প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: কালসির কালশিটে দাগ, আগুন যেথায় নিত্য জ্বলে

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: গত দেড় যুগ ধরে এদেশে প্রায় শিল্পের মর্যাদায় বসে গেছে নাশকতার আগুন। এ কথা এখন কেউ আর অবিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। সন্ত্রাসী কান্ডের মাধ্যমে যে আগুনের সুত্রপাত, সে আগুন শিল্পের পর্যায়ে যেতে লেগে এতোগুলো দিন। বিদেশ বিভুইয়ে দেখি আগুন জ্বেলে আকাশে রকেট তোলা হয়। আর আমাদের দেশে ? মানুষের জান মাল পুড়ে দেয়া এখনো দেখি চলমান আছে, পরিবর্তনের কোন চিহ্নও নেই । কেন জানেন ? আগুন সন্ত্রাসের কোনো বিচার এদেশে কখনো-ই হয়নি। আওয়ামীলীগ, বিএনপি কিংবা গত সেনা সরকারের কেউ-ই করেনি। সব তথ্য প্রমান হাতে পেয়েও করেনি। কেন করেনি সে এক অজানা বিষ্ময় !!
জার্মানির বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা ( DW ) ২৭ শে ডিসেম্বর ২০০৮ সালে বাংলাদেশে ইলেকশনের সামান্য আগে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। সাদামাটা নিবন্ধ। ‘ঢাকার দু’টি আসনে বিহারীদের ভোট রাখবে বড় ভুমিকা’ শিরোনামে লেখাটি শুরুর তিন চার লাইন কেবল বোল্ড অক্ষরে ছাপা হয়। বাংলাদেশ থেকে রিপোর্টটি লিখে পাঠান সমীর কুমার দে নামের কোন এক সাংবাদিক। কি ছিল সে-ই রিপোর্টে ? বাংলাদেশে কয়জনই বা বিহারি থাকে ? এক পাড়া বা মহল্লার সমান সর্বোচ্চ !! এ অল্প কিছু মানুষকে নিয়ে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম হঠাৎ কেন ব্যাস্ত হয়ে পড়ল ? খটকা লাগলো। চলুন বোল্ড অক্ষরে কি লেখা ছিল আগে সেদিকে নজর দেই। লেখাটি শুরু হয় এভাবে- ‘বাংলাদেশে তারা বিহারি নামেই বেশি পরিচিত। এবার সেসব আটকে পরা পুর্নবয়স্ক পাকিস্তানীরা প্রথমবারের মত ভোটার হয়েছেন। পেয়েছেন জাতীয় পরিচয়পত্র। ঢাকার নির্বাচনে নতুন এই ভোটারেরা গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখবে’।
একেবারে সাদামাটা এ লাইন তিনটিকে রিপোর্টের শুরুতে-ই কেন ‘বোল্ড’অক্ষরে ছাপানো হলো সেও জাতীয় ইলেকশনের দিনকয় আগে-এ প্রশ্নটি কি আপনার মাথায় এসেছে ? আসেনি। আমারও আসেনি। এখন এসেছে। ১৩ বছর পরে ২০২১ সাল শুরুর আগে হলেও এসেছে। এ ভাবনা আসার প্রয়োজন হয়েছিল বলেই এসেছে। বেটার লেট দ্যান নেভার………। কোন কিছু-ই ইগনোর করা যাবেনা এ বিশ্বাসও আজ পোক্ত হয়েছে, লেখাটির মর্ম উপলব্ধি করে। সাদাসিধে কথা’ টাইপ এ লেখাটি কিন্তু মোটে-ই এত সাদাদিধে নয়। এটা যাস্ট ফ্রেন্ডের মত কোনো যাস্ট নিউজও নয়।পশ্চিমা কিংবা ইউরোপিয়ানরা কিন্তু আমাদের মত বলদ নয়। অকারন নিউজ তারা করবে না। ইউরোপিয়ানরা যতটা না কথা বলে তারচে বেশি ব্যাবহার করে বডি ল্যাংগুয়েজ। এ ছাড়াও হাজার হাজার জনমের ধকল পাড়ি দিয়ে তারা আজ এ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। সিম্বলিজম, গ্রাফিতি, কোডিং, কালারিং, কিউ আর, বাইনারির মত মেসেজিং সিস্টেমের জনক তারা। যে কথা মুখে বললে লোকে মন্দ বলবে সে কথা তারা কি বলে না। এইতো সপ্তাহ কয় আগে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কান্ড দেখলাম। এর আগে বৈরুত বিস্ফোরনেও তাঁর ভুমিকা দেখলাম। যখন-ই তিনি দেখলেন একটা বেফাঁস কথায় জনমত তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেছে তখন তিনি এর তাঁর মাধ্যমে রটিয়ে দিলেন গনমাধ্যমে তাঁর কথা পরিস্কার ভাবে আসেনি। প্যালেস্টাইনে গিয়ে মাহমুদ আব্বাসের ঠোঁটে চুমো খেয়ে বললেম তিনি মুসলিমদের ভালোবাসেন। ব্যাস সব ঠান্ডা হয়ে গেল। কাজের কাজ কি হলো ? তিনি কিন্তু তুরস্কে তাদের রাস্ট্রদুতকে ফেরত পাঠালেন না। গতকাল থেকে বলতে শুরু করলেন ফ্রান্সের মত প্রকাশের স্বাধীনতা স্বাধীন-ই থাকবে। এর মানে হলো তিনি শার্লে এবদো নামের উগ্র সাম্প্রদায়িক পত্রিকাটিকে ইশারায় বলে দিচ্ছেন – চালিয়ে যাও সোনা, চালিয়ে যাও। বাকি কথা তারা তাদের বডি ল্যাঙ্গয়েজে বুঝিয়ে দেন।
চলুন আগের কথায় যাই, এ লেখার উদ্দেশ্য টা তাহলে কি ছিল ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার আগে আমরা আরও কয়েকটা বিষয় উল্লেখ করি। মিরপুর কিংবা মোহাম্মদপুরের আটকে পরা পাকিস্তানিরা বেশ শক্ত ধাঁচের ধার্মিক। তারা প্রথা ও পরম্পরা মেনে চলে। গড় পরতা প্রায় সবাই কম বেশি নামাজি। তারা গত ৪৮ বছরেও এদেশে পুর্ন নাগরিক অধিকার পায়নি অথচ ধর্মীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যে-ই একদা তারা পুর্ব পাকিস্তানে নিজেদের ভিটেমাটি, জমিজায়গা সবকিছু ফেলে চলে এসেছিল। এখানে আসার তেইশ বছরের মধ্যে এমন ফাদে পরে যাবেন সে কল্পনা তারা ভুলেও করেনি। এ নিয়ে তাদের বিস্তর জেদ আছে। ৪৭ সালের সেটেলমেন্ট তারা মেনে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র ধর্ম রক্ষার নিশ্চয়তা হিসেবে। যে হিন্দুদের হাতে বিহারে পঞ্চাশ হাজার মুসলিমের মাথা আলাদা হয়ে গিয়েছিল, মুক্তির জন্যে পুর্ব পাকিস্তানে এসে এরচে বড় বন্দী দশার স্বীকার তারা হয়েছেন মুসলিমদের হাতে । এরচে বড় দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে ? এজন্য এদেশের কোনো সরকারের সময়ে-ই এরা নিরাপদ বোধ করেনি, স্বস্তি বোধ করেনি। অন্যদিকে মাইনরিটিজ বলে পরিচয় দিয়ে বেড়ানো রথি মহারথির দল ধর্ম কর্মের চেয়েও ভোট দেয়াকে গুরুত্বপুর্ন মনে করে। এদেশের চেয়েও প্রিয় দেশ আছে বলে গভীর বিশ্বাস ধারন করে মনে প্রানে। মরনাপন্ন রোগীকেও মাথায় তুলে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে যায়। ভোটের আগে এদেশে লক্ষ লক্ষ লোক ইন্ডিয়া থেকে প্রবেশ করে। অথচ যে আইনের বলে মুসলিমেরা পুর্ব পাকিস্তানে এসেছিল সে আইনের সুফল তারা কখনো-ই পায়নি। এ চিন্তাটা-ই রিপোর্টারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তাঁর মনে এ ভাবনা দৃঢ় হয়েছিল যে, মিরপুরের ভোটারদের কারনে অন্তত দুইটা আসনের হিসেব নিকেষ পালটে যেতে পারে। লেখক মোটেও বিশ্বাস করেননি, বিহারিদের ভোট নৌকায় পরবে।
ফলে যাকে মেসেজ দেয়া দরকার তাঁকে সেই মেসেজ দেয়া হল, যার দৃষ্টি আকর্ষনের দরকার তাঁর দৃষ্টি আকর্ষন করা হলো,যাদের কাজ ব্যাবস্থা নেয়া তাদেরকে ডেকে সজাগ করে দিলেন ভারি কালির তিন লাইন লেখায়। হোটেল শেরাটনের সামনে হরতালের আগের রাতে বি আর টি সি দোতলা বাসটিতে কি হয়েছিল মনে পড়ে ? মনে নেই তাই না? চলুন ভুলে যাই, মনে রেখেই বা কি হবে । ২০১১ সালে মিরপুরের কালসিতে কি হয়েছিল মনে আছে ? ১১ জন মানুষ সে রাতে জীবন্ত দগ্ধ হয়েছিল। আড়াই বছরের একটা শিশুও সেই তালিকায় ছিল। আগুন ধরানোর আগে সেখানে ঘরে ঘরে লুটপাট চালানো হয়েছিল। বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেয়ার কারনেই মূলত এত বিশাল ম্যাসাকার হয়েছিল। এর বিচার হয়নি। D W ছাপা হওয়া সেই প্রেডিকশন খুব সম্ভবত সত্য হয়েছিল। এর ফল ভোগ করতে হল নিরীহ বিহারীদের।
আজ ক’দিন ধরে যেসব বিচ্ছিন্ন ভাবনা একে একে মাথায় আসছিল তা-ই অবিরাম মাথায় ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছিল। হিসেব মিলছিলো না। ঠিক এখন আমি আনন্দিত এজন্যে যে, শ্রদ্ধেয় Maruf Kamal Khanআজ একটি লেখা লিখেছেন। উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাবে ভোগা লোকেরা কি কি করে, আবার নিজেকে কিভাবে অসাম্প্রদায়িক পরিচয় দিয়ে বেড়ায়- সেসবের চমৎকার উপস্থাপনা ছিল সেখানে। এইসব কথাগুলোই আমার মাথায় ঘুরছিল বিচ্ছিন্নভাবে । ভাবনায় কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। তিনি গুছিয়ে সেসব স্পষ্ট করে দিয়েছেন যা আমি কখনোই পারতাম না। তিনি লিখেছেন আর আমি আনন্দ নিয়ে সেসব পড়েছি। এতোই উত্তেজিত ছিলাম যে, ভুল কমেন্ট করে এসেছি। আমি আরও আনন্দিত এজন্য যে, উই আর পজিশনিং ইন দ্যা সেইম লাইন অব ফায়ার। ( আগামী পর্বে সমাপ্য)
পরিচিতি: ডেন্টাল সার্জন, কলাম লেখক

সর্বাধিক পঠিত