প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ, ২০১৩-এর হেফাজত সমাবেশ ও ইতিহাসের নানা কথা

দীপক চৌধুরী: একটা সময় গেছে যে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে বারবার অপচেষ্টা চলানো হয়েছিল। ১৯ বার এই অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলেও তারা থেমে যায়নি। আদালত ও আইনের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হয়েছে শুধু এ কারণে যে, তাঁর মেয়ে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে আসীন হতে পেরেছেন বলেই। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে তাঁর কারণেই। তাঁর দলের অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলেও তা সম্ভব করা হতো না।

গণমাধ্যমে দেখলাম, মানুষ ও অন্য যে কোনও প্রাণীর ভাস্কর্য নির্মাণ, সংরক্ষণ হারাম ও গুনাহের কাজ বলে ফতোয়া দিয়েছেন আলেমরা। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ ফতোয়া দেওয়া হয়েছে বলেন জানান তারা। পূজার উদ্দেশ্যে না হলেও ভাস্কর্য নিমার্ণ করা যাবে না। এ ফতোয়া দিয়েছেন ৫ জন আলেম। আর এ ফতোয়া সমর্থন করে সাক্ষর করেছেন দেশের ৯৫ জন আলেম। বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলন করে ফতোয়ার বিষয়টি জানানো হয়। একই সঙ্গে সরকারকে সকল প্রাণির ভাস্কর্য ও মূর্তি অপসারণ করার আহবান জানিয়েছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে ৫ জন আলেম ফতোয়াটি পাঠ করেন কেন্দ্রীয় দারুল ইফতা বাংলাদেশ বসুন্ধরার প্রধান মুফতি এনামুল হক। তিনি ছাড়াও ফতোয়াটি যৌথভাবে দিয়েছেন মারকাযুদ দাওয়া আল ইসলামিয়ার আমীনুত তালীম মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক, জামিয়া সুবহানিয়ারর প্রধান মুফতি মাওলানা মহিউদ্দিন মাসুম, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শিক্ষক মাওলানা তাউহীদুল ইসলাম।

অন্যদিকে, দেশে ভাস্কর্য নিয়ে অহেতুক একটি বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, উপমহাদেশে ইংরেজরা আসার পর কেউ কেউ ইংরেজি শিক্ষা হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছিল, টেলিভিশন চালু হলে তা দেখা হারাম এবং হজে যাওয়ার জন্য ছবি তোলাও হারাম বলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফতোয়া দেয়া হল যে, যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তারা সবাই কাফের। সেই ধারাবাহিকতাতে তাদেরই প্রেতাত্মারা কিন্তু আজকে ভাস্কর্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের জন্য মাস্ক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আমার প্রশ্ন মানুষ যাবে কোথায়? সাধারণ মানুষ তো বিভ্রান্ত আলেমদের কথায়? এর কী কোনো মীমাংসা নেই। দায়িত্ব কার? এগিয়ে আসা দরকার কাদের? এ তামাশা বেশিক্ষণ কী চলতে দেয়া উচিৎ। সরকার বনাম আলেমদের মধ্যে যেন ‘বাহাস’ এটি।

‘কেন টার্গেট শেখ হাসিনা’ এর ১১১টি কারণ উল্লেখ করা যাবে। বিরাট নিবন্ধ তৈরি করেছিলাম। ছাপাও হয়েছে কাগজে। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে মতিঝিল শাপলা চত্বরেও দেখেছি সন্ত্রাস। এরপরও কী আমাদের কারো শিক্ষা হয়নি! হুমকির দিন তো শেষ। সেদিন যারা কাপড়ের সাদা কাফন দেখিয়ে টেলিভিশনে বলেছিলেন, ‘আমাদের সরানোর ক্ষমতা কারো নেই, কাফনের কাপড় পড়ে এসেছি।’ আফসোস্ পরদিন দেখলাম মতিঝিল- দিলকুশা ফক্ফকা।

সুতরাং শুধু এটুকু বলবো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দমানো যায় না, তাঁকে দিয়ে আপসকামিতা হয় না। কিছু রাজনৈতিক নেতাকে কেনা যায়, লোভ দেখিয়ে দলে নেওয়া যায়; ভয় দেখিয়ে বাগে আনা যায়; আদর্শ বদলানো যায়- শেখ হাসিনাকে দিয়ে তা করা যায় না। আজ এটা পরীক্ষিত যে, তিনি তো সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। তাঁর মধ্যে ত্যাগ, শান্তি-সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, উন্নয়ন- দেখছে মানুষ। এদেশের মানুষ বিশ্বাস করে বন্দুক, রাইফেল, বোমা-গ্রেনেড নিক্ষেপ করলেও মৃত্যুকে পরোয়ানা না করে তিনি রাজপথে বারবার নেমে এসেছেন মানুষের কাতারে। কখনো ঘরবন্দি করে, কখনো অস্থায়ী জেলে ঢুকিয়ে, কখনো সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ষড়যন্ত্রে ফেলে তাঁকে বিনাশ করার অপচেষ্টা করা হয়। শেখ হাসিনাকে বিনাশ করতে সক্ষম হলেই বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানো যাবে। বাঙালি, মা ও মাটির মতো যাঁর মন – তাঁকে আমাদের পথনির্দেশক জাতির পিতার স্বাধীন দেশের মানুষ প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে। এ কারণেই তিনি এখনো বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। সত্যি কথা উচ্চারণ করবার সময় এসেছে। খালেদা জিয়া কিন্তু এখনো জেলের বাইরে। তিনি দলপ্রধান এ জন্যেই কিন্তু নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিকতার জন্যে। তাঁর উদারতার জন্যে। খালেদা জিয়া তো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, চাকরিতে পুন:বহাল করেছেন। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছেন। খালেদা জিয়ার নির্দেশে এদেশে কী রকম ভয়ঙ্কর তাণ্ডব হয়েছে তা বলাবাহুল্য। অতীতের কথা যদি নাও বলি, ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৫ সালে যে এক হাজারের বেশি মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কয়েক হাজারকে পুড়িয়ে পঙ্গু করা হয়েছে, আগুনে সব হারিয়ে অনেক স্ত্রী বিধবা হয়েছেন, অনেক মা সন্তান হারা হয়েছেন, বাবা স্ত্রী-পুত্র হারিয়ে এখন নীরবে ঘরের ভিতর চোখের পানি ফেলেন- তাদের জীবনে আর স্বপ্ন নেই। এসব হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টা, তরুণী-তরুণীর যৌবন কেড়ে নেবার হুকুমের আসামি খালেদা জিয়া। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছেন। ’৭৫ এর পর বাংলাদেশের সকল ইতিহাস পাল্টে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে যারা গর্ব করতেন তাদের হত্যা করা হলো, জেলের ভিতর হত্যা, সারাদেশে নৃশংসতা, দমানো হলো, চললো নিষ্ঠুর নির্যাতন। জাতির পিতার সেই ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানো-প্রচার নিষেধ করার পরও বাংলাদেশ কিন্তু পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহাসিক ভাষণ বলে জাতিসংঘের ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে। তবু সাবধান থাকতেই হবে দেশ নিয়ে, জেগে থাকতে হবে- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। এটা একমাত্র আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। বাঙলির প্রাণের ঠিকানা।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত