প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভিজিট ভিসায় যাওয়ার পর চাকরির প্রলোভন
আরব আমিরাতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন বাংলাদেশীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মী প্রেরণে এক রকম স্থবিরতা চলছে ২০১২ সাল থেকে। গৃহকর্মী ছাড়া দেশটিতে বৈধ পথে এখন শ্রমিক ভিসা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় করোনাকালে ভিজিট ভিসাকেই প্রতারণার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বেশকিছু অসাধু জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ও ট্রাভেল এজেন্সি। প্রলোভন দেখাচ্ছে ভিজিট ভিসায় গেলে চাকরির ভিসা পাইয়ে দেয়ার। আর তাদের দেখানো প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিদিনই প্রতারিত হচ্ছেন বিদেশ গমনেচ্ছু বাংলাদেশীরা। বণিক বার্তা

জানা গেছে, বাংলাদেশীদের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস মেয়াদি ভিজিট ভিসা চালু রেখেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ ভিসায় কাজের অনুমতি থাকে না। মেয়াদ শেষে দেশটিতে অবস্থান করলেই আটক ও জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে গত এপ্রিলের শেষ ভাগে ভিজিট ভিসায় এসে আটকে পড়াদের জন্য ভিসার শর্তে সাময়িক ছাড় দেয় ইউএই সরকার। এ সময় দেশটিতে অবস্থানকারীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়। একই সঙ্গে ভিজিট ভিসায় আসা প্রবাসীরাও বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মী হিসেবে সাময়িকভাবে ভিসা পরিবর্তনের সুযোগ পান। এ বিষয়টিকেই প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে অসাধু চক্র।

এ প্রসঙ্গে আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ভিজিট ভিসায় আরব আমিরাতে যাওয়া বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রথম দফায় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিনা জরিমানায় চাকরি ভিসা গ্রহণ এবং ভিজিট ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেটি বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ সুযোগ কেবল ১ মার্চের আগে যারা ভিজিট ভিসায় দেশটিতে গিয়েছিলেন, তাদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু অসাধু কিছু রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সি ওই তথ্য গোপন করে প্রতিনিয়ত প্রলোভন দেখিয়ে ভিজিট ভিসায় লোকজন নিয়ে যাচ্ছে ইউএইতে।

ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিনই ওয়ার্ক ভিসা ছাড়াই ভিজিট ভিসার মাধ্যমে ইউএইতে পাড়ি দিচ্ছেন কর্মীরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশেই বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে আটকা পড়ছেন। আবার কেউ কেউ ইউএই ইমিগ্রেশন থেকে ফেরত আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভিজিট ভিসায় ইউএই যেতে দালালদের মাধ্যমে ইমিগ্রেশনের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। যারা চুক্তির বাইরে থাকেন তাদেরই মূলত আটকে দেয়া হয় বিমানবন্দরে।

এ প্রসঙ্গে জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) একাধিক নেতা জানান, ইউএইতে একটি ভিজিট ভিসা নিতে খরচ হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। তবে কাজের আশায় ভিজিট ভিসা নিয়ে যারা যাচ্ছে তাদের সব মিলিয়ে খরচ করতে হয় আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা। তারা জানান, একশ্রেণীর অসাধু এজেন্সি, দালাল চক্র এবং বিমানবন্দরের কিছু কর্মচারী মিলে ‘এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট’ নামে ভিজিট ভিসাধারীদের ইউএই প্রবেশের ব্যবস্থা করছে। এজন্য প্রায় জনপ্রতি ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। বাকি অর্থ খরচ হয় উড়োজাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য খাতে।

ভিজিট ভিসায় গিয়ে কাজের জন্য থেকে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ইউএইর বাংলাদেশ দূতাবাসও। সম্প্রতি আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বর্তমানে ভিজিট ভিসায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসে ‘ওয়ার্ক ভিসায়’ পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তাই চাকরি বা কাজের উদ্দেশ্যে ভিজিট ভিসা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইউএইতে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছে দূতাবাস। এ বিষয়ে কোনো রিক্রুটিং এজেন্ট বা দালালের প্ররোচনায় প্রলুব্ধ না হওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

কেবল প্রকৃত পর্যটকরা ভিজিট ভিসায় ইউএইতে ভ্রমণ করতে পারেন উল্লেখ করে দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, ভিজিট ভিসায় যেতে হলে উড়োজাহাজের ফিরতি টিকিট, হোটেল রিজার্ভেশন অথবা যারা আত্মীয়স্বজনের স্পন্সরে গেছে তাদের প্রকৃত তথ্য এবং ভ্রমণকালীন খরচের জন্য কমপক্ষে ২ হাজার দিরহাম সঙ্গে রাখতে হবে। এর পরই ইউএই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত ট্যুরিস্ট নয় বলে সন্দেহ হলে তাকে ফেরত পাঠানো হতে পারে। আর ভিজিট ভিসায় গিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত না গেলে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম দিন ২০০ দিরহাম এবং পরবর্তী প্রতিদিনের জন্য ১০০ দিরহাম হারে জরিমানা দিতে হবে।

দেশটিতে বৈধভাবে অবস্থানরত প্রবাসীরা বলছেন, ভিজিট ভিসায় এসে কাজ পাওয়া কঠিন। ইউএইতে ভিজিট ভিসায় গিয়ে বর্তমানে যারা সাময়িক অনুমতি নিয়ে কাজ করছেন, তারা মূলত অল্প বেতনে কাজ করছেন। সম্প্রতি ভিজিট ভিসায় গিয়ে যারা রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালচক্রের প্রতারণায় পড়েছেন, তারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবৈধ হয়ে কাজ করছেন, যা দেশটির আইনে মারাত্মক অপরাধ। যেকোনো সময় তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন।

ইউএইতে বৈধভাবে নতুন কর্মী যেমন যেতে পারছেন না, তেমনি কাজ হারিয়ে প্রতিনিয়ত ফিরে আসতে হচ্ছে অনেককেই। গত এপ্রিল থেকে বিভিন্ন দেশের ফেরত আসা কর্মীদের পরিসংখ্যান বলছে, কভিড-১৯ মহামারীতে সৃষ্ট সংকটে ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের অর্ধেকের বেশি এসেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য বলছে, গত ১ এপ্রিল থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব, ইউএই, কুয়েত, কাতারসহ ২৮টি দেশ থেকে ফিরে এসেছেন ২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৫ জন প্রবাসী কর্মী। তাদের মধ্যে ইউএই থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন ৬ হাজার ২১৪ জন নারী কর্মীসহ মোট ৭১ হাজার ৯০৩ জন প্রবাসী কর্মী। এর মধ্যে আউটপাস নিয়ে ফিরেছেন ৭ হাজার ৪৩৬ জন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ফিরে আসা কর্মীরা বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে জানিয়েছেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে ইউএইর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোয় চাকরিরত কর্মীদের নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার চাকরিতে ফেরত নেয়া হবে বলে দেশে পাঠানোর সময় এসব কর্মীকে জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত