প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] বরেন্দ্র অঞ্চলে কমছে কৃষি জমি,বাড়ছে আমবাগান-কাজ হারাচ্ছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী

জোহরুল ইসলাম: [২] শস্য শ্যামলে ফসল ভরা আমাদের এই দেশ বাংলাদেশ।দেশের ক্রমবর্ধমান বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে আমাদের কৃষিক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। এমনিতেই আমাদের দেশের জনসংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু কৃষি জমির পরিমাণ কম। তার ওপর আবার প্রতিবছর কৃষি জমি দখল করে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, হাটবাজারসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ইটভাটা স্থাপনের কারণে কৃষি জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে ভবিষ্যতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সহ বরেন্দ্র অঞ্চল নাচোল উপজেলাসহ আশপাশ এলাকায় খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।

[৩] নাচোল উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নাচোল উপজেলায় আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর। এ বছর কৃষি জমিতে আবাদ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে। আমবাগান রয়েছে প্রায় ৪শ হেক্টর জমিতে।

[৪] সরেজমিনে নাচোল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানাগেছে,বিগত বছরে প্রয়োজনের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, খরা, কৃষি উপকরণ সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদির মূল্য, শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি, উৎপাদিত ফসলের কাঙ্খিত বাজার মূল্য না পেয়ে ফসলের আবাদ করে উপর্যুপরি লোকসানের কারণে অনেক কৃষক কৃষি জমিতে নানা রকম বনজ ও ফলজ বাগান করার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এসব জমিতে গাছ লাগানোর পরও ৫/৬ বছর যাবৎ সাথী ফসল হিসাবে নানারকম ফসলের আবাদ করা যায়।

[৫] সে কারণে যেসব কৃষকের বেশি জমি আছে তাদের অনেকেই কৃষি জমিতে বাগান করছেন। আমের চাহিদা ও বাজার স¤প্রসারণের কারণে লাভজনক হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি বছরই বাড়ছে আম বাগানের পরিমাণ। প্রতিবছর বাড়ছে জেলায় আমবাগান প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে। তবে এ বছর ধানের ও খড়ের নায্য মূল্য পেয়ে খুব খুশি কৃষক।

[৬] নাচোল উপজেলার খেসবা গ্রামের কথাই বলা যাক।এই গ্রামটির দক্ষিন মাঠে আবাদি কৃষি জমি প্রায় ৪০০বিঘার মত। গত দুই বছরে এই আবাদি জমিতে আমবাগান গড়ে উঠেছে প্রায় দেড়শ বিঘা জমিতে। বর্তমানে চলতি বছরে প্রায় একশ বিঘা জমিতে আমবাগান করার জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। এরক বাস্তব চিত্র উপজেলার প্রায় সব গ্রামেই।আর এ পরিবর্তনের কারণে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি লাভবান হলেও বিপাকে পড়ছেন দিনমজুরেরা। ফসলের আবাদ কমে যাওয়ায় কাজ হারাচ্ছে শ্রমজীবী মানুষ, বিশেষ করে কৃষি শ্রমনির্ভর এ এলাকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বিভিন্ন স¤প্রদায়ের মানুষ। কৃষিতে শ্রমের কাজ না থাকায় এবং অন্য পেশায় নিজেদের খাপ খাওয়াতে না পারায় তাঁরা দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হচ্ছে।

[৭] খেসবা গ্রামের কৃষক মাইদুর,একরামুল,ফারুক জানান,আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চল হিসাবে খ্যাত নাচোল উপজেলা। কৃষি জমি রক্ষার জন্য তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলামিত্র যে আন্দোলন করেছিলেন তা বর্তমানে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কৃষি জমি বাদ দিয়ে প্রতি বছর যে ভাবে আমবাগান গড়ে উঠছে তা আমাদের খাদ্য ঘাটতি হুমকির মুখে পড়বে অচিরেই।

[৮] নেজামপুর ইউপির কেন্দুয়া গ্রামের মঙ্গল ও কার্তিক বলেন, ‘হামাগের জ্যাতের (জাতি) পুরুষ মানুষেরা তাও ভ্যান-ভটভটি চালায়ে কিছু আয় করতে পারোছি। কিন্তু হামাগের ম্যায়া মানুষেরা তো এখন ভাত আঁন্ধা আর সংসার দেখা ছাড়া আর কুনুহ কাজিই নাই। আগেও ওরাও হামাগের পুরুষের সমান উপার্জন করত। কিন্তু এখন চারদিকে বাগান হয়ে যাওয়ায় মাঠোত দিন দিন কাজ কমে যাচ্ছে। হামরা কি কইরা খামু!

[৯] রাজবাড়ি এলাকার কৃষক রহিম মিয়া জানান,কৃষকদের লোভ দিয়ে প্রথমে বাগান মালিকরা আবাদি জমি ক্রয় করছে।তার পর সারা মাঠ জুড়ে তৈরী করছে আম বাগান। কোন কৃষক আবাদি জমি দিতে না চাইলেও পরে আমবাগানের মালিকের কৌশলের কাছে অল্প মূল্যে বাধ্য বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষি জমি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স¤প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন কৃষি জমি রক্ষার কোন বিকল্প নেই। আমাদের কৃষি আবাদি জমি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

[১০] নাচোল উপজেলা কৃষি অফিসার বুলবুল আহমেদ জানান, এ বছর রোপা আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ৪শ’ ৬৫ হেক্টর। কিন্তু আবাদ হয়েছে ২৩হাজার ১শ’ ৬০ হেক্টর। উপজেলায় মোট আবাদি জমি প্রায় ২৫হাজার হেক্টর এর মধ্যে প্রায় ৪শ’হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফলের বাগানের চাষ হচ্ছে। বাগান করার ফলে খাদ্যঘাটতি খুব একটা হবেনা এ উপজেলায়, তবে বাগান করার ফলে সাধারণ মানুষ,ক্ষুদ্র গোষ্ঠীরা কাজ হারাচ্ছে।

[১১] এব্যাপারে নাচোল বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের সভাপতি জোহরুল ইসলাম শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এভাবে ভেতরে ভেতরে মহাসর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। এমনিতে উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ আবাদী জমি কমছে। আমরা বর্তমানের কথা ভেবে এসব করছি। আগামীর কথা ভাবছি না।

[১২] এমনটি হলে কোন জাতি টিকে থাকতে পারে না। এদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য হলো ভাত। প্রবাদ রয়েছে মাছে ভাতে বাঙ্গালী। কিংবা ভেতো বাঙ্গালী। অর্থাৎ ধান। আম-লিচু-পেয়ারা বছরে একবার হয়। আর তা কখনোই আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারে না।বাগান করার ফলে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির উন্নয়ন ঘটছে, কিন্তু এখানে সাধারণ হতদরিদ্র, কৃষক,ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন হচ্ছেনা।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত