প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : ‘গোল্ডেন মনির’কে আগে ধরা হয়নি তো কি হয়েছে, এখনতো ধরা হয়েছে, আরো একে একে ধরা পড়বে

দীপক চৌধুরী: নানারকম প্রশ্ন এখন ‘ গোল্ডেন মনির’কে নিয়ে। অনেকে অবাক হয়েছেন তার উত্থানের গতিপথ দেখে। আসলে এটা সম্ভব কীভাবে এ প্রশ্নও রয়েছে তাদের। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রাজধানীতে অসংখ্য প্লট বাগিয়ে নেয়ার দায়ে অভিযুক্ত ‘ গোল্ডেন মনির।’ মনির দীর্ঘদিন ধরেই অন্যায় অপকর্ম ও দুর্নীতি করে আসছে। তার সহযোগীদের মধ্যে গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আছে, হুন্ডি ব্যবসায়ী, প্লট, ফ্ল্যাট ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি রয়েছে। বৈধ ব্যবসার পরিচয়ের আড়ালে অবৈধ ব্যবসা রয়েছে তার। কিন্তু এতোদিন ধরা পড়েনি কেন- এ প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। আমি বলতে চাই, এতোদিন ধরা হয়নি বলে এখন ধরা যাবে না কেন? তার একটা রাজনৈতিক পরিচয় আছে। রাজনৈতিক খুঁটি সে ব্যবহার করেছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না।

‘গোল্ডেন মনির’ গ্রেপ্তারের পর ঢাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি জায়গায় দুর্নীতি, রাঘব-বোয়াল, কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন নিয়ে আড্ডায় কথা হচ্ছিল। সেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছিলেন। আলোচনাকালে কথা প্রসঙ্গে জেনেছি, মনিরকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে ‘রাজউকের’ একদল কর্মকর্তা-কর্মচারি। তারা চাইছে বলেই মনির এতো সহজে অসংখ্য ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক বনেছে। তাকে অপকর্মের সহযোগিতাকারী কর্মকর্তা-কর্মচারির তালিকাও তৈরি হচ্ছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে র‌্যাব মনিরকে গ্রেপ্তার করে। ভূমিদস্যু মনির ‘দিন’কে নাকি ‘রাত’ করতে পারতো। বিপুল পরিমান অর্থের হোতা মনির জানতো কীভাবে নিজেকে নিরাপদ করতে হবে। সুতরাং তার পরিচিত ‘তরিকা’য় কাজ করেছে। সীমাহীন লুটপাট ও দুর্নীতির হোতা কয়েকজনকে গোয়েন্দা পুলিশ চিহ্নিত করেছে শুনেছি। রাজউকে আইনের শাসনহীনতা, বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বড় উদাহরণ মনির। সাবেক একাধিক রাজউক চেয়ারম্যান নাকি তাকে নিয়ে ‘ভালোমন্দ’ খাবার খেতেন। সেও ঈদ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে ‘উপঢৌকন’ পাঠাতো। রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যানকেও তদন্ত কর্মকর্তারা মনিরের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে শোনা যাচ্ছে।

আমাদের চিরচেনা সমাজব্যবস্থার পরিচিত অনেক মুখ আছে যারা মনিরকে আগলে রেখেছেন। সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী তিন ধরনের সরকারব্যবস্থার অদলবদল ঘটেছে দেখেছি। বিএনপি, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু এতোদিন তো ধরা হয়নি মনিরকে। আমি বলি কী, এতাদিন ধরা হয়নি তাতে কী? এখন তো ধরা হচ্ছে। এতোবেশি দুর্নীতিবাজ এদেশে যে, ধরার জন্য শক্তিশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা দরকার, মতলববাজ নয়! সৎ কর্মকর্তারাই ধরছেন।

কেন, স্বাস্থ্যের নূরানী চেহারার ড্রাইভারের কেলেঙ্কারীর কথা ভুলে গেছেন নাকি! ওই মহাদুর্নীতিবাজের নাম আবদুল মালেক। তার নাকি সাতটি আধুনিক ফ্ল্যাট আছে। মহাপরিচালকের গাড়ির চাবি তার পকেটে থাকতো। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সাময়িক বরখাস্ত) আবজাল হোসেনের সীমাহীন লুটপাট ও দুর্নীতির কথা কে না শুনেছে। ধরা হয়েছে এ সরকার আমলেই। পুরান ঢাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এনু-রুপম, পুলিশের দুনীতিবাজ ডিআইজি মিজান, দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক বাছিরুল, পিডব্লিউডির জিকে শামীমকেসহ শত শত দুর্নীতিবাজকে ‘ডান্ডাবেড়ি’ পরিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারই। রাজউকের মতো পিডব্লিউডির একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ ইঞ্জিনিয়ার-কর্মকর্তা-কর্মচারি জিকে শামীমকে সার্বিক সহযোগিতা করেছে। এদের নাম-তালিকা হয়েছে। এখন সময়-সুযোগ মতো ধরা হবে।
আমরা জানি, প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে লেপ্টে আছে দুনীতিবাজ চক্র। আগে সবকিছুই ধামাচাপা দেয়া হতো এখন গ্রেপ্তার করা হয়। আগে জেলে যেতে হতো না, বড়জোর শোকজ হতো, এরপর পুকুড়ে ঢিল পড়ার মতো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতো দুর্নীতির আওয়াজ। গোল্ডেন মনিরের অপকীর্তির বিষয়গুলো আমরা এমনভাবে জানছি, তাতে মনে হতে পারে- গোল্ডেন মনিরই একমাত্র মূল হোতা বা নাটের গুরু। তা কিন্তু নয়। তার বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকেরা গিয়ে সাহায্য করতেন বা চালাতেন। কয়েকজন দুনীতিবাজ রাজনীতিবিদ ছাড়াও একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে সবসময় কাছে পেয়েছে মনির। গোল্ডেন মনির কেবল একাই দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে দুইশ প্লট বাগিয়ে নিয়েছে, এগুলোর সিংহভাগই বাড্ডায়। তার সঙ্গে আর কে কে বা কারা জড়িত ছিলেন তা-ই তদন্ত করবে গোয়েন্দারা। র‌্যাব ধরেছে বাকি কাজগুলো সুচারুভাবে হবে কিনা তাই বড় প্রশ্ন। রাজউকের দুর্নীতির কথা সবচেয়ে বেশি জানে ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালা। দুর্নীতি নামক এই ব্যাধি দূর করা প্রয়োজন। সংখ্যায় কম হলেও অবশ্যই যোগ্য ইঞ্জিনিয়ার ও সৎলোক রয়েছেন রাজউকে। আশা করবো তারা ‘সোজা’ হয়ে দাঁড়াবেন।

র‌্যাব মুখপাত্রের কথায়, রাজউকের ‘বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ গড়েছিলেন মনির। সুতরাং জনগণ দেখতে চাইবে, মনির শুধু নন, সন্দেহভাজন ‘কর্মকর্তারা’ চিহ্নিত হয়েছেন এবং তাদের সবার বিচার শুরু হয়ে গেছে। মনিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া বা তার অপকর্মের কাহিনীগুলো ধামাচাপা দেওয়ার লোকের অভাব ছিল না রাজউকে। তারা নিজেদের ‘মধুরভাণ্ড’ নিশ্চিত করতে দুর্নীতিবাজ মনিরের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও বৈদেশিক মুদ্রা রাখার অভিযোগে তিনটি মামলা দায়ের এবং রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। এটা লক্ষণীয়, তার অপরাধের বিষয়ে তদন্তে সরকারের ৬টি সংস্থা বা বিভাগ জড়িত হয়েছে এখন। সাধারণ মানুষ কামনা করে, দুর্নীতির বিচারের নামে যেন প্রহসন হয় না। ভূমির অপকর্ম নিয়ে রাজউককেন্দ্রিক যে দুর্নীতি মহিরুহে পরিণত হয়েছে, তাকে উপড়ে ফেলতে শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার পরিষ্কার।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সবসময়ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। গতকাল প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সমাজে যেসব উপসর্গ মাঝেমধ্যে দেখা দেয়, যেমন: নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং সৃষ্টি, মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি- এসবের বিরুদ্ধেও আপনাদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে কারও মুখ চেয়ে নয়, যারাই অপরাধী, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখবেন, এটাই আমার কথা। অপরাধী যে দলের হোক বা যে কেউ হোন না কেন, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বৃহস্পতিবার ১১৬, ১১৭ ও ১১৮তম আইন ও প্রশাসন কোর্সের সমাপনী এবং সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন। একাডেমির রেক্টর বদরুন নেছা কোর্সেও ফলাফল প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শাহবাগে বিসিএস প্রশাসন একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকার পর দুর্নীতিবাজদের বিচারে সমস্যা কোথায়? যদি সত্যিই দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করার মানসিকতা ও আন্তরিকতা থাকে তাহলেই কেবল সম্ভব!

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত