প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কিযী তাহ্নিন: সই প্রাক-করোনা সময়ের কথা

কিযী তাহ্নিন: সেই প্রাক-করোনা সময়ের কথা। সাল ২০১৫। আমার বাবার সারাদিনের একটা বড় অংশ ‘টেলিভিশন’ নামক বস্তু এবং বিষয় নিয়ে কাটে। সেটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে, আমার টেলিভিশন দেখবার আগ্রহ খুব একটা নেই আজকাল। তবে বছরের যে সময়ে ‘জি সারেগামাপা’ প্রচার হয়, আমি নিয়ম করে সপ্তাহে নির্ধারিত রাতে টিভির সামনে বসি এবং যথেষ্ট আয়োজন করে বসি গুছিয়ে, সব কাজ শেষ করে, এমন নিশ্চিন্ত মনে অনুষ্ঠানটি দেখি, যাতে অনুষ্ঠানটি শেষ হবার সাথে সাথে, গানের রেশ নিয়েই আমি ঘুমোতে যেতে পারি এবং এই একটি শো চলাকালীন টিভির রিমোর্ট বাবার কাছে থাকে না, থাকে আমার কাছে। ঘটনা হলো, আমি টেলিভিশনের সামনে বসি। আমি বসবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাবা এসে আমার পাশে সোফাটিতে বসে। পা মেলে দেয় সামনে রাখা কাঠের চেয়ারে। আমরা খুব মন দিয়ে গান শুনতে থাকি। মিনিট দশেকের মধ্যেই ঠিক যা হবার তাই হয়, প্রতিবারই হয়। বাবা ঘুমিয়ে পড়ে। আমি গান শুনি, আর মাঝে মাঝে তেছড়া চোখে বাবা কি করে দেখি।

মা মাঝে মাঝে পাশের ঘর থেকে এসে অবাক হয়ে যায়, ‘একি তোমার বাবা তো ঘুমাচ্ছে’, হুম আমিও তো তাই দেখছি বাবা নিশ্চিন্তে আরাম করে আমার পাশের সোফায় ঘুমাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাবা আধা চোখ মেলে স্ক্রিনে তাকায় ‘এই ছেলেটা না গত সপ্তাহে আউট হয়ে গেলো, আজকে গান গাচ্ছে কেন? আমি বিস্মিত কণ্ঠে বলি, ‘এই ছেলে এই শো’তে সবচেয়ে ভালো গায়, ও জীবনেও আউট হয়নি। আমি আবার বলি, ‘দেখি তুমি কন্টেস্টেন্টদের নাম বলো তো’? আমাকে অবাক করে দিয়ে সে নির্ভুলভাবে ৪-৫ জন কন্টেস্টেন্টদের নাম বলে গেল এবং পাশের সোফায় আরামে ঘুমিয়ে পড়লো। পুরো শো চলাকালীন দু-একবার আধা চোখে তাকালো, একবার আধচোখে তাকিয়ে, বললো ‘বাহ্’ এবং বাকি সময় ঘুমোতে থাকলো, ঘুম ভাঙলো শোর শেষের দিকে। এই করোনা-কালের কথা, সাল ২০২০। ঘটনা হলো ‘ওই’, মানে ফর্মে এক তথ্য একবার দেওয়ার পর নিচের ঘরে লিখি যে ‘ওই’, মানে তথ্য একই।

এখানেও ঘটনা ওই, একই। কতো কিছু বদলালো, করোনা এসে থিতু হলো, ঘটনা ওই থাকলো। বাবা পাশে এসে বসবে, ঠিক একই সোফায়। শো শুরু হবার পর ঘুমিয়ে যাবে। মাঝে মাঝে জেগে উঠে প্রশ্ন করবে, আবার ঠিকঠাক সবার নাম বলবে। আবার ঘুমিয়ে যাবে। শো শেষ হলে জেগে যাবে। আমি ভাবি, বাবা কী রিমোর্ট কন্ট্রোল করতে না পারার দুঃখে এই সময়টা ঘুমিয়ে পড়ে? নাকি গানের ছন্দে তালে একটা আরাম ঘুম দেয়। সে যদি ঘুমিয়েই যায়। তাহলে কন্টেস্টেন্টদের চেনে কেমন করে। উত্তরে যা মেলে তা হলো, একটি মুচকি হাসি। শো শেষ, সে এখন হাতে রিমোর্ট নিয়ে এ চ্যানেল সে চ্যানেল ঘুরছে। চোখে ঘুমের কোনো লেশমাত্র নেই। পাঁচ বছরে কতো মানুষ কতো জীবনমুখী গবেষণা করলো, আর আমি এই এক প্রশ্নের উত্তরে খুঁজে পাচ্ছি না। এক গভীর বিস্ময় আমার কাছে। ছোটবেলায় যেমন বিস্ময় ভরা প্রশ্ন ছিলো, চাঁদ এতো কাছে, তবু ছুঁতে পারি না কেন? তেমন নিখাদ নির্ভেজাল এক বিস্ময়।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত