প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : দেশ ও নারী অগ্রগতির শত্রুদের খুঁটি উপড়ে ফেলতে হবে

দীপক চৌধুরী: কীরকমভাবে ‘বোল’ পাল্টালো ওরা। ইতিহাসে সবসময়ই ওরা অগ্রযাত্রার বিরোধিতা করেছে। ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময়। হেফাজতের হুমকি আর উস্কানি এদেশের মানুষ দেখেছে। ২০১৩ সালের মে-মাসে ঢাকার মতিঝিল-দিলকুশায় হেফাজত হুমকি দিয়েছিল সরকার পরিবর্তনের। পুরো এলাকার চিত্র দেখে মনে হয়, রাজধানীর এই কেন্দ্রবিন্দুকে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল যেন। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য বিএনপি-জামায়াতের আঁচলে পাশে দাঁড়িয়েছিল। কী করেনি হেফাজত! এবারও যখন হেফাজতকে ধরতে সারাদেশের মানুষ ‘একত্রে চ্যালেঞ্জে’ নেমেছে ঠিক তখনই হেফাজত ও তাদের সহযোগিরা চুপসে গিয়ে নতুন নাটকের মঞ্চ তৈরি করেছে। ত্বরিত অ্যাকশনে না গেলে আরো নাটক তৈরি হবে। অশান্তি সৃষ্টি করবে, দেশব্যাপী ত্রাস সৃষ্টি করার আশঙ্কাও রয়েছে। সুতরাং বাড়তি সময় দেয়া ঠিক হবে না। শুধু মনে রাখা চাই, বিএনপি-জামায়াত বা জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় নয় এখন, এরপরও এমন দুঃসাহস কেন? খুঁটির জোর কোথায়? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা দেশটির প্রধানমন্ত্রী- এ কারণেই ওদের হুঙ্কার দেখে মানুষ আশ্চর্য হচ্ছে। জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙ্গার হুমকি দেয়ার দুঃসাহস ওরা দেখালো কীভাবে? ভাস্কর্য পৃথিবীর সব দেশেই আছে এমনকি সৌদি আরবেও শাসকদের অবয়বসহ বহু ভাস্কর্য আছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ভাস্কর্যসহ বহু ভাস্কর্য আছে, তুরস্কে আছে। যারা পাকিস্তানী ভাবধারায় বিশ্বাস করে তারা কি দেখে না যে, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ভাস্কর্য আছে, কবি ইকবালের ভাস্কর্য আছে। সুতরাং এদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র বরদাশত করা যায় না। ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মিলিত রক্ত স্রোতের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য দেশে আছে- থাকবেও, হঠাৎ কেন ওদের ‘তথাকথিত বিবেক’ জাগ্রত হলো? আমি পূর্বের লেখায় এমনটিই বলেছিলাম। এখন দেখছি দস্তুরমতো নাটক শুরু করেছে ওরা।

মঙ্গলবার রাতে তারা একটি বিবৃতি পাঠিয়েছে গণমাধ্যমে। ঠিক উল্টো ধারার এই রাজনীতি। আগে তো কতো হুমকি দিয়েছিল। আর এখন ঠিক বিপরীত চিত্র। কীসের সঙ্গে তুলনা করবো?

‘সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈরিতা সৃষ্টি হেফাজতে ইসলামের উদ্দেশ্য নয় বলে জানিয়েছেন সংগঠনের মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ইসলামবিদ্বেষী গোষ্ঠী আলেমদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে সরকারকে প্ররোচনা দিচ্ছে। কোনো ষড়যন্ত্রকারী মহল যেন উসকানি দিয়ে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার সুযোগ না পায়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ঘাপটি মেরে থাকা অশুভ শক্তি ভাস্কর্য ইস্যুর আড়ালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমের বিরুদ্ধে করা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান নূর হোসাইন কাসেমী।

ইতিহাস থেকে আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে শুরু হওয়া ষড়যন্ত্র চলছেই। নানারকম ষড়যন্ত্র করার উদ্দেশ্য হলো, কীভাবে শেখ হাসিনার সরকারকে বিপদে ফেলা যায়। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙ্গে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র রচনার জন্যই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক নদী রক্তের বিনিময়ে এ দেশ এসেছে। এখানে কাউকে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াতে দেয়া ঠিক হবে না। এ কারণেই ভাস্কর্য আর মূর্তিকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কঠিন সময় অপেক্ষা করছে সম্মুখে। নাটক করা আর যাবে না। জিয়াউর রহমান আর এইচ এম এরশাদের শাসন নয়, এটা বঙ্গবন্ধুকন্যার শাসনামল। বিশ্বের আলোচিত, সৎ, কর্মঠ ও সম্মানীত মানবতার নেত্রীর শাসনামল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধির শাসনামল। সুতরাং এখানে আর ষড়যন্ত্র চলবে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি পদেপদে ষড়যন্ত্র চালিত হয়েছে অতীতে। এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এরপরও ওদের ধৃষ্টতা দেখে অবাক বাঙালি। দীর্ঘদিন নারীকে পিছিয়ে রেখেছে ওরা। মনগড়া নানান ফতোয়া দিয়েছে। এখনও ওরা একটি গোষ্ঠীর হাতের ক্রীড়নক।

আমি বলতে চাই, রাজনীতিতে আমাদের দেশের নারীরা ভীষণভাবে এগিয়ে। শুধু সংখ্যা দিয়েই এ হিসেব করতে চাই না। বাস্তব চিত্র চোখের সামনে। এখন পৃথিবীতে উদাহরণ হয়েই আছে, এদেশে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, উপনেতা নারী, বিরোধীদলীয় নেতা অর্থাৎ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নারী। দক্ষ ও শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে তোলার একের পর এক উদ্যোগ নিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যা কখনো বাংলাদেশ ভাবতেই পারেনি, স্বপ্নেও দেখেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই উল্লেখ করেছেন এ সরকারের নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গ। ২০৪১ সালের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছেন। নারীর সমতা, ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার নবায়ন ও প্রচেষ্টা জোরদার করতে বলেছেন তিনি। এ কারণেই বলছি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের পরই ‘ওরা’ মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলবার সাহস পাবে, নারীর স্বাধীনতা ও কর্ম নিয়ে কথা বলবে শতগুণ শক্তির উচ্চারণে। যদিও ওদের কথায় কিছুই হবে না, ফতোয়ায় দেশ চলবে না তবু নানারকম উছিলায় ‘ওরা’ সোনার দেশকে পিছিয়ে নিতে চাইবে। মানুষকে বিভ্রান্ত করবে। নারীর অগ্রগতিকে রুদ্ধ করতে নানান ফতোয়া দিতে শুরু করবার আগেই ওদের থমিয়ে দিতে হবে। কোনো ছাড় নয়, কঠিন অ্যাকশন চায় মানুষ। তৃণমূলের অগ্রগতি-উন্নয়নের গতিপথকে ‘ওরা’ থামিয়ে দিতে নানারকম চক্রান্ত করছে। তৃণমূল প্রশাসনের অর্থাৎ উপজেলায় শীর্ষ পদে নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। দেশের ৪৯২টি উপজেলায় ৪৪৫ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মধ্যে ১৪০ জনই নারীকর্মকর্তা। জেলা প্রশাসক পদে আছেন দশ-বারোজন নারী। আর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে সচিব পদে আছেন বেশ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা। তৃণমূলে শুধু ইউএনও বা ডিসি নয়, পুলিশে কনস্টেবল, সার্জেন্ট, এএসপি, এসপি, ডিআইজি, সকারের উচ্চপদে খাদ্য সচিব, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, ভূমি আপিল বোর্ড, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদসহ রাষ্ট্রের শুল্ক বিভাগ, তথ্যবিভাগ, বিচার বিভাগ, আনসারবাহিনী, সামরিকবাহিনীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেও এখন নারীরা। বিচারপতি হিসেবে ফারাহ মাহবুব, নাইমা হায়দার, কৃষ্ণা দেবনাথ, ফাতেমা নজিব, কাসেফা হোসেনসহ অনেকে বিচার বিভাগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনের উচ্চপদে- বেগম শামীমা নার্গিস, জুয়েনা আজিজ, বদরুন্নেছা, হোসনে আরা বেগম, কাজী রওশন আক্তার, উম্মুল হাছনা, ড. মোছাম্মাৎ নাজমানার বেগম, ফাতিমা ইয়াসমিন, বেগম সুলতানা আফরোজ, মোছা আছিয়া খাতুন, জুবাইদা নাসরীন, ওয়াহিদা আক্তার প্রমুখ সিনিয়র সচিব, সচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদে রয়েছেন। পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায়ও শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নারী কর্মকর্তারা কিন্তু কঠিন পরীক্ষা ও যোগ্যতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারী অগ্রযাত্রায় উপরে ওঠার সুযোগটুকু যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে এ বিষয়ে কঠিন পদক্ষেপ এখনই নেওয়া দরকার। আশঙ্কা করছি, সামনের দিনগুলোয় আবার নানারকম ফতোয়া জারি করবে ‘ওরা’। সুতরাং এখনই শক্ত হাতে ঘুড়ির নাটাই ধরতে হবে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত