প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনিস আলমগীর: প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষাক্রম : শিক্ষামন্ত্রীকে অগ্রিম অভিনন্দন

আনিস আলমগীর :‘ভাব ও কাজ’ নামে কাজী নজরুল ইসলাম একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেটি স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ডের অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইতে। সোমবার আমার ছেলে প্রবন্ধটির কিছুই বুঝতে পারছে না জানিয়ে বুঝাতে বললো। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক এটি বুঝাতে গিয়েছিলেন, কিন্তু সময়ের অভাবে বুঝাতে পারেননি, শিক্ষার্থীদের বলেছেন নিজেরা যেন পড়ে বুঝতে চেষ্টা করে। পড়তে গিয়ে দেখলাম অষ্টম শ্রেণির একজন ছাত্রের পক্ষে নয় শুধু, একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীর পক্ষেও এটি পুরোপুরি বুঝা কঠিন। প্রবন্ধটি সংক্ষিপ্ত করা এবং সাধু ভাষায় লিখিত। সংক্ষিপ্ত করার কারণে এই হাল হয়েছে কিনা জানি না, আমার বিশ্বাস এর ভাবার্থ শিক্ষার্থীকে বুঝানো অনেক শিক্ষকের পক্ষেও কঠিন হবে। এটি এমন কোনও উন্নতমানের রচনাও নয় যে পাঠ্যবইতে স্থান দিতে হবে। কিন্তু স্থান পেয়েছে। কেন স্থান পেয়েছে, সে প্রশ্নে পরে আসছি। আমার মতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে অবহেলিত যে সাবজেক্টটি আছে সেটি হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

বাংলা পড়ে শিক্ষার্থীরা না শিখতে পারছে বাংলা ভাষা, না পাচ্ছে বাংলা সাহিত্য সম্ভারের স্বাদ। কাজী নজরুলের এই প্রবন্ধের কথাই বলি, বইটির প্রণয়নকারীরা যদি অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি জরুরি মনে করে থাকেন তাহলে এটি চলিত ভাষায় নয় কেন, সাধু ভাষায় কেন? শুধু এটি নয়, বাংলা বইয়ের অধিকাংশ গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ সাধু ভাষায় এবং অপ্রচলিত শব্দে ভরা। সাধু ভাষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করানোর অর্থ তো এই নয় যে অপ্রচলিত একটি ভাষাকে শিক্ষায় প্রাধান্য দিতে হবে। সাধু ভাষাকে তো জাদুঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে দৈনিক ইত্তেফাকের ভাষা পরিবর্তনেরও কয়েক যুগ আগে।

আর এটাকে যদি সংক্ষিপ্তই করা হবে তাহলে সহজ করে চলিত ভাষায় করতে দোষ কোথায়? পাঠের উদ্দেশ্য কি শুধু আমাদের জাতীয় কবির রচনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া নাকি তার লেখার বিষয়কেও হৃদয়ঙ্গম করা? বাংলা পাঠ্যবইয়ের রচনাকারীদের উদ্দেশ্য মনে হয় একটাই বাংলা ভাষার নতুন, পুরাতন, আদিকালের লেখকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করানো, তাদের লেখার বিষয়বস্তুর সঙ্গে না। সে কারণে তারা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন, লালনশাহ, কামিনী রায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, জসীমউদ্দীন, কায়কোবাদ, কালিদাস রায়, বুদ্ধদেব বসু, সুফিয়া কামাল, হুমায়ূন আজাদ, শামসুজ্জামান খান, কামরুল হাসান, মমতাজউদ্দীন আহমদ বা বিএনপি আমলে বিএনপি ঘরানার কিছু লেখক আর আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী ঘরানার কিছু লেখকের রচনা নিয়ে বাংলা পাঠ্যপুস্তক সাজান। লেখাটি শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী পাঠ উপযোগী কিনা সেটাও দেখার দরকার নেই। বিখ্যাত একগুচ্ছ লেখকের লেখা এক চিমটি করে করে নিয়ে খিচুড়ি পাকালেই পাঠ্য বই হয়ে গেলো! এটি শুধু অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে নয়, সব ক্লাসের বাংলা বইয়ের একই চিত্র। সেইসঙ্গে তারা এটাও হিসেব করেন যে ক’জন মুসলিম লেখক আর ক’জন ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী লেখক তালিকায় আছেন।

অথচ আপনি যদি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে রচিত ব্রিটিশ কারিকুলামের বইগুলো খুলে দেখেন তাহলে বুঝবেন কতোটা গবেষণা করে, শিক্ষার্থীর বয়স বিবেচনায় নিয়ে তারা পাঠ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে। তারা একজন শিক্ষার্থীকে তার বয়স অনুযায়ী সব যুগের লেখকের লেখার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। শেকসপিয়র, জেন অস্টেন, জর্জ অরওয়েল, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, জন ডান, সমারসেট মম, শেলি, বায়রন, এলিয়ট, কিটসসবাই প্রয়োজন হলেই আছে শুধু। মূল লেখার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে রচনার মূলভাব বজায় রেখে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি অনুযায়ী সহজ এবং সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে বইগুলো। উদ্দেশ্য হচ্ছে লেখক এবং সাবজেক্ট দুটির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানো। যারা সাহিত্যে উচ্চ শিক্ষা নেবে তাদের জন্য তো মূল সাহিত্য পড়ার সুযোগ রয়ে যাচ্ছে। আমাদের এখানেও সেবা প্রকাশনীসহ কিছু প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ক্লাসিক অনুবাদ করছে সেইভাবে। কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের বইয়ের রচনা, সংকলন ও সম্পাদনা পরিষদের যেসব বিজ্ঞলোককে রাখা হচ্ছে তারা এসব ভাবেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। আগের ক্লাসে কী পড়িয়েছে, বর্তমান ক্লাসে কী পড়াচ্ছে আর পরের ক্লাসে কী পড়বে, তারও কোনও ধারাবাহিকতা নেই। যদি থাকে তাহলে সব ক্লাসে ঘুরেফিরে একই লেখকের লেখা থাকতে হবে কেন?

বাংলা সাহিত্যে এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া হাতেগোনা ক’জন লেখক আছেন যাদের লেখা প্রথম শ্রেণি থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণিতে পাঠ্য হওয়ার উপযোগী? বাংলা দ্বিতীয়পত্র নামে যা আছে সেটি হচ্ছে রীতিমতো অত্যাচার। ভাষা শিক্ষার নামে এরা শিক্ষার্থীকে বাংলা ভাষা বিদ্বেষী করে তুলছে। বিশ্বাস না হলে বাচ্চাদের বই দেখেন। আমার সন্তানের স্কুলে ক্লাস এইটের বাংলা সেকেন্ড পেপারের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ দুটি বই নির্ধারণ করেছে। একটি মাহবুবুল আলম রচিত আইডিয়াল বুকস নামের প্রকাশনার ‘মাধ্যমিক ভাষা সৌরভ-ব্যাকরণ ও রচনা’। পৃষ্ঠা সংখ্যার হিসাব নেই, তবে ১২শ’র কম না। আরেকটি ড. আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ রচিত ‘বিদ্যাকোষ: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’। সাগরিকা পাবলিকেশন্স-এর এই বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৯২। আপনি অনুমান করতে পারবেন না ভাষা শিক্ষার নামে কতোটা নিম্নমানের, অবৈজ্ঞানিক বইপত্র এসব। দামের কথা নাইবা বললাম, কারণ স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এসব বইয়ের লেখক- প্রকাশকরা মিলে সিন্ডিকেট করে বই বাণিজ্য করছে আর অভিভাবকদের বাধ্য করছে এসব ‘আবর্জনা’ কেনার জন্য। এখানে দেখার কেউ নেই, কারণ বইয়ের গায়ে বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত লিখে দিলেই হলো। অথচ ইংরেজি মিডিয়ামে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বইগুলো ধাপে ধাপে একজন শিক্ষার্থীর ভাষা শিক্ষার সহায়ক এবং বইগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা আছে।

শিক্ষা নিয়ে লিখতে বসেছি আজ আমি দুটি কারণে বাংলাসহ শিক্ষা বোর্ডের বেশিরভাগ বই উন্নত মানের না সেটি বলা আর মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার করতে যাচ্ছে বলে গত কদিন ধরে যেসব রিপোর্ট মিডিয়ায় আসছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া। পত্রিকার রিপোর্টে যা এসেছে তা সংক্ষেপে এখানে একুট উল্লেখ করতে চাই। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম অনুসারে, দশম শ্রেণির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, মানবিক নাকি ব্যবসায় শিক্ষায় পড়বে, সেটি ঠিক হবে উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে, যা এখন নবম শ্রেণিতে হয়। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা হবে দুই বছরের, যা চার বছর বয়সী শিশুদের দিয়ে শুরু হবে। প্রাক-প্রাথমিকে দুটি শ্রেণি থাকবে। একটি হবে প্রাক-প্রাথমিক প্রথম শ্রেণি এবং প্রাক-প্রাথমিক দ্বিতীয় শ্রেণি। বর্তমানে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। আর ছয় বছরের বেশি বয়সী শিশুদের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের জন্য আলাদা বই থাকবে না, শিক্ষকেরা শেখাবেন। প্রাথমিকের জন্য আটটি বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে।

এগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্মশিক্ষা, ভালো থাকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। এর মধ্যে ‘ভালো থাকা’ এবং ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ বিষয়ে আলাদা বই থাকবে না। এগুলো শিক্ষকেরা শেখাবেন, যার জন্য নির্দেশনামূলক বই দেওয়া হবে। আর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে ১০টি অভিন্ন বই পড়ানো হবে। এগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, জীবন ও জীবিকা, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ধর্মশিক্ষা, ভালো থাকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। বর্তমানে মাধ্যমিকে ১২ থেকে ১৪টি বই পড়ানো হয়। এখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কিছু অভিন্ন বই পড়তে হয়। আর নবম শ্রেণিতে শাখা বিভাজন হয়। নতুন শিক্ষাক্রমে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে গ্রুপ পরিবর্তন হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। আগামী জুনের মধ্যে নতুন বই প্রণয়নের কাজ শেষ করা হবে। এরপর ২০২২ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নতুন বই দেওয়া শুরু হবে। সংক্ষেপে এই হচ্ছে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সরকারের ইচ্ছা। একটি কথা না বললেই নয়, নতুন শিক্ষাক্রমের প্রায় পুরোটাই ইংরেজি মিডিয়াম বা ব্রিটিশ কারিকুলামের অনুকরণ। পুরো লেখাটি পড়ুন বাংলাট্রিউনে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত