প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ব্যবসা চাকরি সব কিছুতেই দিতে হয় ‘চাঁদা’, কলার কাঁদিও বাদ পড়ে না

ডেস্ক রিপোর্ট : বাইরে থেকে বোঝার তেমন উপায় নেই। তবে অভিযোগ এখন তীব্র যে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম জেলা খাগড়াছড়িতে এখন পদে পদে চাঁদাবাজদের থাবা। ব্যবসায়ীদের চাঁদা না দিয়ে ব্যবসা চালানোর কোনও উপায় তো নেই-ই, চাঁদা দিতে হয় চাকরি করলে, গরু-ছাগল পুষলে, ক্ষেতে চাষ করলে। এমনকি কলাচাষিদের চাঁদা দিতে হয় কাঁদি প্রতি। তাও আবার একপক্ষের চাঁদা নয়, চারটি পাহাড়ি সংগঠনই সবার ওপর চাঁদাবাজির চেষ্টা করে। বিশেষ করে পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর নাগরিকদের চাঁদা ছাড়া জীবন পার করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। তাদের দেখাদেখি, বাঙালি কয়েকটি সংগঠনও চাঁদাবাজি শুরু করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন কাজ আর ঠিকাদারিতে চাঁদা বসায় পাহাড়ি সংগঠনগুলো। চাঁদা না দিলে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, মালিক- চালক-হেলপারদের মারধর, ব্যবসায়ীদের অপহরণ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হলেও এই নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারও। অভিযোগ না পেলে প্রশাসনও মাথা ঘামায় না। তবে চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে সবচেয়ে বেশি যাদের বিরুদ্ধে সেই আঞ্চলিক সংগঠনগুলো এ ধরনের ঘটনাকে দেখছে তাদের দল চালানোর খরচ হিসেবে, ব্যাপারটাকে ‘চাঁদাবাজি’ মানতে রাজি নয় তারা।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলায় প্রত্যেকটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চাঁদা দিতে হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-সন্তু লারমা), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-মানবেন্দ্র লারমা), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-ডেমোক্রেটিক) নামক পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে। পাহাড়ি এই চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের কাছে জিম্মি পুরো পার্বত্যবাসী। শুধু সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নয়, জনজীবনের প্রত্যেকটি স্তরেই তাদের দিতে হয় চাঁদা।

পাহাড়ি সংগঠনগুলোর দেখাদেখি এখন চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে বাঙালি সংগঠনগুলোর বিরূদ্ধেও। তবে সমতলে সরকারদলীয় সংগঠনগুলোর নামে এমন অভিযোগ খুব তীব্র থাকলেও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর কারণে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলনামূলক কম।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে পাহাড়ি প্রত্যেকটি সংগঠন গড়ে ৫ শতাংশ হারে চাঁদা দাবি করে, তবে যার থেকে যতটুকু পারে আদায় করে নেয়। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ছাড়া সমাজের প্রত্যেকটি স্তরেই চাঁদা দিতে হয়ে পাহাড়ি সংগঠনগুলোকে।

জানা গেছে, পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন পরিবহন সমিতির নেতা বিভিন্ন ভাবে এসব চাঁদা পরিশোধ করে থাকেন। বিষয়টি শহরে বহুল আলোচিত হলেও চাঁদার তথ্য প্রকাশ করলে প্রাণনাশসহ নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। প্রশাসনের কাছ থেকে এসব বিষয়ে খুব একটা সহযোগিতা না পাওয়ায় এবং জানালে বিপদের আশঙ্কা বাড়ার ভয়ে চাঁদাবাজির শিকার হয়েও সহজে মুখ খুলতে চান না অনেকে।

 

একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, খাগড়াছড়ি প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস সমিতিকে এ বছর এখন পর্যন্ত পিসিজেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (প্রসিত) এই দুই সংগঠনকে ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন নেতা বলেন, চলতি বছরে প্রতিটি বড় ট্রাক হতে সংগঠনগুলো ৫ হাজার, পিকআপ হতে ২ হাজার, সিএনজি হতে দেড় হাজার, মাহেন্দ্র অটো হতে এক হাজার, প্রতিটি বাস থেকে ৫ হাজার, বিভিন্ন কোম্পানির বিপণন কাজে নিয়োজিত গাড়ি প্রতি ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেছে, এখনও করছে। বাৎসরিক চাঁদার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানের জন্য এসব সংগঠন নিয়ে থাকে বিশেষ চাঁদা।

সূত্রগুলো জানায়, শুধু সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নয়, জনজীবনের প্রত্যেকটি স্তরেই তাদের দিতে হয় চাঁদা। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে পাহাড়ি প্রত্যেকটি সংগঠন গড়ে ৫ শতাংশ হারে চাঁদা দাবি করে, তবে যার কাছ থেকে যতটুকু পারে আদায় করে নেয়। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ছাড়া সমাজের প্রত্যেকটি স্তরেই চাঁদা দিতে হয়ে পাহাড়ি সংগঠনগুলোকে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি সবচেয়ে বেশি। খাগড়াছড়ি প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস সমিতির একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বছর এখন পর্যন্ত পিসিজেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (প্রসিত) এই দুই সংগঠনকে ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে প্রতিটি বড় ট্রাক হতে সংগঠনগুলো ৫ হাজার, পিকআপ হতে ২ হাজার, সিএনজি হতে দেড় হাজার, মাহেন্দ্র অটো হতে এক হাজার, প্রতিটি বাস থেকে ৫ হাজার, বিভিন্ন কোম্পানির বিপণন কাজে নিয়োজিত গাড়ি প্রতি ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেছে ও এখনও করছে। বাৎসরিক চাঁদার পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানের জন্য এসব সংগঠন নিয়ে থাকে বিশেষ চাঁদা।

চাঁদা যে শুধু নির্মাণকাজ ও পরিবহন খাত থেকেও নেওয়া হচ্ছে তা নয়। এর আওতা বেড়ে ফল, ফসল, শিক্ষা, চিকিৎসা, এমনকি বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার শর্তেও দিতে হচ্ছে। যেমন প্রতি কাঁদি কলাতে প্রত্যেক সংগঠনের বখরা থাকে গড়ে ১০ থেকে ২০ টাকা, গরু-ছাগল প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, আনারস বা ফলবাহী ট্রাকে প্রতি গাড়িতে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এছাড়াও চাকরীজীবীদের জনপ্রতি চাঁদা দিতে হয়ে প্রত্যেক সংগঠনকে বছরে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, শিক্ষকদের দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা, বিএসসি শিক্ষকদের তিন হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা, ধানক্ষেত প্রতি ৪০ শতকের জন্য ২০০ থেকে ৫০০ টাকা করে দিতে হয় বলে জানিয়েছে ওই সূত্রগুলো। তবে অনেক সময় এলাকাভিত্তিক বিবেচনায়, আধিপত্য বিস্তারকারী দলকে চাঁদা নিলে অন্য পক্ষ সেখানে চাঁদাবাজি করতে আসে না।

এছাড়া বিভিন্ন দিবস ও কর্মসূচি পালন করতে শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের ৫ হাজার টাকা হতে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলা, ব্যবসায়িক পণ্য সামগ্রী লুট করে নেওয়া, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অপহরণের মতো ঘটনা ঘটে। হুমকি-ধমকি তো নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়।

পাহাড়ি একটি সংগঠনের চাঁদা নির্ধারণ করা রশিদ

কৃষক রত্নমোহন চাকমা, সুমন চাকমা, মাগ্য মারমা, প্রদিপ ত্রিপুরা, আবদুল মজিদ, হারুন (ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, ধানক্ষেতসহ সবধরনের শষ্য ও ফসল চাষে প্রতি ৪০ শতক জমিরে ওপরে চাঁদা বসায় পাহাড়ি সংগঠনগুলো। এজন্য তাদের দিতে হয় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা করে। দিতে না চাইলে ক্ষেত পুড়িয়ে দেওয়া, মারধর, অপহরণ সব ধরনের অত্যাচার চালায় তারা।

আর কৃষকদেরকে প্রতি কাঁদি কলার জন্য প্রত্যেক গ্রুপকে গড়ে ১০/২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়, ফলে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য অল্প দামে বিক্রয় করতে পারেন না। এ কারণে ক্রেতাদেরকে সব কৃষি পণ্য বেশি দামেই কিনতে হয়।

শহরের গঞ্জপাড়ার গরুছাগল ব্যবসায়ী নুরু মিয়া জানান, গরু-ছাগল বিনা বাধায় হাটে তুলবেন তার কোনও উপায় নাই। পাহাড়ি বা বাঙালি যে কৃষেই হোক, গরু-ছাগল বাজার-হাটে আনার সময়েই তাদের প্রতিটি পশুর জন্য ১০০ থেকে দেড়শ’টাকা চাঁদা দিতে হয়। পরে দেবো এ কথা বলেও বাজারে তোলার উপায় নাই।

কুমিল্লা থেকে আসা মৌসুমী ফল ব্যবসায়ী রহমত আলী ও চালক মোবারক হোসেন জানান, যদি ট্রাকের পারমিট না থাকে, তাহলে ফলবাহী প্রতি ট্রাকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা প্রত্যেক সংগঠনকে দিতে হয়, পাশাপাশি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলোকেও ট্যাক্স দিতে হয়। এজন্য পরিবহন খরচ বেশি পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চাকমা চাকরিজীবী বলেন, পাহাড়ি সংগঠনগুলোর কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছে পাহাড়ি চাকরিজীবীরা। একই নৃগোষ্ঠীর হওয়ায় প্রত্যেকের কাছেই চাঁদা চাইতে আসে পাহাড়ি সংগঠনের চাঁদাবাজরা। এর ফলে একজন চাকরিজীবীকে প্রত্যেক সংগঠনকে বছরে ২/৩ হাজার টাকা করে দিতে হয়। চার সংগঠনের পেছনে তাদের অনিচ্ছাকৃত খরচ দাঁড়ায় ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা। একইভাবে একজন প্রাথমিক শিক্ষকের জন্য ওরা চাঁদা নির্ধারণ করে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। ফলে ওই শিক্ষককেও বছরে ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আবার যদি হন বিএসসি শিক্ষক, তাহলে তার চাঁদা হবে বছরে তিন থেকে চার হাজার টাকা। অর্থাৎ চার সংগঠন মিলে বছরে ১২ থেকে ১৬ হাজার টাকা। তবে সবার ক্ষেত্রে অবশ্য এক রকম হয় না। যদি কোনও এলাকায় কোনও পাড়াড়ি সংগঠনের আধিপত্য বেশি থাকে তাহলে তারাই চাঁদা নিয়ে যায়। অন্যরা সেখানে প্রবেশে সাহস করে না। তবে কেউ সাহস করে চাঁদা দেবো না বললেই নানাভাবে হয়রানি করে সংগঠনগুলো।

তিনি আরও জানান, চাঁদা আদায়ের জন্য প্রত্যেকটা পাহাড়ি দলে গ্রুপ ঠিক করে এলাকা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। থাকে চাঁদা আদায়ের টার্গেট। আবার দলের গ্রুপগুলোর মধ্যেও থাকে বিভিন্ন পদ। যেমন কালেক্টর, চিফ কালেক্টর, গ্রুপ লিডার ইত্যাদি। আবার, যে এলাকায় যে দল শক্তিশালী তারা ওই এলাকায় অন্য গ্রুপকে সহজে ঢুকতে দেয় না। এই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও তাদের মধ্যে মাঝে-মধ্যেই সংঘর্ষ ঘটে।

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জন সংহতি সমিতিতে আছে কালেক্টর ও চিফ কালেক্টর। এমন চিফ কালেক্টরের উদ্দেশে লেখা একটি চিঠি যাতে চাঁদা না দিলে শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, হিসাব না পাওয়া গেলেও রাঙামাটিতে বসবাসকারী বাঙালি রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনগুলোও চালিয়ে আসছে দেদারসে চাঁদাবাজি। তবে তাদের চাঁদাবাজি সাধারণত হয়ে থাকে ইস্যুভিত্তিক। কোনও অনুষ্ঠান করার উছিলায়।

খাগড়াছড়ি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি সুদর্শন দত্ত বলেন, পাহাড়ের পাহাড়ি বা বাঙালি দলগুলো বিভিন্ন দিবস ও কর্মসূচি পালন করতে শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা হতে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নিয়ে থাকে। চাঁদা না দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হামলা, ব্যবসায়িক পণ্য সামগ্রী লুট করে নেওয়া, গাড়িতে অগ্নি সংযোগ, ভাঙচুর, অপহরণের মতো ঘটনা ঘটে। হুমকি-ধমকিতো নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়। এসব বিষয়ে প্রশাসনকে আরও শক্ত হওয়ার দাবি জানান তিনি।

পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট বিধান কানুনগো জানান, তার জানা মতে, জেলার ৯ থানায় গত একবছরে ৩০টি মতো চাঁদাবাজির মামলা রেকর্ড হয়েছে এবং এসব মামলায় বিভিন্ন সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মীসহ আসামি রয়েছে। এসব আসামি বেশিরভাগ জামিনে মুক্ত আছেন। অনেকেই আবার বাদীদের বাধ্য করছেন মামলা আপস করতে এমন অভিযোগও শুনতে পাই।

খাগড়াছড়ি সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পৌরসভা মেয়র মো. রফিকুল আলম বলেন, পাহাড়ি সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজির জ্বালায় অস্থির পাহাড়ি-বাঙালি সকলে। পাহাড়ি সংগঠনের মতো অব্যাহতভাবে চাঁদাবাজি না করলেও বাঙালি কয়েকটি সংগঠনও চাঁদাবাজি করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সংগঠনগুলোর অব্যাহত চাঁদাবাজির ফলে পাহাড়ে উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ কৃষক হতে শুরু করে ব্যবসায়ী পর্যন্ত সকলে অতিষ্ঠ চাঁদাবাজদের কারণে। জনগণ ও প্রশাসন মিলে প্রচলিত আইনেই চাঁদাবাজদের প্রতিহত ও প্রতিরোধ করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ, খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মজিদ জানান, তার সংগঠন কখনও চাঁদাবাজি করে না। তারা নিজেদের টাকায় জনগণের জন্য, জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছেন।

তাদের এক নেতার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ-আমেরিকান টোবাকো, বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠান একটি চাঁদাবাজির মামলা করেছে সে কথা বলা হলে তিনি জানান, কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনও অপরাধ করলে দেশে প্রচলিত আইনেই তার ব্যবস্থা আছে।

চাঁদাবাজ আটকের এমন ঘটনা ঘটে মাঝে-মধ্যে। তবে তাদের বেশিরভাগকে আটকে রাখা সম্ভব হয় না। আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় সবাই।।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সভাপতি শ্যামল চাকমা ওরফে জলাইয়া বলেন, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) কোনও চাঁদাবাজির সংগঠন নয়। চাঁদাবাজির জন্য তিনি ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপকে দায়ী করে বলেন তারা এখন জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম হতে দূরে সরে গিয়ে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে টাকা আদায় এবং নিজের পকেট ভারীকরণে ব্যস্ত। তারা লোভী উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, জুম্ম জাতির অধিকার আদায়ের জন্য তারা ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আত্মপ্রকাশ করেছে । তার দল সঠিক ও আইনানুগ পথে থেকে আন্দোলন করছে এবং করবে উল্লেখ করে তার সংগঠনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

ইউপিডিএফ (প্রসিত) এর খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা জলাইয়া চাকমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলেন ‘ঠাকুর ঘরে কেরে, আমি কলা খাইনা’। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নিজেরাই চাঁদাবাজি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওরা সেদিন আত্মপ্রকাশ করেছে কিন্তু, আমাদের দল ১৯৯৭ সাল হতে জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করছে।

তাদের দল চাঁদাবাজি করে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবেঅংগ্য মারমা বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন লোক হতে নেওয়া আর্থিক সহযোগিতা বা অনুদানকে চাঁদা বলা যাবে না। যদি তাই হয় তবে বর্তমান সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট হতে যে চাঁদা নেয় –তাকে আপনারা কি বলবেন?’

আরেক প্রশ্নের জবাবে অংগ্য মারমা বলেন ইউপিডিএফ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে-তার সবগুলোই শাসকগোষ্ঠী করেছে এবং জুম্ম জনগণের স্বাধিকার আন্দোলন হতে তাদের সরাতে, দমন পীড়নের অংশ হিসেবেই এই সব মামলা করা হয়েছে। সকল মামলা-হামলার জবাব জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেবেন মর্মেও জানান তিনি।

পিসিজেএসএস (এমএন লারমা) অংশের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকা সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পিসিজেএসএস মূল দলসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে নানা মতপার্থক্য থাকায় এবং প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা পিসিজেএসএস (এমএন লারমা) নামে আত্মপ্রকাশ করেন।’ তার সংগঠন চাঁদাবাজি করছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংগঠন চালানোর জন্য আর্থিক সহযোগিতা বা অনুদান চাঁদা হতে পারে না।’ তারা চাঁদার জন্য কখনও কাউকে জিম্মি করেছেন মর্মেও রেকর্ড নেই। এসময় তিনিও চাঁদাবাজদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গ সংগঠনের কোনও নেতা-কর্মীর চাঁদাবাজি করার কোনও সুযোগ নেই। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে চাঁদাবাজি করে-তার দায়ভার দল নেবে না। ’ আর কারও কাছে আওয়ামী লীগের কোনও নেতা-কর্মী চাঁদা দাবি করলে তা সুনির্দিষ্টভাবে দলকে জানানোর অনুরোধ করার পাশাপাশি প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।

প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে চাঁদা আদায়

এ বিষয়ে জানতে পিসিজেএসএস (সন্তু লারমা) এর একাধিক নেতার সাথে যোগাযোগ করলেও তাদের কেউ কথা বলতে চাননি। এমনকি পিসিজেএসএস সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার একান্ত সচিবের মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও তার বা তার দলেও কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, মাঝে মাঝে অভিযোগের কারণ কিছু চাঁদাবাজ ধরাও পড়ে। তবে তাদের বেশিদিন আটকে রাখা সম্ভব হয় না। দলগুলোর পক্ষে বিভিন্ন আইনজীবী তাদের মুক্ত করার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। এর নেপথ্যে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর প্রতি আনুগত্যের চেয়েও প্রাণভয় বেশি কাজ করে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইনজীবী জানান।

খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল আজিজ জানান, মানুষকে জিম্মি করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখার সুযোগ কোনও সংগঠনের নেই। পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, অপহরণ-খুন-গুমসহ আইনবিরোধী কার্যক্রম যারাই পরিচালনা করবে-তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, যেখানে চাঁদাবাজির নামে ভয়ভীতি, আতঙ্ক থাকবে সেখানে সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। পাহাড়ে যারাই চাঁদাবাজির চেষ্টা করবে তাদেরকে সকল প্রশাসন মিলে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করা হবে, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উৎসঃ banglanews24

সর্বাধিক পঠিত