প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কি ঘুমিয়েই থাকবে?

ব্যারিস্টার মো. আব্দুল হালিম:
ভূমিকা এবং মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেঃ
কোন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে জনগনের অর্থে মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র জনগণের মানবাধিকার লংঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষনিক ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য প্রতিকার আদায় করা এবং এই আদায়ের মধ্য দিয়ে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে মানবাধিকার রক্ষায় জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা। সাধারণ মানুষ তাদের লঙ্ঘিত অধিকারের প্রতিকার পাওয়ার জন্য পথ খুঁজে বেড়ায়। আদালত বা সুপ্রীমকোর্ট থেকে প্রতিকার পাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য, সময়-সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। ন্যায় বিচারের এই বাধাসমূহ থেকে উত্তরণের জন্যই আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (জামাকন) প্রতিষ্ঠা।

কমিশনে কোন আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই; আইনজীবী নিয়োগের কোন প্রয়োজন নেই। যা প্রয়োজন তাহলো কমিশনে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ দায়ের করা এবং উক্ত অভিযোগের উপর ভিত্তি করে কমিশন সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে। ব্যাখ্যা না দিলে কিংবা ব্যাখ্যায় কমিশন সন্তুষ্ট না হলেই ১৮ ধারায় কমিশনের ক্ষমতা আছে মানবাধিকার লংঘনের জন্য সাময়িক আর্থিক সাহায্যের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না তার কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করা এবং উক্ত নোটিশে সুপারিশকৃত ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় নিশ্চিত করা যার জন্য প্রয়োজনে কমিশন হাইকোর্টের দারস্থ হতে পারে।

কিন্তু গত ১০ বছরে আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন মানবাধিকার লংঘনের অসংখ্য প্রমাণ পেয়ে একটি ক্ষেত্রেও ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেনি; মানবাধিকার লংঘনকারী ব্যক্তি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশের মত কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি যা কেবল হতাশাজনকই নয়; বরং আইনে অর্পিত দায়িত্বের বরখেলাপও বটে।কমিশনের চেয়ারম্যান গত দশ বছর ধরে কেবলই সভা সেমিনার বলে বেড়াচ্ছেন যে, “কমিশনের ক্ষমতা নেই”।

প্রথম প্রশ্ন হলো- এটা কি কমিশনের আইন প্রয়োগের ভুল ব্যাখ্যা জনিত বক্তব্য? বিষয়টি জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, যদি আইনে কমিশনের কোন ক্ষমতা না থাকে, তাহলে প্রতি বছরে জনগণের ৫-৬ কোটি টাকা ব্যয় করে আমরা কেন এই কমিশন লালন করছি? এর ভবিষ্যৎ কি? ৩৫-৪০ জন কর্মকর্তা কর্মচারীদের এই কমিশন যদি নিপীড়িত মানুষের মানবাধিকারসমূহ আদৌ রক্ষা করতে কোন ভূমিকা না রাখতে পারে, তাহলে চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য কমিশনারগণই বা পদ আঁকড়ে আছেন কেন? পদ আঁকড়ে থাকবেন; জনগণের করের টাকায় সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের মর্যাদা ভোগ করবেন, একের পর এক বিদেশ ভ্রমণ করবেন- অথচ দেশে অসংখ্য নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক এবং যথাযথ কোন ভূমিকা রাখবেন না- এটাতো হতে পারে না।

সাম্প্রতিককালে সাধারণ মানুষের উপর প্রকাশ্যে নির্যাতন করা হচ্ছে। এর একটি ক্ষেত্রেও কমিশন যথাযথ অনুসন্ধান বা পদক্ষেপ সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রহণ করছে না। এ সকল বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কি ঘুমিয়ে থাকবে? কমিশনের কি আইনে কিছুই করার নেই? এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কারণ জামাকন আইনে কমিশনের ভূমিকা ব্যাপক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারকে মানবাধিকার লংঘনের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়সহ জবাবদিহিতার আওতায় আনতে কমিশন অঙ্গীকারবদ্ধ। আইনে কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কিন্তু দুঃখজনকভাবে কমিশন তার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে না।

মানবাধিকার এবং অপরাধ পার্থক্য বোঝায় কমিশনের সক্ষমতার অভাব:

মানবাধিকার কমিশন আইনের ২(চ) উপ-ধারায় মানাবাধিকারের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। উক্ত সংজ্ঞানুযায়ী মানবাধিকারের সংজ্ঞার যে ব্যপ্তি তা কমিশন বুঝে বলে প্রতীয়মান হয় না। খাদিজা নির্যাতন মামলার শুনানীকালে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়টি পড়লে বোঝা যায় যে, কমিশন অপরাধ এবং মানবাধিকারের পার্থক্য অনুধাবনে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

কমিশনের একজন সদস্যের দেয়া ভিন্নমতের রায়টি পড়লে বোঝা যায় যে, কমিশন বার বার “অপরাধের” উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ মামলা দায়ের করলে বা হলে “কমিশনের করণীয় কিছু নেই”। কমিশনের বা কমিশনের সদস্যের চিন্তা চেতনায় যদি মানবাধিকারের বিষয়গুলো বোঝার ক্ষমতা না থাকে, সেখানে কমিশন কি “মানবাধিকার” রক্ষা করবে তা এখনো অস্পষ্ট। এ কারণেই হাইকোর্ট তার রায়ে যথাযথভাবে বলেছে যে, কমিশন তার আইনে অর্পিত দায়িত্ব পালনে ক্রমাগত অদক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকার লংঘন এবং ক্ষতিপূরণ: বাংলাদেশ বনাম ভারত মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা:

সাম্প্রতিককালে পুলিশ কর্তৃক সাধারণ মানুয়ের উপর অমানবিক নির্যাতন এবং হয়রানীর ঘটনা অহরহ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। গত একবছরে পুলিশের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ২৩০ জন নারী এবং অসংখ্য শিশু ও নিরীহ মানুষ। বার বার ঘটে যাওয়া এরূপ প্রকাশ্য মানবাধিকার লংঘনেও আমাদের মানবাধিকার কমিশন নিশ্চুপ কেন? এটা সত্য যে, মানবাধিকার কমিশন কোন আদালত নয়। তবে কমিশন মানবাধিকার লংঘনের জন্য সরাসরি কাউকে শাস্তি দিতে না পারলেও ইহা যথাযথ কার্যক্রমের মাধ্যমে শাস্তি এবং ক্ষতিপূরণ এনে দিতে পারে।

উল্লেখ্য, ভারতীয় মানবাধিকার কমিশন গত পঁচিশ বছরে ৯,৮৯০টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ভুক্তভোগীদেরকে ১৫০,৪১,৫৩,৫০০ ভারতীয় রুপি ক্ষতিপূরণ সুপারিশ করেছে সরকারি সংস্থাসমূহের বিরুদ্ধে এবং উক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় নিশ্চিত করেছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই ভারতীয় কমিশন ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছে ৪৫,২৫,০০০ রুপি; আগস্ট মাসে ৪৪,৫০,০০০ রুপি; জুলাই ৭৫,৫০,০০০ রুপি; জুনে ৬৫ লক্ষ রুপি। আইনে বাংলাদেশের কমিশনের সমান এবং কিছু ক্ষেত্রে বেশী ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কমিশন গত দশ বছরে এখন পর্যন্ত (একটি ক্ষেত্র ছাড়া) ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেনি। অথচ এই ক্ষতিপূরণের সুপারিশই হওয়া উচিৎ কমিশনের মূল লক্ষ্য।

দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কমিশন যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ১৯(১)(ক) এবং ১৮(৩)(খ) উপ-ধারায় সরকারকে সুপারিশ করতে পারে। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে কমিশন হাইকোর্টের দারস্থ হতে পারে অথবা জনসমক্ষে তার কার্যক্রম তুলে ধরতে পারে। ক্ষতিপূরণ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশের মাধ্যমেই কমিশন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবাধিকার লংঘনের দায়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে। খাদিজা নির্যাতন মামলায় কিছুদিন পূর্বে হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে বলেছে যে, মানবাধিকার কমিশন তার আইনে অর্পিত দায়িত্ব পালনে মারাত্মক গাফলতির পরিচয় দিয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং কমিশনের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা:

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটির ১৮ ধারা পড়লে আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে কমিশনের প্রতিবেদন চাওয়া ছাড়া অন্য কোন ক্ষমতা নেই। কিন্তু ১৮ ধারার ব্যাখ্যা কমিশনকে উপলব্ধি করতে হবে:
প্রথমত, আইনের ১৮ ধারার সাথে ভারতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৯ ধারার সাথে হুবহু মিল রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় কমিশন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের তা গ্রহণ করা উচিত। লক্ষ্যণীয়, ভারতীয় আইনের ১৯ ধারায় “কমিশন সন্তুষ্ট হইলে” কথাগুলো নেই; কিন্তু বাংলাদেশের আইনে শর্ত দেয়া হয়েছে “কমিশন সন্তুষ্ট হইলে”। সুতরাং আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ভারতীয় কমিশনের চেয়েও বেশী ক্ষমতা বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কমিশন আইন প্রয়োগের চেষ্টা করছে না।

দ্বিতীয়ত, আইনটির ১৮(১), ১৮(২), ১৮(৩), ১৮(৪) এবং ১৮(৫) উপ-ধারার বিধানসমূহ অন্যান্য বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করলে বোঝা যায় যে, কমিশনের হাত পা বাধা নয়: (i) ১৮(২) উপ-ধারা অনুযায়ী সরকার কমিশনকে প্রতিবেদন সরবরাহ করবে (shall); কিন্তু কতদিনের মধ্যে সরবরাহ করবে তা বলা হয়নি। সুতরাং কমিশন সরকারকে সময় বেঁধে দিতে পারে; (ii) কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন না পেলে কমিশন ১৮(৩)(খ) উপ-ধারা অনুযায়ী ভুক্তভোগীকে সাময়িক সাহায্যের সুপারিশ কেন করা হবে না তার কারণ দর্শাও নোটিশ জারী করতে পারবে যে কাজটি ভারতীয় কমিশন অহরহ করছে; (iii) ১৮(৩)(ক) উপ-ধারায় বলা হয়েছে যে, সরকারের নিকট থেকে প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর কমিশন সন্তুষ্ট হলে আর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করবে না। কিন্তু কমিশন সন্তুষ্ট না হলে কি করবে তা বলা নেই। এখানেই কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগের একটি বড় ক্ষেত্র রয়েছে।

(v) “কমিশন সন্তুষ্ট হলে- কথাটির আইনগত ব্যাখ্যা আছে। তথ্য-উপাত্ত/তদন্তের কাগজপত্রসহ প্রতিবেদন না পেলে কমিশন কি করে সন্তুষ্ট হবে যে, আইন-শৃংখলা বাহিনী তার প্রতিবেদনে প্রকৃত তথ্য লুকিয়েছে কি না? “প্রতিবেদন চাওয়ার”এবং “প্রতিবেদন পর্যালোচনা”করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানবাধিকার রক্ষার শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু সেই প্রতিবেদন চাওয়ার প্রক্রিয়ায় কমিশন গত দশ বছরে কোন দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। একটি রাষ্ট্রীয় স্বাধীন কমিশন যদি ৩৫-৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে দরিদ্র জনগণের করের টাকা ব্যয় করে এতটুকু দায়িত্ব পালন না করতে পারে, তাহলে মানবাধিকার রক্ষা কি আদৌ হবে?

তৃতীয়ত, কমিশন কর্তৃক আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তির ধরন প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের থেকে প্রতিবেদন না পেয়ে কমিশন একের পর এক পত্র দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তিন বছরেও সরকার প্রতিবেদন দেয়নি কিন্তু কমিশন নিশ্চুপ থেকেছে। ভারতীয় কমিশন ভারতীয় সরকার এবং বিএসএফকে কোনভাবেই ইহাকে ঠুঁটো জগন্নাথ ভাবার দুঃসাহস দেয়নি। ভারতীয় কমিশন প্রতিবেদন চায় নির্ধারিত দিনের মধ্যে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর সন্তুষ্ট না হলেই সাময়িক সাহায্য ভিকটিমকে বা তার পরিবারকে কেন দেয়া হবে না তার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারী করে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের এ ধরনের দু’একটা ঘটনায় প্রথমে সক্রিয়তা দেখাতে হবে। হয়তো সরকার সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে যাবে? তাতে কমিশনের ভয় কিসের? কমিশন আইনী লড়াই করে মানবাধিকারের পক্ষে রায় ছিনিয়ে আনবে। খাদিজা নির্যাতন মামলায় সম্প্রতি কমিশন খাদিজাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি। আশা করব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করে খাদিজাকে ৫০,০০০ টাকা পরিশোধ করাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

ভারতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্রিয়তা :

এখানে ভারতীয় কমিশনের দু’টি অভিযোগের উদাহরণ দেয়া বাঞ্ছনীয়:

প্রথমত, ২০০০ সালে কমিশন অভিযোগ পায় যে, বিএসএফ গুলি করে দু’জন নাগরিককে মেরে ফেলেছে। কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রতিবেদন চায়। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন সন্তুষ্ট না হতে পেরে ভিকটিমের পরিবারকে কেন ২ লক্ষ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না, তার কারণ দর্শাও নোটিশ জারী করে। ভারতীয় বিএসএফ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনের এই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। তখন স্বরাষ্ট্র সচিব ও বিএসএফ প্রধানকে কমিশন শুনানীতে তলব করে। বিএসএফ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তি দেখায় যে, আইনের ১৯ ধারা কমিশনকে শৃংখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে কোন ক্ষমতা প্রদান করে না।

কিন্তু মানবাধিকার কমিশন যুক্তি দেখায় যে, সরকার প্রতিবেদন দেয়ার পর এবং প্রতিবেদনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইঙ্গিত থাকলে কমিশন তার ক্ষমতা প্রয়োগে ১৯ ধারার সীমাবদ্ধতার মাঝে চুপ থাকবে না। ১৯(১)(খ) উপ-ধারায় [বাংলাদেশের ১৮(৩)(খ)] প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যাপক এবং এই ক্ষমতা ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে সাময়িক সাহায্য প্রদানের ক্ষমতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। অবশেষে কমিশনের ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে বিএসএফ ভিকটিমের পরিবারকে ২ লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। অতি সম্প্রতি বিএসএফ কর্তৃক ফেলানী হত্যায় ভারতীয় কমিশন ৫ লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়।

দ্বিতীয়ত, Res ipsa loquitur (ঘটনা যেখানে নিজেই নিজের বর্ণনা দেয়) নীতিটি টর্ট তথা ক্ষতিপূরণের আইনে বহুল প্রচলিত। অর্থাৎ কোন ঘটনা বা অপরাধ যদি এমনভাবে প্রকাশ্যে ঘটে তাহলে উক্ত ঘটনার অনুসন্ধান বা তদন্তের প্রয়োজন পড়ে না। এরূপ ক্ষেত্রে ভারতীয় মানবাধিকার কমিশন যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে (বিশেষ করে গুজরাট দাঙ্গা বিষয়ে ২০০২ সালে কমিশন স্বীয় উদ্যোগে অভিযোগ গ্রহণ করে))।

পুলিশ কর্তৃক প্রকাশ্যে হয়রানী ও অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা বন্ধের জন্য Res ipsa loquitur নীতিটি প্রয়োগ করে কমিশন অতি সহজে পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারে; বিগত দশ বছরে মানবাধিকার কমিশন যদি এ নীতিটি প্রয়োগ করে লিমন, কাদের, রানা প্লাজা ধ্বস, অসংখ্য শিশু নারী ধর্ষণের মত মারাত্বক মানবাধিকার লংঘনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণসহ করত এবং সরকারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের সুপারিশ করত তাহলেও কমিশনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো।

র‌্যাব বা সাংসদদের বিরুদ্ধে না হোক, অন্ততঃ পুলিশের বিরুদ্ধে শিশু বা নারী নির্যাতনের অভিযোগগুলোতেও যদি একটু সক্রিয় হয়ে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করত, তাহলে সরকারের অন্যান্য বাহিনীগুলো সতর্ক হয়ে যেত; কমিশনকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভয় পেত এবং কমিশনের প্রতি সাধারণ নিপীড়িত মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেত।

কমিশনের করণীয়সমূহ নিম্নরূপ:

(১)আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ পেলে কমিশনের উচিৎ হবে স্বরাষ্ট্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবেদনসহ ব্যাখ্যা চাওয়া। ব্যাখ্যা ও প্রতিবেদন না পেলে অথবা ব্যাখ্যা পেলেও স্বাভাবিকভাবেই কমিশন উক্ত ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হবে না, কারণ প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লংঘনে কোন ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য হবেনা (strict liability এবং Res ipsa loquitur নীতির অধীনে)। সুতরাং ক্ষতিপূরণ কেন দেয়া হবেনা তার ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শাও নোটিশ জারী করবে কমিশন এবং উক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় নিশ্চিত করবে। সরকার ক্ষতিপূরণ না দিলে কমিশন হাইকোর্টের দারস্থ হতে পারবে। এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ভারতীয় কমিশনের পদক্ষেপসমূহ পর্যালোচনা করতে পারে এবং করা উচিৎ। আমাদের হাইকোর্টও সাম্প্রতিক রায়ে কমিশনের প্রতি এরূপ নির্দেশনা দিয়েছে।

(২) যেসবক্ষেত্রে মানবাধিকার লংঘনকারী কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ থাকে কিংবা ক্ষতিপূরণ দেয়না সেসবক্ষেত্রে কমিশন সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টে যেতে পারে।
(৩) মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধিমালা অতি দ্রুত তৈরি করতে হবে।
(৪) মানবাধিকার লংঘনজনিত অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার বিধিমালা তৈরি করতে হবে।
(৫) কমিশন কিভাবে তদন্ত বা অনুসন্ধান করবে তার বিস্তারিত বিধি তৈরি করতে হবে।
(৬) ভারতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটিতে স্পষ্ট বিধান করা হয়েছে যে, কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন ভারতের কোন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং মানবাধিকার কমিশন বা তথ্য কমিশনের মত আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠানে সর্বদাই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ আইন ও মানবাধিকারের জটিল ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে জবাবদিহিতার আওতার আনতে হলে অত্যন্ত দক্ষ বিচারিক ব্যক্তি ছাড়া সাফল্য আসবে না।

(৭) দেশের সকল আদালত ট্রাইব্যুনাল এবং জেল কর্তৃপক্ষের সাথে স্থানীয় NGO সমূহের সমন্বয়ে মানবাধিকার লংঘনজনিত বিষয়ে করণীয় পদক্ষেপ ও নীতিমালা তৈরি করতে হবে। যাতে প্রতিটি মানবাধিকার লংঘনের ক্ষেত্রে কমিশনের বক্তব্য বা প্রতিনিধিত্ব থাকে।

(৮) অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিশনকে সক্রিয় হতে হবে এবং প্রকাশ্যে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লংঘনের বিষয়সমূহকে suo moto ভাবে গ্রহণ করে ক্ষতিপূরণসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করতে হবে।

লেখক- বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং সম্প্রতি প্রকাশিত “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন: সমস্যা এবং প্রত্যাশা” নামক বইয়ের লেখক।

সম্পাদনা: এস এম নূর মোহাম্মদ

সর্বাধিক পঠিত