প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোস্তফা মল্লিক: করোনাভাইরাস, কিছু মন-ভালো করা খবর

মোস্তফা মল্লিক:: বৈশ্বিক এই মহামারির মধ্যে যখন নিজের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট পাবেন, আপনি যতোই সাহসী মানুষ হন না কেন-তখন ক’জনের পক্ষে সম্ভব পজিটিভ থাকা? আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যদিও ১৭ মার্চ থেকে সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং লকডাউন শুরু হওয়ার পর বেশ সাহস সঞ্চয় করেছিলাম পেশাগত কারণে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আসার পর আমাদের চ্যানেল আই-য়ের সাংবাদিকদের কাজও অনেক কমিয়ে দেয়া হয়েছিল।

যেটুকু না করলেই নয়, স্রেফ সেইটুকুই করেছি আমরা। সাহস সঞ্চয়ের কথা বলছিলাম। অতোটুকু সঞ্চয় করেছিলাম বলেই ওই ‘যেটুকু না করলেই নয়’ সেটা করার জন্য নিয়মিত অফিস করতে হয়েছে। প্রতি ঘণ্টার বুলেটিনে তাজা সংবাদ দিতে গিয়ে যেতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।

লকডাউনের শুরুর দিকে ঢাকার বিভিন্ন অলিতে গলিতে মানুষের মতামত নিতে কথা বলতে হয়েছে। ভাইরাস থেকে বাঁচতে পিপিই, মুখে মাস্ক, গ্লাফসসহ সব ধরনে নিরাপত্তা ছিল সেই প্রথম দিন থেকেই। করোনার দু’তিন মাস পর দর্শকদের জানাতে হলো করোনা ভাইরাসের আক্রমন থেকে জয়ী হওয়া মানুষদের গল্প। সরাসরি কথা বলেছি তাদের সঙ্গে। এসবের মধ্যে হাসপাতাল, বাজার-এসব জায়গাতেও যেতে হয়েছে পেশাগত কাজে। করোনা ধরবে আমাকে এমন ভয় হয়নি কখনো।
একটা সময় দেশের পরিস্থিত এমন হলো যে-মাস্ক না পড়া, আর কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়া অকারণে রাস্তায় বের হওয়া-একটা মুন্সীয়ানা তখনো যথেষ্ট নিরাপত্তা নিয়েই চলতাম আমি। এটা নিজের জন্য, অন্যের জন্য। এই সময়ের মধ্যে আরো যথেষ্ট সাহস যুগিয়েছি মনে।

আমার প্রিয় ভাই মেজর (অব:) খালেদ ইকবার সিকান্দার-যিন আমার আদর্শ। আমার এই জীবনে যতো ভালো কাজ আছে-এর সবটুকুই শিখেছি তাঁর কাছ থেকে। আমার জীবনের প্রথম সাইকেল, হাত ঘড়ি, ক্যাসেট প্লেয়ার, কম্পিউটার, দামি জুতা, ব্লেজারসহ আরো হাজারো কিছু-এরসব পেয়েছি এই ভাইয়ার কাছ থেকে। বাবাকে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারানোর পর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার আগেই আমাকে চলে আসতে হয় চাচা কর্নেল এ কে এম সিকান্দার হোসেনের বাসায়। তখন থেকেই আমার পুরো পৃথিবী চাচা আর ভাইয়া। জুন মাসের শুরুর দিকে ভাইয়া করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন। তখনো মনে শক্তি আছে বেশ। ভেঙ্গে পড়িনি। জুলাইয়ের ১০ তারিখে সিএমএইচ থেকে খবর আসে তিনি আর নেই। মেজর খালেদ ইকবাল সিকান্দার ছিলেন ধার্মিক, সত্যবাদী, নির্লোভ, নিভৃতচারী, পরোপকারী, বন্ধুবৎসল, প্রচারবিমুখ, নিরহঙ্কার, সদালাপী এবং অসম্ভব সৎ একজন মানুষ। আমার অনুপ্রেরণা। আমার আদর্শ। যখন খবর পেলাম তিনি আর নেই-বিশ^াস করুন সব সাহস তখন উড়ে শেষ হয়ে যায়। বাবাকে হারিয়ে যখন প্রথম এতিম হলাম, তখন মাটির সঙ্গে কথা বলি আমি। দ্বিতীয় এতিম হলাম ২০১২ সালে বাবার অবর্তমানে বাবা বলে যাকে জেনেছি কর্নেল এ কে এম সিকান্দর হোসেনের মৃত্যুর পর। আর পুরো পৃথিবী শূন্য হয়ে গেল ভাইয়াকে হারানোর পর।

‘নিশ্চয়ই মৃত্যুর সময় নির্ধারিত। আল্লাহ্র অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পরে না’ সূরা আল ইমরান। এসব ভেবে যখন কিছুটা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা তখনই বাসায় করোনার হানা। ৯ সেপ্টেম্বর থেকে স্ত্রী রুনা পারভীনের শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। শ^াস কষ্ট। অমন কষ্ট এর আগে আর কখনো দেখা হয়নি আমার। পরের দিনই করোনার পরীক্ষা। এলো পজিটিভ। সাহসের বৃত্তটা ছোট থেকে আরো ছোট হলো। কারণ বড় ছেলের বয়স ১০, মেঝটা ৭ আর ছোট্টটা আড়াই বছর-ওদের কথা ভেবে। দুই রুমের বাসায় কি যে কষ্ট, বড় দু’টোকে বোঝানো গেলেও আড়াই বছরের কন্যা কিছুতেই থাকবে না মায়ের স্পর্শ ছাড়া। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো আমার। শ্বাস মাপার যন্ত্র মিনিটে মিনিটে বলছে, আমার শ্বাসের মাত্রা কখনো ৯১, ৯০। শ্বাস নেয়ার কষ্ট লিখে কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। ১৬ সেপ্টেম্বর করোনা পরীক্ষা করানোর দু’দিন পর জানলাম, করোনা ভাইরাস ছাড়েনি আমাকেও। ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমার কাছে মনে হয়েছে গাছ কাটার কড়াত দিয়ে কেউ আমাকে ছিন্নভিন্ন করছে। তিনটি সন্তান আর কারোনাভাইরাসে আক্রান্ত স্ত্রীর কথা চিন্তা করে কান্না করাও সম্ভব ছিল না। প্রথম দু’দিন ছোট মেয়েটি পাগলের মতো ছটফট করেছে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য, কিন্তু সম্ভব হয়নি বুকে টেনে নেওয়া। আমিও নেইনি। ছোট ছেলে দু’টো সামলিয়েছে ছোট্টটাকে। কিন্তু ক’দিন বাদে বুকে টেনে নিতে বাধ্য হয়েছি আমরা। এসব ক্ষেত্রে আসলে কোনো নিরাপত্তাই মানা কখনো কখনো সম্ভব হয় না।

এতক্ষণ বলছিলাম মন খারাপ হওয়ার কথা। এবার মন ভালো হয়ে যায় এমন কিছু বলতে চাই। করোনা মানেই এখন আর সবার পালিয়ে যাওয়া নয়। করোনা মানেই এখন আর একা নয়। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে করোনা মানে পুরো বাংলাদেশ সঙ্গে থাকা।

সাংবাদিকতার কারণে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছুটে যেতে হয়েছে আমাকে। উন্নত, মধ্যম আয় আর দারিদ্রাসীমার নিচে বাস করে এমন ১৯টি দেশ ভ্রমণ করা হয়েছে আমার। সেকারণে অভিজ্ঞতাও একেবারে কম নয়। ওই সব দেশে গিয়ে সব সময় মেলাতে চেষ্টা করেছি নিজের দেশের সঙ্গে। উন্নত দেশে যা সাধারণ ভাবে ঘটতে দেখেছি বা শুনেছি, করোনা পজিটিভ হওয়ার পর এমন বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে আমার জীবনে। আমার প্রিয় লাল সবুজের বাংলাদেশে এমন কিছু হবে তা ভাবনাতে থাকলেও খুব একটা হয়নি, যা হয়েছে এবার।

শুরুতেই বলেছিলাম প্রথমে আক্রান্ত হয় আমার স্ত্রী। সব ধরনের উপসর্গ থাকায় স্ত্রীকে করোনার টেস্ট করাতে হবে। কিন্তু কোথায় করাবো? বেসরকারি হাসপাতালে তিন হাজার আটশ’ টাকা করে নেয় একটি টেস্টে। সেখানেও নানা অব্যবস্থাপনা আছে বলে শুনেছি, নিজেও দেখেছি আর গণমাধ্যমে সংবাদ তো আছেই। এই নিয়ে নানা টেনশন। বাসার পাশেই আছে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতাল। এটা কাগজের নাম। আজিমপুর ম্যাটার্নিটি হাসপাতাল নামে সবার কাছে পরিচিত।

শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আতিকুল ইসলামকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় টেস্ট করাবো? ডাক্তার আতিকুল ইসলাম এবং তার চিকিৎসক স্ত্রী, সন্তানও করোনা পজিটিভ ছিলেন। তিনিও পরামর্শ দিলেন মাতৃসদনে করাতে। মাত্র একশ’ টাকায় কেমন টেস্ট হবে এমন নানা চিন্তা থেকে স্ত্রীকে পাঠালাম মাতৃসদনে। টেস্ট করানোর পর বাসায় এসে ওর যে বর্ণনা-সেটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। কিন্তু পরের দিন আমি যখন টেস্ট করাতে গেলাম তখন মিল পেলাম। এমন আন্তরিকতা কবে পেয়েছি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মনে নেই। প্রচন্ড শরীর ব্যথা নিয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে দশটার দিকে গেলাম মাতৃসদনে। মূল ভবনের পেছনে অর্থাৎ পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের বিভাগীয় অফিসে প্রবেশে আগেই বাম দিক দিয়ে যে প্রবেশপথ, সেখান দিয়ে সামান্য এগিয়ে যাওয়ার পরই ঝকঝকে তকতকে একটা রুম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দেখলে বোঝাই যায় করোনার টেস্ট করাতে যারা আসবেন তাদের জন্যই প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে এই কক্ষ। বসার জন্য পরিচ্ছন্ন বেশ কিছু চেয়ার আর কিছু টেবিলও আছে। টেবিলের ওপরে ফরম রেখে নিজের তথ্য পূরণ করতে হয় সেবা গ্রহীতাকে।

করোনা টেস্ট করাতে যারা যান-তাদের অধিকাংশই একটা অস্বস্তি আর ভয় নিয়ে কেন্দ্রে আসেন। তবে ম্যাটার্নিটি হাসপাতালের করোনা টেস্টের কক্ষের ভেতরে প্রবেশের আগেই আপনার সেই ভয় কিছুটা হলেও কেটে যাবে। আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। একজন বললেন, টেস্ট করাবেন? জি বলে সামনে আগালাম। তিনি একটা কাগজ বের করে দেখিয়ে দিলেন যা যা পূরণ করতে হবে আমায়। আর বললেন, ‘এটা কোনো ব্যপার না। ৭ দিন পর ঠিক হয়ে যাবেন। আমাদের রুমে ৩ জনের সবার হইছিল’। আন্তরিকতা নিয়ে এই কথাগুলো ভদ্রলোক আমাকে যেমন বলেছেন, আমার আগের জন এবং পরের জনকেও বলতে শুনেছি। যাইহোক এরপর একশ’ টাকা নিলেন তিনি। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লেগেছে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড। ফরম পূরণ করে দেওয়ার পর আরেকজনের কাছে জমা দিলাম। তিনি একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, বাইরে অপেক্ষা করুন। কিছুক্ষণ পর একটা স্বচ্ছ কাচের বাক্সের সামনে দেওয়া চেয়ারে বসানো হলো আমাকে। ভেতরে থাকা একজন নারী তার হাতে লাগানো বিশাল গ্লাভস্ দিয়ে আমাকে আলতো করে ধরে নাকের ভেতরে একটা বড় আকৃতির কটনবাডের মতো কিছু একটা দিলো। একটু ব্যথ্যা পেলাম। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনই এ সময়ে বলে উঠলেন, সরি। সরকারি দু’জন কর্মচারীর একসঙ্গে অন্যের কষ্টে এমন দুঃখ প্রকাশ, এমন অনুভূতিতে আমি মুগ্ধ হয়েছি। কারণ করোনা টেস্ট করাতে যারা আসেন তাদের জন্য এমন পজিটিভ বিষয়গুলো বেশি বেশি প্রয়োজন। মাস দুয়েক আগে ড্রাইভার মালেকের বাড়ি আর একাধিক ফ্ল্যাটের খবর যেভাবে ভাইরাল হয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে সরকারি দু’জন কর্মচারীর এই যে অন্যের দুঃখে দুঃখ পাওয়া-এমন ছোট ছোট ঘটনাগুলোও ভাইরাল হওয়া দরকার।

যাই হোক দু’দিন পরে মোবাইলে বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হলো আমার স্ত্রী করোনা পজিটিভ। আর একদিন পর আমিও বার্তা পেলাম করোনা পজিটিভের। পরিচিত চিকিৎসকদের কাছ থেকে ওষুধের তালিকা নিলাম আর সঠিক নিয়ম মেনে শুরু করলাম শরীরে করোনাভাইরাস নিয়ে নতুন এক জীবন।

পরের দিন ১৮ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটা নম্বর থেকে স্ত্রীর নম্বরে ফোন এলো। দীর্ঘক্ষণ কথা হলো ওদের মধ্যে। যারা করোনাভাইরাস বহন করছেন কিংবা সব ধরনের উপসর্গ থাকার পরেও টেস্ট করাচ্ছেন না, তাদের কাছে এই উদাহরণগুলো বেশ কাজে দেবে।

আমার পজিটিভ রিপোর্ট এলো দু’দিন বাদে। রিপোর্ট আসার পরপরই খুব হতাশ হলাম। যদিও চিকিৎসকের পরামর্শে আগে থেকেই প্রচুর ফল, প্রোটিন জাতীয় খাবারের সঙ্গে সাধারণ ওষুধ চলছিল। আমার যখন পজিটিভ রিপোর্ট এলো এর একদিন পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি নম্বর থেকে ফোন এলো। অপরপ্রান্তে নারী কণ্ঠের একজন নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আপনি পজিটিভ। খুবই দুঃখ প্রকাশ করছি আপনার জন্য। কিন্তু আপনাকে আমি নিশ্চয়তা দিতে চাই মহান আল্লাহ্র ইচ্ছায় আর আমাদের সবার চেষ্টায় আপনি ৭ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে ‘টেনশন করা যাবে না’-এটাও একটা ওষুধ। এই পরামর্শ আপনাকে মেনে চলতে হবে।’ চিকিৎসক প্রশ্ন করলেন, ‘এখন শরীর কেমন।’ বললাম, এই তো কোনোরকম চলছে। তিনি জানতে চাইলেন, ‘যে ওষুধ খাচ্ছি সেগুলো কি।’ তাকে বিস্তারিত বললাম। তিনি বললেন, ‘প্যারাসিটামল একটার জায়গায় দুটো করে দিন। সকালে দুটো আর রাতে দুটো। আর অন্য ওষুধ ঠিক আছে।’ চিকিৎসক বললেন, কমলা লেবু, লেবু, আপেল, মালটাসহ বাজারের অধিকাংশ ফল যেন নিয়মিত দিনে দু’বার করে খাই। যদি পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে তাহলে যেন অন্তত প্রচুর লেবু পানি খাই। নম্বরটা সেভ করে রাখার পরামর্শ দিলেন তিনি। বললেন, শরীর যদি খুব খারাপ হয় তাহলে যেন তাদের নম্বরে ফোন করে পরামর্শ চাই। আমার কথা বলতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। তারপরেও বললাম, যদি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হয় কিংবা অক্সিজেন বা অ্যাম্বুলেন্স সাপোর্ট লাগে? তিনি বললেন, ‘কোনও সমস্যা নেই। এই নম্বরে ফোন করবেন, আপনাকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।’ আমি সত্যিই অবাক হলাম। করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঠিক পরের দিনই সরকারি কোনো সংস্থা এইভাবে আমার এবং স্ত্রীর যে খোঁজ নিলো এতে মনোবল যথেষ্ট চাঙ্গা হলো আমাদের।

আমার করোনা পজিটিভ-সহকর্মীরা এই সংবাদ জেনে যায় খুব দ্রুত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও জানিয়ে দেয় অনেক সহকর্মী। একাধিক ফেইসবুক এ্যাকাউন্ট থেকে আমাদের জন্য দোয়া চাওয়া হয়। সেখানে আসে শত শত মতামত। হাজারো পরামর্শ। এসব পরামর্শের মূল কথা হচ্ছে- কোনো চিন্তা নেই, আমরা আছি তো। এমন ভালোবাসা দেখে কিছুটাও হলেও স্বস্তি পাই আমরা।

ফেইসবুকের কারণে করোনা পজিটিভের সংবাদ ছড়িয়ে যায় পরিচিত সব মহলে। মোবাইল বার্তায় আসতে থাকে হাজারো সমাধান। মেসেঞ্জারে আসতে থাকে চিকিৎসকদের নানা প্রেসক্রিপশন। বিভিন্নজন জানতে চান ফোন করবেন কিনা। কথা বলতে সমস্যা কিনা, এমন নানা প্রশ্ন। যারা আগে পজেটিভ ছিলেন তারা প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলে ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেন। কি খাবো, কি করবো তার তালিকা আসতে থাকে মেসেঞ্জার আর মোবাইলে। সবারই একই কথা-যে কোনো প্রয়োজনে যেন তাদেরকেই সবার আগে জানাই।

বাংলাদেশ কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইন ফোন করে জানতে চান, কিছু লাগবে কিনা আমার? কথা বলতে সমস্যা নেই তো? চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে তো? স্যারকে জানালাম, আমার উপসর্গ যখন ছিল তখন বেশ কষ্ট হচ্ছিল, এখন কিছুটা ভালো। সোহরাব হোসাইন বললেন, যেকোনও সমস্যায় যেন তাকেই সবার আগে ফোন দেই। রিপোর্ট নেগিটিভ আসার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন দু’বার করে ফোন দিয়েছেন তিনি। সদ্য করোনা পজিটিভ হওয়া একজন নিম্নবিত্ত সাংবাদিক আর তার স্ত্রীর সামনে যখন পুরো আকাশ ভেঙে পড়া অবস্থা, যখন তাদের ছোট্ট তিনটি সন্তান কীভাবে আলাদা রাখা যায় ছোট্ট দু’রুমের বাসায়-এমন হাজারো চিন্তা, তখন রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইনের এমন ফোন কিছুটা হলেও বুকে আশা জাগায়-এ পৃথিবীতে কেউ অসহায় নয়। মেসেঞ্জার ভারী থেকে আরো ভারী হয়। পরামর্শের সংখ্যাও বাড়ে প্রতিদিন। সব পরামর্শ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। করোনা নিয়ে চারদিকে যখন এতো আতঙ্ক, কেউ কারো কাছেই আসতে চায় না-তখন আমার খোঁজ নিতে অনেকেই বাসায় আসতে চান। কেউ বাজার করে দিতে চায়, টাকা পয়সার সমস্যা আছে কিনা জানতে চায় হাজারো মানুষ। যাদের অধিকাংশের সঙ্গেই পরিচয় সাংবাদিকতার মাধ্যমে। না সাংবাদিকতা করে তাদের ব্যক্তিগত কোনও উপকারে আসিনি কখনও, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্রেফ ভালোবাসার। মানুষের এমন ভালোবাসা আমাদের কষ্ট অনেকটাই হালকা করে দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান স্যার ফোন করে বললেন, ‘ধ্যাৎ করোনা কোনো রোগ না। এটা হলে কিছুই হয় না। তোমার কোনো টেনশন নাই। খাওয়া দাওয়া করো’। বুঝি মনের সাহস বাড়াতেই স্যারের এমন কথা বলা। আরো অনেকটাই হালকা হই। মনে মনে ভাবি, করোনা রোগীর জন্য চারপাশের এমন ভালোবাসা সত্যিই জরুরী।
কাঁটাবনের মাহমুদা ইয়াসমিন দম্পতি তো কয়েকদিনের খাবার একসঙ্গে তৈরি করে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন একাধিক দিন। শান্তিবাগের তাজিন আর জাহিদ দম্পতি খাবার পাঠালেন বেশ কয়েক দিন। এই ভালোবাসা বলে শেষ করা যাবে না। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক হওয়া সিনিয়র সচিব আকরাম আল হোসেন একদিন ফোন করে বললেন, ‘কি করতে পারি আপনাদের জন্য? ধন্যবাদ জানালাম। তিনি বললেন, জরুরী যে কোনো সেবার জন্য যেন তাকে স্মরণ করি। সব ধরনের সাপোর্ট সরকার দেবে।’ মানুষের ভালোবাসায় ধীরে ধীরে চিন্তা মুক্ত হতে থাকি আমি।

আবারও ফিরে আসি আমি মন ভালো করা খবরে। ১৬ সেপ্টেম্বর করোনা পজিটিভ হওয়ার পর থেকে নেগেটিভ না হওয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ফোন পেয়েছি আমরা। অধিপ্তরের ফোন মানে সরকারি ফোন। ফোন করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানতে চেয়েছেন নানা বিষয়। কেন বেশি খেতে হবে, কেন বেশি বেশি ঘরে থাকতে হবে, এমন নানা পরামর্শ তাদের। একদিন তো দিনে দুবার আবার বিকেলে আরও একবার মোট তিনবার ফোন করে কথা বলেছেন তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। মনটা ভরে গেছে সেদিন।

হাজারো খারাপ সংবাদের মধ্যে আমার মতো একজন নগণ্য মানুষকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে টানা ফোন, নানা পরামর্শ আমার মনকে ভালো করে দিয়েছে। একদিন এক চিকিৎসক ফোন করে পরিবারের আর্থিক অবস্থাও জানতে চাইলেন। করোনাভাইরাস শরীরে প্রবেশের চারদিন পর এক নারী চিকিৎসক ফোন দিয়ে বললেন, বাচ্চাদের আর মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখার দরকার নেই। মাস্ক ব্যবহার করে ওদের বুকে টেনে নিন। সেদিন আমার শরীর প্রচন্ড দুর্বল ছিল। মনটাও ভারী। তার এমন ফোনের পর বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম অনেকক্ষণ। প্রতিবার ফোন পেয়েছি আর নিজেকেই প্রশ্ন করেছি আমি বাংলাদেশের নাগরিক। সরকার আমাকে ফোন দিয়ে স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছে। এক গাড়িচালক মালেকের শ’কোটি টাকার সংবাদ যদি আমাকে অস্থির করে তোলে, তাহলে আমার আর আমার স্ত্রীর মতো একজন সাধারণ নাগরিককে দফায় দফায় এমন সরকারি ফোন আমাকে শান্তি দেয়। মনে হয় নিজের স্বজনদের পরেও আছে আরও অনেক স্বজন।

অফিস থেকে বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, প্রধান বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খানসহ সকল সহকর্মী, এফবি বন্ধু, শিক্ষামন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তা, বিদেশে থাকা পরিচিত-অপরিচিত মানুষদের বারবার খোঁজ নেওয়াটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে কেউ একা নয়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর জন্য এমন ভালোবাসা চিন্তায় থাকা রোগীর মন ভালো করে দিতে বাধ্য।
যাদের করোনার উপসর্গ আছে তাদের উচিত চারদিকে ঘোরাফেরা না করে সরাসরি মাত্র একশ টাকা দিয়ে টেস্ট করিয়ে ফেলা। প্রচুর পরিমান খাওয়া দাওয়া করা। করোনাভাইরাস যাকে আক্রমন করে আর তিনি যটি তা টের না পান তাহলে সেটা মহান সৃষ্টিকর্তার তার প্রতি আর্শিবাদ। আর তিনি যদি ভাইরাসের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড টের পান-তাহলে তিনিই বুঝবেন শরীরের ভেতরে কি হয়ে যাচ্ছে তার। তাই কোনোক্রমেই অবহেলা করা ঠিক না। উপসর্গ হলেই প্রচুর খাওয়া দাওয়া করতে হবে। গরম পানির ভাঁপসহ দেশীয় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। হাতে কিছু টাকাও রাখতে হবে-যাতে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হলে হাসপাতালে যাওয়া যায়। তবে স্বাভাবিক ভাবে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেয়া সম্ভব। আমার ও আমার স্ত্রী আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় শতভাগ সুস্থ্য হয়েছি বাসায় থেকেই।

লেখাটি শেষ করবো আবারো সম্মিলিত চেষ্টার গল্প দিয়ে। ঠিক ২১ দিন পর গত ৬ অক্টোবর আমার স্ত্রী এবং ৭ অক্টোবর আমি আবারো একই কেন্দ্রে যাই টেস্ট করাতে। কারণ করোনা নেগিটিভ সনদ পাওয়ার পরই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবো। কিন্তু দু’দিন পরেও রিপোর্টের রেজাল্ট আসে না কারোই। দু’দিন পরে ওয়েব সাইটে গিয়ে অভিযোগ জানায় আমার স্ত্রী। অভিযোগের ৪০ মিনিট পর ফোন দিয়ে বিস্তারিত জানতে চান কেউ একজন। আমারো রিপোর্ট না আসায় জানাতে হয় অভিযোগ। প্রায় প্রতিদিন ৪/৫ বার ফোন দিয়ে নানা তথ্য নিয়েছে সরকারি লোকজন। কেন রিপোর্ট পেলাম না, করোনীয় কি এসব নিয়ে ফোন আর ইমেইলে কথা-বার্তা চলে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত। ১১ অক্টোবর আমরা দু’জনই মোবাইলে বার্তা পাই আমাদের রেজাল্ট নেগিটিভ।

এক সময়ের মহামারি করোনাভাইরাসের সঙ্গে এখন যুদ্ধ করছে সবাই। সেই যুদ্ধটা এই শীতে আরও বাড়বে, এমনই আশঙ্কা অনেক বিশেষজ্ঞের। পত্রিকায় দেখলাম, ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ করোনায় আক্রান্ত। নিজেকেউ প্রশ্ন করলাম, কেনই বা হবে না? যেভাবে প্রতিযোগিতা করে সব কাজ করা-তাতে তো মনে হয়-করোনা বলতে পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, করোনা যাকে ধরে ছেড়ে দেয় সে বেঁচে গেল-কারণ মহান সৃষ্টিকর্তা হয়তো এমনটিই চেয়েছেন। আর যাকে ধরলো কিন্তু ছাড়লো না, তার অবস্থাটা কি একবার ভেবে দেখুন। তাই করোনাকে কখনোই অবহেলা করা ঠিক হবে না। অবশ্যই নিজে বাঁচতে এবং অন্যকে বাঁচাতে স্বাস্থ্যবিধী মেনে চলতে হবে। ভাইরাস আক্রমণ করার পর প্রথম চারদিন আমার কাছে মনে হয়েছে-মৃত্যু আসলে খুবই কাছে। যখন চারদিকের মানুষের ভালোবাসা পেতে শুরু করলাম তখন মনে হয়েছে আমি পৃথিবীতে একা নই। যখন বুঝতে পারলাম আমার সঙ্গে রয়েছে হাজারো মানুষ-তখন আমার আস্থা তৈরি হয়েছে। যখন একের পর এক সরকারি ফোন পেয়েছি আর অন্য প্রান্ত থেকে বলছে, এ্যাম্বুলেন্স কিংবা অক্সিজেন সার্পোট লাগলে এই নম্বরে ফোন করবেন-তখন বিশ্বাস বেড়েছে-আমার সঙ্গে সরকারও আছে।

সবার ভালোবাসায় ভালো থাকুক প্রতিটি মানুষ, ভালো থাকুক লাল সবুজের আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক:  বিশেষ প্রতিনিধি, চ্যানেল আই এবং সভাপতি, বাংলাদেশ এডুকেশন রিপোর্টার্স ফোরাম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত