়নি এবং এখনো অনেক বুদ্ধিজীবীর হত্যার কথাও পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ কথা বলা হয়েছেন। এর মধ্যে বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যাও ধরা হয়েছে, কিন্তু আলাদাভাবে কতোজন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন, সেই সংখ্যাটা এখনো নিরূপণ করা যায়নি।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা বঙ্গবন্ধুর আমলে পড়ানো হয়েছিলো, আমি একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের তা পড়াতাম। বইয়ের মধ্যে অনেকের নাম দেওয়া ছিলো এবং কেন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিলো, সেই ঘটনাগুলো উল্লোখ্য করা ছিলো। তখন ছাত্ররা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে পারতো। রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে সকল গুণী মানুষের অবদানের কথাও জানা যেতো, বুদ্ধিজীবীদের অবদান সম্পর্কে তারা পড়তে পারতো। আমি নিজে তাদের পড়িয়েছি এবং দেখেছি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে খুব আবেগ কাজ করতো। আমি নিজে যেমন আবেগ নিয়ে পড়াতাম, তেমনি তাদেরও মাঝে সেই আবেগ দেখতে পেতাম। আবেগের জায়গায় হঠাৎ কীভাবে যেন বিরাট শূন্যতা তৈরি হলো। জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতা নিলো ১৯৭৫ সালে, রাতারাতি ওই বইগুলো বদলে ফেললো এবং বইগুলোতে একজন বুদ্ধিজীবীর নামও ছিলো না। অর্থাৎ সে বইগুলোতে বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা নেই, মানে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডই হয়নি! তারা অনেক কিছু নিয়েই মিথ্যা ইতিহাস লিখেছিলো।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ ও অবদানের কথা পাঠ্যবইয়ে না থাকার কারণে সে সময়ের নতুন প্রজম্ম তাদের কথা জানতেই পারলো না, বঞ্চিত হলো! যার ফলে স্বাধীনতার পরে অনেক ছাত্র-ছাত্রী জানতোই না বুদ্ধিজীবী কী! আবার অনেকে বলেন, বুদ্ধিজীবী দিবস কী? এমনকি অনেক শিক্ষকও জানতেন না যে, বুদ্ধিজীবী দিবসটা আবার কী! বুদ্ধিজীবীদের এতো আত্মত্যাগের পরও এরকম কথা শুনে আমাদের চরম অপমান লাগতো, ভীষণ কষ্ট লাগতো। নতুন প্রজম্মের অনেকেই জানে না, চিনেও না শহীদ ডা. আলীম চৌধুরী কে ছিলেন কিংবা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অবদান কী ছিলো? বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপারে তখন একটা উদাসীনতার সৃষ্টি হয়েছিলো, এটি ইচ্ছে করে করা হয়েছে, যাতে নতুন প্রজম্ম ভুলে যায় মুক্তিযুদ্ধ কী, বুদ্ধিজীবী কারা ছিলেন এবং তাদের অবদানের কথা। কিন্তু এখন কিছুটা হলেও ক্ষতি পূরণ হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে পাঠ্যপুস্তকে বুদ্ধিজীবীদের কথা পড়ানো হচ্ছে। বর্তমান প্রজম্মও তাদের চিনতে পারছে।

ঘাতকেরা বুদ্ধিজীবীদের চিহ্নিত করেছিলো কীভাবে? তাদের দেশপ্রেম ও গুণের কারণে। তারা ছিলেন নিভৃতচারী। কোনো ধরনের ঘোষণা নয়, নিরবে-নিভৃতে দেশের তরে কাজ করে গেছেন। কিন্তু হানাদার বাহিনী ঠিকই তাদের চিহ্নিত করে গেছে, কিছু বাঙালি দেশদ্রোহীর জন্য যারা স্বাধীনতা চায়নি, স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি তারাই চিনিয়ে দিয়েছে বুদ্ধিজীবীদের। তারাই বুদ্ধিজীবীদের তালিকা দিয়েছে।

বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ, আদর্শ মানুষের কাছে যথাযথভাবে তোলা ধরা হয়নি। আরও ব্যাপকভাবে তাদের আদর্শ, তাদের অবদানের কথা সমাজে প্রতিফলিত হওয়া দরকার। মুক্তিযোদ্ধারা যেমন অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছেন, তেমনি বুদ্ধিজীবীরা কলম নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। এই কলম যোদ্ধাদের আমরা কেন মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করবো না, অনেক বেশি স্মরণ করা উচিত তাদের। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যদি অবহেলা করি, তাহলে নতুন প্রজম্ম মানুষ হবে না।

মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শ, চিন্তা-চেতনা নতুন প্রজম্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় তারা দেশপ্রেমিক কীভাবে হবে? বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের কথা নতুন প্রজম্মকে বেশি বেশি করে জানাতে হবে, এটাই আমার চাওয়া দেশের কাছে। বুদ্ধিজীবীদের কথা আরও বেশি করে বলা হোক, আলোচনা করা হোক এবং তাদের প্রত্যেকের আলাদা করে জীবনী ও আদর্শের কথা রচনা করে পাঠ্যবই লেখার প্রকল্প যদি সরকার গ্রহণ করে, তাহলে অনেক বেশি উপকৃত হবে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধাদের সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে এবং তারা মানুষ হবে। অনুলিখন: আব্দুল্লাহ মামুন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত