প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হিমেল আশরাফ: পদ্মা সেতু কোনো সেতু না, এইটা একটা আবেগ, একটা ভালোবাসা, একটা স্বপ্ন

হিমেল আশরাফ: ঢাকা থেকে আমাদের শরীয়তপুরের বাসার দুরত্ব ৬৪ কিলোমিটারের মতো। একদম ছোট বেলায় বাড়ি থেকে ঢাকা যাবার আগের দিন কোনো এক রিক্সাওয়ালাকে বলে রাখা হতো, সে ভোর রাত ৪টায় আমাদের বাসার বাহিরে এসে টুং টাং বেল বাজাতো। রিক্সায় করে আমরা যেতাম আংগারিয়া বাস স্ট্যান্ড, সেখানে মুড়ির টিনের মতো কিছু বাস ছিলো, সেই বাসে আমি বমি করতে করতে করে যেতাম চন্ডিপুর-সুরেশ্বর লঞ্চ ঘাট। সকাল ৮-৯ টায় লঞ্চে ছাড়তো ঢাকার উদ্দেশ্যে। সারাদিন লঞ্চে ভেসে ভেসে কি কি যেন ভাবতাম। লঞ্চের পাটাতনে বিছানা বিছিয়ে দলে দলে তাস খেলতো। কেউ ঘুমোতো সাথে চলতো বাংলা হিন্দি সিনেমা। লঞ্চের শব্দে সিনেমার কোন শব্দই পেতাম না তবু তাকিয়ে দেখতাম, ওই ভালো লাগতো। আহা সেই সব বাংলা সিনেমার দিন। লঞ্চে সবচেয়ে ভয় করতো বাথরুমে যেতে হলে। আমার সব সময় মনে হতো আমি টয়লেটের গর্ত দিয়ে পানিতে পরে যাবো। সবচেয়ে ভাল লাগতো একদম লঞ্চের সামনে দাড়িয়ে থাকতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকতাম। মুন্সিগঞ্জ আসলেই লঞ্চে পাওয়া যেত গরম রুটি আর ছোট কলা। খুব প্রিয় ছিলো আমার। মাঝে মাঝে ঝড়ের কবলে পরতাম, কি ভয় যে করত। লঞ্চের ঢেউয়ে যে না পরছে তার ভয় কি জিনিস তা বোঝা বাকি আছে। বিকেল ২-৩ টার দিকে বুড়িগঙ্গা ব্রিজ দেখা গেলে হুড়মুড় করে সবাই লুঙ্গি খুলে প্যান্ট ট্যান্ট পরে শার্ট ইন করে বাবু সেজে সদরঘাটে নামতো। সদরঘাট থেকে ঢাকার গন্তব্যে যেতে বেলা শেষ।

সারাদিন লাগতো বাড়ি থেকে ঢাকা যেতে অথচ বাড়ি থেকে ঢাকার দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটার, মানে ১ ঘন্টার পথ। এরপর রাস্তা হলো, ভাঙাচোরা বাস বা ঢাকা থেকে বিতাড়িত বেবী দিয়ে দিয়ে কাঠালবাগান বা মাঝির ঘাটে আসতাম, তারপর ব্যাগ-বোস্কা সব ঘারে মাথায় নিয়ে কেউ নৌকা সাইজের লঞ্চে কেউ ট্রলারে কেউ স্পিডবোটে জানটা হাতে নিয়ে উত্তাল পদ্মা পার হতাম। ট্রলারে পদ্মা পার হওয়ার সাহস আমার ছিলো না। আমি সর্বোচ্চ প্রতিবার স্পীডবোটে পার হতাম। মাঝ নদীতে ঢেউয়ের মাঝে পরলে দোয়া করতাম আল্লাহ এইবার খালি পদ্মা পার কইরা দাও এই জীবনে আর স্পিডবোটে উঠুম না। পরের বার আবার ঘাটে এসে যখন মনে হতে লঞ্চে এক ঘন্টার বেশি লাগবে তখন মুখটা মায়া মায়া করে আকাশে তাকায়ে বলতাম আল্লাহ আর একবার প্লিজ। মাওয়া ঘাটে এসে আবার সেই ব্যাগ-বোস্কা টানতে টানতে বাস ধরো। তাতেও ৫-৭ ঘন্টা শেষ ঢাকা যেতে। কোনো কারণে যদি ডাইরেক্ট বাসে বাড়ি থেকে ঢাকা আসতাম তাইলে যখন বের হতাম তখন আল্লাহ ছাড়া কেউ জানতো না কখন ঢাকা পৌঁছাবো। ফেরি ঘাটে কখনো দুই ঘন্টা কখনো পাচ ঘন্টা এমনকি সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা ফেরির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম সেরকম ইতিহাসও আছে। দাদু মারা যাবার পর তার লাশের গাড়িটা ফেরিতে তুলতে যে কতো সময় কতো লবিং আর কতো ঘুষ দিতে হয়েছিল।

ফেরি ঘাটে ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম আহা যদি একটা ব্রিজ থাকতো, ইস যদি থাকতো। পদ্মার ওপার থেকে যারা ঢাকা আসে তাদের এই পদ্মা নদীর জন্য যে কি পরিমান অমানবিক ভোগান্তি হয়, কি পরিমান সময় নষ্ট হয়, রোগী বয়স্ক লোকের যে কতোটা কষ্ট হয় তা যারা না আসছে তারা কোনো দিন বুঝবে না। পদ্মার স্প্যান বসানো নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ হয় দেখে অনেকেই হাসি ঠাট্টা মসকারা করে। তাদের দোষ নেই, তারাতো জানে না পদ্মার ওপারে আমরা যারা থাকি তাদের কাছে পদ্মা সেতু কোনো সেতু না, এইটা একটা আবেগ, একটা ভালোবাসা, একটা স্বপ্ন। হে দক্ষিণবঙ্গের মানুষ, শুভকামনা সবার জন্য। ফেসবুক থেকে

 

সর্বাধিক পঠিত