প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য দেশে আছে- থাকবেও, হঠাৎ কেন ওদের ‘তথাকথিত বিবেক’ জাগ্রত হলো?

দীপক চৌধুরী: হঠাৎ কেন মামুনূল, বাবুনগরীদের তথাকথিত বিবেক জাগ্রত হলো। সারাদেশের মানুষ একদিকে আর ওরা এখন একদিকে। শুধু বিস্ময়কর নয়, সারাদেশের মানুষের কাছে চাঞ্চল্যকর বিষয় এটি। চাঞ্চল্যকর ঘটনা, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বাবুনগরী-মামুনূলরা কাদের লোক! ভাবনার ও বিস্ময়ের কারণ আছে। কাদের ক্রিড়নক হয়ে ওরা খেলাখেলি শুরু করছে? ওরা ভালো নাটকও করতে পারে। ওরা হুমকি দিলো, ভাঙ্গার জন্য হুমকি। এখন ওরাই বলছে ‘এটা ঠিক হয়নি।’ মানে কী? কুষ্টিয়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মামুনুল হক। সোমবার (৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার পর নিজের ফেসবুক পেজে ‘ভাস্কর্য নিয়ে বিরোধ, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ উদ্ভুত সার্বিক পরিস্থিতির’ ওপর বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন মামুনুল হক।

‘বঙ্গবন্ধুর নামকে ভুঁইফোড় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ দেশের ইসলামবেত্তাদের মুখোমুখি করে দিতে চাইছে। এটি সুপরিকল্পিত’ বলে অভিযোগ করেন মামুনুল। তার দাবি, এই কাজটি করার মূল উদ্দেশ্য হলো চেতনার ব্যবসা করা। তারা বঙ্গবন্ধুকে ইসলামের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ইসলামকে যেমন ঘায়েল করতে চায়, তেমনি বঙ্গবন্ধুর মহান ব্যক্তিত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চকে উগ্রবাদী বলে অভিযুক্ত করেন। আমরা অবাক হই, এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস ওরা কীভাবে পেল? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার হুমকিদাতাদের সাহস কত?
‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে’, বলে আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরার এ কথাটি অনেকের পছন্দ হয়েছে। কারণ, দুঃসাহস দেখাচ্ছে হেফাজতের নেতা। বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের ওপর আঘাত দেয়ার শামিল এটি। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য দেশে আছে, থাকবে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর আঘাত জনগণ মেনে নেবে না। যে ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রীরা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙেছে তাদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের সমুচিত জবাব দেয়া হবে।’

কুষ্টিয়ায় জাতির জনকের ভাস্কর্য ভাঙচুর ও সারাদেশে হুমকির ঘটনায় নানান বিস্ময় জাগে। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রতিবাদে নানারকম সভা-সমাবেশ হচ্ছে। ভাস্কর্য নিয়ে তুলকালামকাণ্ড। ভাস্কর্য নিয়ে এমন দুঃসাহসী কথাবার্তা ওদের ছিল না। হঠাৎ ইস্যুটি সামনে আনা হয়েছে। দেশের তথ্যমন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রীসহ বিখ্যাত রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্য ব্যক্তিত্ব, লেখক, কবি-সাংবাদিক ভাস্কর্যবিরোধীদের বক্তব্যের জবাবসহ কঠিন হুঁশিয়ারি দিলেও তারা সরে আসছে না। অবশ্য, এখন অনেকে সরকারকে ভীষণ দোষারুপ করছে। কিন্তু আমি বলি, অবাক হওয়ার বিষয় নয়। এটা সারা দেশের মানুষের প্রাণের কথা। ধৈর্য ধরতে হবে। সরকার কঠিন হচ্ছে না বরং ধৈর্যের সঙ্গে সার্বিক অবস্থা মোকাবিলা করছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন, ভাস্কর্যবিরোধিদের ঔষধ। ঘুড়ির নাটাই তাঁর কাছে। ‘ওদের’ জন্য কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। শুধু সময়ের ব্যাপার।

নিশ্চয়ই মনে আছে সেদিনের কথা। ২০১৩ সালের মে-মাসে হেফাজতের তাণ্ডব দেখেছি মতিঝিল-দিলকুশায়। কী সব ভয়ঙ্কর কাণ্ড। হুঙ্কার আর সরকার পতনের ডাক। যেন সবকিছুই হেফাজতের হাতে। জনগণ সরকার সবকছু। হুঙ্কার কী? সেই হেফাজত কিন্তু রাতের অন্ধকারে মতিঝিল থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সেই হেফাজত জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মঞ্চে ‘কওমী-জননী’ ঘোষণা দিয়েছিল। সুতরাং সবকিছুই শুধু সময়ের ব্যাপার। এবারেরটাও ষড়যন্ত্র। এসব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সহজে বিনাশ হবে না।

সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন,‘কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর যারা আঘাত হেনেছে, তাদেরকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া জনগণের দাবি। তাদেরকে শাস্তি দিতেই হবে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘যাদের কাছে ভাস্কর্য অগ্রহণযোগ্য, তাদের নিজের বা বাবার ছবিও তাদের রাখার কথা নয়। টেলিভিশনে তাদের চেহারা দেখানো এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা যে ভাস্কর্যবিরোধী পোস্ট দেন, তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সেটিও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার কথা নয়। অতএব এই সমস্ত বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। আমি তাদেরকে অনুরোধ জানাবো, দয়া করে ভাস্কর্য আর মূর্তি গুলিয়ে ফেলবেন না এবং মানুষকে ও আলেম সমাজকে বিভ্রান্ত করবেন না।”

আজকে ভাস্কর্য আর মূর্তিকে এক বানিয়ে ফেলা হচ্ছে উল্লেখ করে উচ্চশিক্ষিত, স্পষ্টবাদী রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী বলেন ‘ভাস্কর্য পৃথিবীর সব দেশেই আছে এমনকি সৌদি আরবেও শাসকদের অবয়বসহ বহু ভাস্কর্য আছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ভাস্কর্যসহ বহু ভাস্কর্য আছে, তুরস্কে আছে। যারা পাকিস্তানী ভাবধারায় বিশ্বাস করে, পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল বলে যারা বুক চাপড়ায় তাদের অনুসারিদের সেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ভাস্কর্য আছে, কবি ইকবালের ভাস্কর্য আছে।’আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই এদেশ ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মিলিত রক্ত স্রোতের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে।’

সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙ্গে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র রচনার জন্যই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এক নদী রক্তের বিনিময়ে এ দেশ এসেছে। এখানে কাউকে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াতে দেয়া ঠিক হবে না। এ কারণেই ভাস্কর্য আর মূর্তিকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কঠিন সময় অপেক্ষা করছে সম্মুখে। নাটক করা আর যাবে না। জিয়াউর রহমান আর এইচ এম এরশাদের শাসন নয়, এটা বঙ্গবন্ধুকন্যার শাসনামল। বিশ্বের আলোচিত ও সম্মানীত মানবতার নেত্রীর শাসনামল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধির শাসনামল। সুতরাং এখানে আর ষড়যন্ত্র চলবে না।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত