প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুম রহমান: পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাস্কর্য ‘সিংহ মানব’

মুম রহমান: : ৪০ হাজার বছর আগে মানুষ কেমন জীবন যাপন করতো? কেমন ছিলো তাদের ভাষা, খাওয়া-দাওয়া, মনোদৈহিক জীবন। কিছুটা হয়তো আন্দাজ করা যায়। কিন্তু ইতিহাসের সিলেবাসের সাধ্য নেই সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল নিয়ে খুব বিস্তৃত কিছু বলে। আমি বরং ৪০ হাজার বছর আগে তৈরি একটা ভাস্কর্যের কথা বলি। বর্তমানের বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে ভাস্কর্য সম্পর্কে কিছুটা জানলে হয়তো ক্ষতি হবে না।
উল্লেখ্য, এই লেখাগুলো আমি উৎসর্গ করছি প্রিয়তম দুই অনুজ মোজাফফর হোসেন আর স্বকৃত নোমানকে। ভাস্কর্য বিষয়ে তাদের একাধিক আলোচনা, লেখা আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রিয় অনুজগণ, আমি সামান্য কামলা শ্রেণীর লেখক। পড়ালেখা করি, গবেষণা করি, তারপর দুচারপাতা লেখি। তোমাদের জন্য এই সিরিজটা শুরু করলাম। তোমাদের করকমলে নিবেদন করলেও আদতে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই পৃথিবীর সেরা কিছু ভাস্কর্যের সঙ্গে। সেই সূত্রেই এই লেখা।
ধারণা করা হয়, পৃথিবীর প্রাচীনতম যে ভাস্কর্যটি পাওয়া গেছে তা আজ থেকে অন্তত পক্ষে ৩৫ হাজার কিংবা ৪০ হাজার বছরের পুরনো। এই প্রাগৈতিহাসিক ভাস্কর্যটির নাম ‘লায়ন ম্যান’ অর্থাৎ ‘সিংহ মানব’।
নামকরণের মতোই ভাস্কর্যটি আপাত খুব সরল। আমরা দেখতে পাই সোজা দু’পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন, এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে মনে হতে পারে দুপায়ের আঙুলের উপর দাঁড়িয়েছেন। তার দুপাশে দুহাত ছড়ানো। দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানবাকৃতির এই ভাস্কর্যের মুখটি সিংহের। সিংহটি মুখ আজকের সিংহের মতো নয়, গুহাযুগের সিংহের মুখ। তার দেহাবয়ব মানুষের হলেও কোমর, ঊরু ইত্যাদিতে সিংহের মতো শক্তির আভাস দেখা যায়। এই সিংহমানুষটি সরাসরি তাকিয়ে আছে দর্শকের দিকে। তার মুখের দিকে ভালো করে তাকালে দেখা যায় সে যেন গভীরভাবে কিছু একটা দেখছে, শুনছে। কিন্তু কে এই সিংহমানব? সত্যিই কি এমন কোন প্রাণী ছিলো? বিজ্ঞান তা বলে না। তবে ফ্রান্সের ট্রয়েস ফ্রয়েস গুহায় একটা ছবি পাওয়া যায় যেটা প্রায় ২০ হাজার বছরের পুরনো ছবি, এই ছবি থেকে আমার মগজে একটা তত্ত্ব এসেছে। তত্ত্ব নয়, কল্পনা বা ধারণা বলা যায়। সেই ছবিতে দেখা যায় একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, সম্ভবত নাচছে, কিন্তু তার পাদুটো হরিণের পায়ের মতো। মাথায় শিং। এরথেকে ধারণা করা হয় হয়তো শিকার করা বল্গা হরিণের চামড়া ও শিং আদিম মানুষ গায়ে দিতো। সেটা গায়ে দিয়ে তেমন পশু সাজতো, নাচতো, অভিনয় করতো কিংবা হয়তো এটা কোন প্রাচীন কৃত্যানুষ্ঠান ছিলো কিংবা নতুন প্রজন্মকে শিকার করা দেখাতে একজন হরিণ সাজতো অন্যরা শিকারী। বলা দরকার, এ সবই আনুমানিক তত্ত্ব— নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিকগণ গুহাযুগের চিত্রকলার সুনির্দিষ্ট ব্যখ্যা দিতে পারেননি। কাজেই পৃথিবীর প্রাচীনতম ‘সিংহ মানব’-এর ব্যখা দেওয়াও কঠিন।
এর বহু হাজার বছর পরে তৈরি পিরামিডের সামনে গিজায় যে বিরাট স্ফিংকসের ভাস্কর্য দেখা যায় তার শরীরটা কিন্তু সিংহের আর মুখটা মানুষের। মানুষ আর সিংহের এই মিশেল মূর্তির মধ্যে হয়তো শক্তি সাধনার কোন ইঙ্গিত আছে। কে জানে, হয়তো বা প্রাচীন লায়ন ম্যান বা সিংহ মানব কোন দেবতার রূপ কি না, নাকি কোন মানুষের কল্পিত পৌরাণিক প্রাণী। কিন্তু কল্পনা যাই হোক সত্যটি হলো এই সিংহ মানব একটি প্রতীকি রূপায়। বাস্তবতার কোন প্রতিরূপ নয়, এ হলো প্রতীকি কোন রূপ, কোন অতিপ্রাকৃতিক বা অলৌকিক ক্ষমতার রূপ।
অবয়ব, বিশেষ করে প্রাণীর অবয়বের সবচেয়ে প্রাচীনতম ভাস্কর্য এই সিংহমানব তৈরি হয়েছে ম্যামথের দাঁত থেকে। যে অতিকায় লোমশ হাতি একসময় পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতো তাদের কোন একজনের দাঁত থেকে এই ভাস্কর্যটি বানানো হয়েছে।
লম্বায় ভাস্কর্যটি খুব বড় নয়, একফুটের একটি বেশি (৩১.১ সেন্টিমিটার) পাশে দুইইঞ্চির একটু বেশি (৫.৬ সেমি) আর পুরুত্ব দুই ইঞ্চির থেকে আরো একটু বেশি (৫.৯ সেমি)। কিন্তু প্রশ্নটা হলো প্রায় ১২/২/২ ইঞ্চির এই ম্যামথের দাঁতের এই ভাস্কর্যটি বানানো হলো কেমন করে? হাতুড়ি, বাটাল এ সব কিছুই তো আবিষ্কার হয়নি। আদিম মানুষ, গুহাবাসী মানুষ পাথর ঘষে ঘষে যে ধরণের যন্ত্রপাতি বানাতো তা দিয়ে ম্যামথের দাঁত খোদাই করে এমন ভাস্কর্য তৈরি করা তো প্রায় অসম্ভব।
২০১৪ সালে জার্মানির উওলাফ হাইন একটা মজার পরীক্ষা করেন। তিনি একজন প্রাগৈতিহাসিক টুলস (যন্ত্রাদি) বিশেষজ্ঞ। আদিম মানুষরা কি দিয়ে তীর বানাতো, কীভাবে ছুরি বানাতো, কেমন করে পাথর কাটতো, গাছ কাটতো এইসব নিয়েই তার দীর্ঘ দিনের গবেষণা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে সেই বরফ যুগের গুহাবাসীর কাছে যে চকমকি পাথর ছিলো তা দিয়েই সিংহ মানব বানানোর চেষ্টা করবেন। এই কাজের জন্য তিনি একটা হাতির দাঁত বেছে নিলেন। (ম্যামথ তো বহু আগেই হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে।) এই পরীক্ষার ফলাফল হিসাবে তিনি জানালেন যে সেইসব অতি প্রাচীন যন্ত্রপাতি সেখানে পাওয়া যেতো (আদতে কিছু পাথরের টুকরা) তা দিয়ে এমন একটি ভাস্কর্য বানাতে কমপক্ষে ৪০০ ঘন্টা কাজ করতে হয়েছে। এবং এই ৪০০ ঘন্টা কাজ একটানা করা হয়নি। কারণ টানা কারো পক্ষেই এই কাজ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে ম্যামথের দাঁত এতোই শক্ত যে তাকে পানিতে ভিজিয়ে নমনীয় করা যায় না, অন্য কোন রাসায়নিক উপাদানেরও প্রশ্নই আসে না। কাজেই দিনের পর দিন বরফে, ঠাণ্ডায় একে ফেলে রাখা হয়েছে তারপর আবার কাজে হাত দেয়া হয়েছে। এভাবে যুগের পর যুগ অনেকে মিলে তৈরি করেছে পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাস্কর্যটি। এই বিষয়ে ডয়েচে ভেলের তৈরি ছোট্ট একটি তথ্যচিত্র ইউটিউবে পাবেন। চাইলে দেখে নিতে পারেন, কীভাবে উওলাফ হাইন নতুন করে সিংহ মানব বানানোর চেষ্টা করে ছিলেন।
কিন্তু কেন? এখানেই প্রশ্নটি জটিলতর। কেন মানুষকে কয়েক প্রজন্ম ধরে, আগুন, বরফ, পাথরের জীবনে এমন একটি ভাস্কর্য বানাতে হলো? বিশেষত এমন সময়ে যখন খাওয়া-পরার সংস্থানই কঠিন। নৃবিজ্ঞানী আর প্রত্মতাত্ত্বিকরা নানা মতবাদ দিচ্ছেন। কয়েকটি প্রচলিত মতবাদ এমন যে, এই ভাস্কর্যটি হয়তো কোন পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ কিংবা এটি হয়তো কোন প্রাচীন ধর্মীয় সাধনার অংশ।
এখানে আরেকটি বিবেচ্য দিক আছে। জার্মানির স্ট্যাডেল গুহায়, যেখানে এই সিংহ মানব ভাস্কর্যটি পাওয়া গিয়েছিলো সেটি ছিলো উত্তর দিকে মুখ করা, মানে সেখানে দিনের আলো পৌঁছাতো না। সেই বরফ যুগে এই অন্ধকার, শীতলতর গুহাতো বসবাসের উপযুক্ত হওয়া কথা নয়। এই গুহার ভেতরের দিকে এক গভীরতর খাঁজে এই সিংহমানবকে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এখানে মানুষজন বসবাস করতো না। মাঝে মাঝে আসতো। তখন সেখানে আগুন জ¦ালাতো হতো। এইসব থেকে মনে করা যেতেই পারে এই সিংহমানব কোন কৃত্য বা ধর্মীয় উপাসনার প্রতীক ছিলো, যা সম্পন্ন করা হয়েছে যুগ যুগ ধরে নানা জনের হাতে।
সিংহ মানবের আবিষ্কার কিন্তু বেশ আকর্ষণীয় ঘটনা। ১৯৩৭ সালে জার্মানীর স্টেডেল গুহায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহাসিক অনুসন্ধান শুরু হয়। ইতিহাসবিদ রবার্ট ওয়েটজেল এর নেতৃত্বে ভূতত্তবিদ অটো ভোলজিং ২৫ আগস্ট ১৯৩৯ সালে খোড়াখুড়ি করার সময় একটা অংশ বিশেষ পায়। কিন্তু সে নিয়ে তখন আর গবেষণার সুযোগ ছিলো না। কারণ ইতোমধ্যে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই ঘটনার প্রায় কয়েক দশক পরে ১৯৬১ সালে ওয়েটজেল আবার অভিযান শুরু করেন এবং ১৯৭০ সালে ম্যামথের দাঁড়ের আরো কিছু টুকরা পান। ১৯৮২ সালে প্রতœ ফসিল বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ স্কামিড একাধিকবারের চেষ্টায় এই টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে সিংহ মানবের অবয়বটি দাঁড় করান। কিন্তু তখনও সিংহ মানব অসম্পূর্ণ। ২০০৮ সালে আবার অভিযান চালানো হয় এবং ২০১২ সালে আজকের সিংহ মানব তার আদলটি মোটামুটি পেয়ে যায়। বর্তমানে সিংহ মানব আছে জার্মানি উলমার যাদুঘরে।
লেখাটা শেষ করি ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ নীল ম্যাকগ্রেগরের কথা দিয়ে। বিবিসি রেডিও ৪-এর এক সিরিজে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘জীবনধারণরে চরম অবস্থায়, যখন খাদ্য খুঁজে পাওয়া, আগুন জ¦ালানো, বন্য জন্তুদের থেকে শিশুদের রক্ষা করে বেঁচে থাকাইটাই একদম শেষ প্রান্তের ব্যাপার, তখনকার সমাজ কেন মানুষকে সময় দেবে এই ধরণের কাজ করার?’ তিনি নিজেই এর উত্তরে বলেছেন, ‘অদেখা কিছুর সঙ্গে একটা সম্পর্ক, প্রকৃতির অন্যতম কোন শক্তির সন্ধান যা হয়তো তোমার দরকার উৎসাহ পেতে, হয়তোবা সংযোগ করতে এক সফল জীবনের সঙ্গে।’’
ধর্ম, কীর্ত, জাত-পাত ইত্যাদির সঙ্গে ভাস্কর্যে সু এবং কু উভয় রকমের সম্পর্ক আছে। হিন্দু বা খ্রিস্টান বা বৌদ্ধদের ধর্মে ভাস্কর্য এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ও প্রেরণা। মুসলমান ধর্ম মতে ভাস্কর্য বা এমন কিছু অবয়ব তৈরি করা যার ভেতরে আমরা প্রাণ দিতে পারবো না তা নিষিদ্ধ।
এখন সিদ্ধ নিষিদ্ধ নিয়ে এই আলোচনা নয়।
আমি বলতে চাইছি, ভাস্কর্য পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি শিল্পকর্ম। এই শিল্পকর্মের সঙ্গে ধর্ম-বর্ণ-জাত নির্বিশেষে একটা মানবিক সংযোগ যেমন আছে তেমনি আছে প্রাকৃতিক সংযোগ। সেই সংযোগের সঙ্গে সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে তা কিন্তু নয়।
সভ্যতা, শিল্প, সংস্কৃতির যে কোন অনুসঙ্গ চাইলে আমরা নিতে পারি, না চাইলে নাই নিতে পারি; কিন্তু জোর করে কোন কিছু চালু বা বন্ধ করতে পারি না। ওটা অসভ্যতা। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত