প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাজারে ৭শ’ই অবৈধ, চিকিৎসার আড়ালে চলছে অন্য বাণিজ্য

অনলাইন ডেস্ক : চিকিৎসক নেই, ওষুধ নেই। পরিদর্শন নেই, তদারকি নেই। তারপরও চলছে মাদকের চিকিৎসা। ধরা পড়লেও পার পেয়ে যায়। আবার নতুন উদ্যমে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় দিব্যি চলে রমরমা বাণিজ্য। চিকিৎসা নিতে গিয়েও মাদক সেবনের সুযোগ পাচ্ছে মাদকাসক্তরা। দাগী অপরাধীরা সেখানে আশ্রয় নিয়ে নিরাপদে আত্মগোপনের সুযোগ নেয়। বিল নিয়ে দেখা দেয় প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনা। হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়। গত তিন বছরে ১৩টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ১৫ ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মাদকাসক্তের নিরাময় ও পুনর্বাসনের নামে এসব অরাজকতার বিপরীতে উল্টো যুক্তি দেখানো হয়- ‘জনবলের অভাব ও যানবাহনের ঘাটতি’। প্রভাবশালীদের তদ্বিরের কথাও বলা হয় কোন কোন ক্ষেত্রে। এসব কারণেই রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে শত শত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র। যার অধিকাংশেরই অনুমোদন নেই। বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারী-বেসরকারী সহস্রাধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সরকারী কেন্দ্রগুলোর বৈধতা থাকলেও অনিয়ম দুর্নীতি আর অরাজকতায় ব্যাহত হয় রোগীদের চিকিৎসা। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেয়া হয় গলাকাটা দাম। কখনও কখনও চিকিৎসার নামে চলে অপচিকিৎসা।

রাজধানীর আদাবরে একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনারকে চিকিৎসার নামে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা তদন্তে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম শিপন গত ৯ নবেম্বর সকালে এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কর্মচারীদের মারধরে নিহত হন। এ ঘটনায় আদাবর থানায় একটি মামলা হয়েছে। হাসপাতালের মালিকসহ ১১ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এতে নড়েচড়ে বসেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও পুলিশ। তারাই এখন স্বীকার করছে- এ অবস্থা একদিনে গড়ে ওঠেনি। তাদের কেউ কেউ বলছেন, এদের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান চালানো উচিত। শুধু অভিযান চালালেই চলবে না, সার্বিকভাবে যৌথ অভিযান চালানো উচিত বলে তারা মনে করছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অবৈধ বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাব মতে, রাজধানীসহ সারাদেশে ৩৫১ বৈধ মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সরকারী চারটি। এর বাইরে অবৈধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে আরও প্রায় ৭শ’। আবার অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে রোগীর ওপর শারীরিক নির্যাতন এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসানুল জাবের বলেন, ‘এতদিন তো এ নিয়ে সবাই নীরব ছিল। পুলিশ কর্মকর্তার অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবার টনক নড়েছে। আমরা এ ধরনের মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। অধিদফতরের পক্ষ থেকে আমরা তাৎক্ষণিক ওই কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়েছি। খোঁজ নেয়া হচ্ছে, এ ধরনের অবৈধ প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেলে বন্ধ করে দেয়া হবে। এরই মধ্যে মিরপুরে হলি মাইন্ড, মোহাম্মদপুরে দ্বীনের আলো, যাত্রাবাড়ীতে আনন্দ ও মাতুয়াইলে পরিবর্তন নামের চারটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এভাবে চলবে অভিযান’।

রাজধানীতে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কিছু কিছু কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে দেহ ব্যবসা ও মাদক ব্যবসা প্রকাশ্যেই চলছে। শুধু তাই নয়- রাজধানীর দাগী অপরাধীরা মাদকাসক্ত পরিচয়ে নিরাময় কেন্দ্রের রুম ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছেন। আর সেখান থেকেই ইয়াবা, হেরোইন ও অস্ত্রের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। এভাবেই অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে এসব কেন্দ্র। অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেই, কর্মী ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণও নেই। অনুমোদনহীন এসব কেন্দ্রে মাদকাসক্তের চিকিৎসার নামে চলছে মাদক ব্যবসা। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে যথাযথ মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও নেই। এতে প্রতারিত হচ্ছে হাজার হাজার মাদকাসক্ত রোগী ও তাদের পরিবার। রাজধানীর প্রতি থানা এলাকায় গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানে কোন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন সে নজির খুব কম। তারপরেও এগুলো চলছে। মাদকাসক্ত ও মাদকবিরোধী জনসচেতনতা গড়ার নামে সারাদেশে প্রায় আড়াই শ’ এনজিও কাজ করছে। তারা বার্ষিক মাদক দিবস পালনের মিছিল, মিটিং, সেমিনার আর র‌্যালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর এনজিওগুলো দাতা সংস্থার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা গ্রহণ করছে।

জানা গেছে, বেসরকারী পর্যায়ে মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বা সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ২০০৫ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি বিধিমালা প্রণীত হয়। এর ৪(খ) বিধিমালায় বলা হয়েছে- কেন্দ্রগুলো সুরক্ষিত পাকা বাড়িসহ আবাসিক এলাকায় করতে হবে। কেন্দ্রে একজন মাদকাসক্ত রোগীর জন্য গড়ে কমপক্ষে ৮০ বর্গফুট জায়গা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বহুতল ভবনের তৃতীয় তলা বা তার চেয়ে ওপরের তলায় অবস্থিত হলে লিফট থাকতে হবে। বিধিমালার গ. ধারায় বলা আছে, প্রতি ১০ বিছানার জন্য আলাদা একটি টয়লেট ও পানির সুব্যবস্থাসহ কমপক্ষে একজন মনোরোগ চিকিৎসক (খণ্ডকালীন বা সার্বক্ষণিক), একজন চিকিৎসক, দু’জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয়, একজন সুইপার বা আয়া এবং জীবনরক্ষাকারী উপকরণ ও অত্যাবশ্যক ওষুধপত্র থাকতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০১৮ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় ৩৬ লাখের মতো মাদকাসক্ত ব্যক্তি রয়েছে। আর লাইসেন্স প্রাপ্ত ৩২২ বেসরকারী মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে সারাদেশে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামে রয়েছে চারটি সরকারী নিরাময় কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক হিসেবে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মাদকাসক্তি নিরাময় দুটি ভিন্ন বিষয়। এটা স্বাস্থ্যগত ব্যাপার। এটাকে ব্রেন ডিজঅর্ডার বলা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসক উপস্থিতি থাকতে হবে। নিরাময় কেন্দ্রে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে মোটামুটি একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে। সব কিছুর ঘাটতি থাকলেও এসবের দেখভাল করার যেন কেউ নেই।

মাদক বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বৈধ-অবৈধ দুই প্রকার প্রতিষ্ঠানেই চলছে চিকিৎসার নামে নানা অনিয়ম অরাজকতা। এমনকি রাজধানীর বেশিরভাগ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রেও নিয়ম মানা হয় না। বেশিরভাগ কেন্দ্রই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে গড়ে উঠেছে। উদাহরণ হতে পারে- যাত্রাবাড়ীর দিশারী কেন্দ্রটি তার মধ্যে অন্যতম। এই কেন্দ্রে রোগী থাকে না বললেই চলে। তারপরও বছরের পর বছর ধরে চলছে। কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসার নামে মাদকাসক্ত রোগীদের নির্যাতন করা হয়। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে। আবার নির্যাতন করে মাদকাসক্তের হাতে জীবন দেয়ার ঘটনাও আছে। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর খিলগাঁও মেরাদিয়া ভূঁইয়াপাড়ার ২৪০/৩ নম্বর ভবনের লাইফ লাইন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক বশির উদ্দিনের (৪০) হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জিমি, জসিম ও কাজী আনোয়ার পারভেজ অনি নামে তিন মাদকাসক্ত রোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সর্বশেষ আদাবরের যেই প্রতিষ্ঠানটিতে পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়Ñ সেটাও গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ও জালিয়াতি করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে অনুমতি নেয়। পরে সেটির নাম পরিবর্তন করে বেআইনীভাবে মাইন্ড এইড ও মাইন্ড কেয়ার ইনস্টিটিউট নাম দেয়া হয়। সেখানে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করা হয় বলে প্রচার চালিয়ে রোগীদের ভর্তি করা হতো। এমনকি সাইনবোর্ডেও তারা বেআইনীভাবে লাইসেন্সের নাম পরিবর্তন করে অন্য নাম ব্যবহার করেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের চোখের সামনেই এসব অনিয়ম করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। জানা গেছে, ২০১৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে মাইন্ড এইড মানসিক ও মাদকাসক্তি নিরাময় হাসপাতাল নামে লাইসেন্স প্রদান করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। যার লাইসেন্স নম্বর ০৩/২০১৯-২০২০। এই নামে লাইসেন্স নিলেও প্রতিষ্ঠানটি তাদের সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, প্রচারে কোথাও এই নাম ব্যবহার করেনি। তারা লাইসেন্সের নাম পরিবর্তন করে নাম দিয়েছে মাইন্ড এইড ও মাইন্ড কেয়ার ইনস্টিটিউট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসনের লাইসেন্স দেয়া হয়। তারপর এখানে মাদকাসক্ত ও মানসিক রোগীর চিকিৎসা দেয়ার নামের কি ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি ও অরাজকতা চালানো হতো তার জ্বলন্ত নজির পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা। এই প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে এমন নির্যাতন কক্ষ রয়েছে তাও জানতেন না মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। নারী ও পুরুষকে আটকে রাখার জন্য বিশেষ ধরনের যে কক্ষ বানানো হয়েছে, মাদকসেবীদের এমন কক্ষে রাখার কোন নিয়ম নেই বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। অপকর্মের এখানেই শেষ নয়। জানা গেছে, এখানে বসতেন দেশের শীর্ষ মানসিক বিশেষজ্ঞরাও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একাধিক অভিজ্ঞ চিকিৎসক বসতেন। তাদেরও তালিকা পেয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন সিটে তাদের নাম রয়েছে। পুলিশ সেগুলো যাচাই করছে। এ সম্পর্কে নিহত আনিসুল করিমের ভাই রেজাউল বলেন, আমরা আমার ভাইকে নিয়ে প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে যাই। সেখানের পরিবেশ ও করোনার কথা ভেবে ওই এলাকায় খুঁজতে খুঁজতে মাইন্ড এইড হাসপাতালের ঠিকানা পাই। সেখানে গিয়ে দেখলাম পরিবেশ সুন্দর। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের নামী চিকিৎসকরাও বসেন। তাই সেখানে ভর্তি করাতে আগ্রহী হই ভাই যাতে আরামে থাকে। কিন্তু আমাদের এতবড় সর্বনাশ হবে কখনও ভাবিনি।

এদিকে এ ধরনের নামসর্বস্ব নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে মানুষ শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না- চরম ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন। এমনই এক ভুক্তভোগী উত্তরার হাসান জানান, তার এক ভাই মাদকাসক্ত। তাকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেখেছেন, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই সেবার নামে ব্যবসা করছে। চিকিৎসা সুবিধা বলতে কিছু নেই। বেশিরভাগ কেন্দ্রেই চিকিৎসার নামে রোগীর ওপর শারীরিক নির্যাতন, মাদক থেকে মুক্ত করার পরিবর্তে চিকিৎসা কেন্দ্রের মধ্যে মাদক সেবন করানো, জেলখানার আসামিদের মতো বন্দী করে রেখে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো অর্থ আদায় করা হয় এসব কেন্দ্রে। নাম প্রকাশ না করে একজন জানান, আমার পরিবার আমাকে এক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেন। প্রথমে শরীর খুব খারাপ ছিল। তখন ওরা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল। পরদিন সকালে উঠে যখন আমি আবিষ্কার করলাম যে, এখানে আমি আটকা পড়ে যাচ্ছি, তখন আমি কিছুটা ভায়োলেন্ট হয়ে গিয়েছিলাম। সেই পর্যায়ে গিয়ে আমাকে মারধর করা হয়েছিল। এসব কেন্দ্রে মানসিকভাবে ভেঙ্গে দেয়া হয়। প্রথমে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কাউকে যেতে দেয়া হয় না। বন্দী রাখা হয়, তখন ধীরে ধীরে মানসিকভাবে সে ভেঙ্গে যায়। বিষাদগ্রস্ত অবস্থায় ওষুধ খেতে রাজি না হলে তাকে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল। এরকম অভিজ্ঞতার কথা অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ। অপর দিকে বিষাদগ্রস্ত ১৯ বছর বয়সী ধনাঢ্য পরিবারের এক তরুণীকে রাজধানীর বিলাসবহুল এক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ তারা হোটেলের মতো ছিল। সেখানেই তার নেশা-দ্রব্যের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার কোন শারীরিক এ্যাক্টিভিটিজ ছিল না। তাকে কিছু ওষুধ দিয়ে রাখা হতো। আসক্তি না থাকলেও শুধু ডিপ্রেশন ছিল। সেখানে সোর্স খুঁজে পেয়েছিল কিছু মাদকদ্রব্য।

সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে মাদক বিক্রেতারা গা ঢাকা দিলেও এদের বেশিরভাগই ধরা পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনাও ঘটে। তবে মাঠ পর্যায়ের কিছু মাদক বিক্রেতা গ্রেফতার এড়াতে বিভিন্ন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। রাজধানীর মিরপুর, গুলশান, উত্তরা তেজগাঁও এলাকার কয়েকটি নিরাময় কেন্দ্র ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক মামলার আসামিদের ডাক্তারি সার্টিফিকেট দিয়ে জামিনের জন্য সহযোগিতা করা হয়।

আলোচিত মাইন্ড এইড হাসপাতালের কোন রোগী ঘুমাতে না চাইলে ইনজেকশন দেয়া হতো। হাসপাতালের বাবুর্চি রুমা আক্তার জানিয়েছেন, রাতের বেলায় জেগে থাকা একজন রোগীর জন্য বাকি অন্যদের অসুবিধা হতে পারে বা ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে বলেই জেগে থাকা রোগীকে সুই (ইনজেকশন) দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হতো। রুমা হাসপাতালটিতে দুই মাস ধরে কর্মরত। তিনি জানান, রোগীরা বেশি চেঁচামেচি করলে ওই রুমে (সাউন্ড প্রুফ রুমে) আটকে রাখা হতো। হাসপাতালে নারী-পুরুষ সব রোগী আসত। নিচ তলায় নয়জন মহিলা রোগী থেকে সর্বশেষ চারজন ছিল। পুলিশ স্যারের মৃত্যুর পরে তারাও চলে গেছেন।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসান জাবের বলেন, ইতোমধ্যে আমরা মাইন্ড এইড মানসিক ও মাদকাসক্তি নিরাময় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছি। কর্মকর্তার অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের সবার টনক নড়েছে। এখন অনেক অভিযোগই সামনে আসছে। আমি নিজেও ছদ্মবেশে রোগী সেজে একটি আলোচিত নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সেখানে চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। আমরা নিয়মিত পরিদর্শন আগেও করতাম। এখন জোরদার করেছি। বৈধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবৈধগুলোকেও শনাক্ত করা হচ্ছে। যেগুলোর লাইসেন্স নেই সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। আদাবরের আলোচিত প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে মাদক বিভাগ থেকে অনুমোদন নেয়। পরে তার সঙ্গে মানসিক চিকিৎসালয় হিসেবেও সাইন বোর্ড টানায়। যা দেখার দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। মাদক চিকিৎসার লাইসেন্স দেয় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আর মানসিক চিকিৎসার লাইসেন্স দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। কাজেই আদাবরের দেখভাল করার দায়িত্বটাও স্বাস্থ্যেরই।

অভিযোগ রয়েছে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার পর মাদকাসক্ত রোগীদের নাকি মাদকদ্রব্য সেবন করতে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা ঠিক নয়। আমাদের জানা মতে, এ ধরনের রোগীদের প্রাথমিকভাবে মেথাডল নামের একটা মেডিসিন দেয়া হয়। যাতে ধীরে ধীরে তার মাদকাসক্তি কমে যায়। খুন-খারাবি ও অসামাজিক কার্যকলাপসহ অন্যান্য অভিযোগ উঠলে সেটা দেখার দায়িত্ব পুলিশের। এটা মাদক বিভাগের নয়। আমরা শুধু পরিদর্শন করে রিপোর্ট দিতে পারি। দৈনিক জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত