প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১]হেফাজতে ইসলাম কার? নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দরকষাকষি

নিউজ ডেস্ক : বিভক্ত হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। সদ্য ঘোষিত হেফাজতের কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন পদবঞ্চিত আল্লামা শফীর অনুসারীরা। তারা নতুন কমিটি গঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। যোগ্য, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়নে সাজানো হয়েছে হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি। তবে শফী আহমেদের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব নিয়ে ফাটা বাঁশে পড়েছে সংগঠনটি।

বৃহৎ এই অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামীর নেতৃত্ব নিয়ে নেপথ্যে টানাটানি করছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোও। হেফাজতের কোন কমিটি কোন রাজনৈতিক দলের জন্য আশীর্বাদ হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-পর্যালোচনার ঝড়ও বইছে। হেফাজতে ইসলাম কার? এ প্রশ্ন এখন সবার। আগামী শনিবার সংগঠনটির প্রয়াত আমির আহমদ শফীর স্মরণসভা হবে। ওই দিন শফী অনুসারী নতুন কমিটি ঘোষণা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এদিকে, গতকাল এক বিবৃতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ওলামা লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব মুফতী মাসুম বিল্লাহ বলেছেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ তাদের ধর্মীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে মওদুদীবাদে বিশ্বাসী জামায়াত ইসলামী সংগঠনের আদর্শে পরিণত হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম এখন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের ওপর ভর করে চলছে। এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সরকার, দেশ, জাতিকে সতর্ক থাকতে হবে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, জামায়াত বহুকাল ধরেই কওমী মাদ্রাসাগুলোকে দখলে নেওয়ার একটি অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার স্বার্থে আঘাত আনতে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে জামায়াত শিবিরের নেতারা অংশ নিচ্ছেন। যা দেশ-জাতি, ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর।

মাসুম বিল্লাহ বলেন, হেফাজতে ইসলাম নামক অরাজনৈতিক সংগঠনটি তার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সংগঠনটিতে এখন পাকিস্তানের প্রেত্মাতা জামায়াত ভর করেছে। খোদ হেফাজতের নেতারাও এসব অভিযোগ করছেন। জামায়াত শুধু দেশের স্বাধীনতাবিরোধীই নয়, তারা পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিরোধীও বটে।

হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটিতে জায়গা হয়নি শাহ আহমদ শফীর অনুসারীদের। হেফাজতের পরিচয় ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হলেও বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং খেলাফত মজলিস বাংলাদেশের অন্তত ২০ জন নেতা এসেছেন কমিটিতে। সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা স্থান পেয়েছেন এতে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও কমিটিতে রয়েছেন। তবে বাদ পড়েছেন সরকারের বিষয়ে অপেক্ষাকৃত নমনীয় নেতা ও আলেমরা।

গত রোববার চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আহমদ শফীর উত্তরসূরি হিসেবে আমির নির্বাচিত হয়েছেন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি কোনো দলের সদস্য নন। মহাসচিব হয়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা নূর হোসেইন কাসেমী। হেফাজতের দায়িত্বে আসার পর জমিয়তের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

কাউন্সিলে ১২ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ এবং ১৫৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ১২২ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস নতুন কমিটি গঠনকে অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিক আখ্যা দিয়েছেন। বিএনপি জোটের সাবেক এই এমপি বলেছেন, নায়েবে আমির হওয়া সত্ত্বেও তাকে কাউন্সিলে ডাকা হয়নি। আহমদ শফীর মৃত্যুতে কেবল শূন্য আমির পদ পূরণ হওয়ার কথা। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিল করতে হলে নির্বাহী কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। তা না করে আগের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি করা হয়েছে, যা অগণতান্ত্রিক।

এদিকে, গত রোববার সোমবার ও গতকাল দফায় দফায় বৈঠক করেন হেফাজতের পদবঞ্চিতরা। গত সন্ধ্যায় ঢাকায় বৈঠকে বিকল্প হেফাজতে ইসলামের একটি রূপরেখাও তৈরি করা হয়। যাতে আমির ও মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় এসেছে একাধিক আলেমের নাম। যার মধ্যে আমির হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বেফাকের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা মাহমুদুল হাসান, মুফতি ওয়াক্কাস, বেফাকের সাবেক মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস। মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন চরমোনাই পীরের ভাই মুফতি ফয়জুল করীম, ইসলামী ঐক্যজোটের বর্তমান মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মিজানুর রহমান সাঈদ প্রমুখ।

এবিষয়ে জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের ঘোষিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, কে কী করল তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। যে কেউ চাইলে কমিটি গঠন করতে পারে। এতে আমাদের বলার কিছু নেই। করারও কিছু নেই।

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত ও সদ্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে হেফাজতে ইসলামের যে কমিটি করা হয়েছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন হেফাজতে ইসলামের সাধারণ নেতাকর্মীরা। তাই নতুন করে হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠন করা হবে। এরই মধ্যে রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের ত্যাগী নেতাদের নিয়ে নতুন হেফাজতে ইসলাম গঠিত হবে। এরই মধ্যে দেশের প্রবীণ আলেমরা একাত্মতা প্রকাশ করেছেন নতুন কমিটির সঙ্গে। সদ্য ঘোষিত কমিটির অনেকেই নতুন কমিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

জমিয়তের একাংশের সভাপতি মুফতি ওয়াক্কাস একাদশ জাতীয় নির্বাচনে যশোর-৫ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। হেফাজতের নতুন কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছেন, আগামী শনিবার আহমদ শফীর স্মরণসভা হবে। ওই দিন তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন।

হেফাজতের আগের কমিটিতে নায়েবে আমির ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের আমির তথা চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম। নতুন কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। বাদ পড়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী ঐক্যজোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত আলেম মাওলানা ফরীদউদ্দীন মাসঊদ, মাওলানা রুহুল আমিন দুটি কওমি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। কিন্তু তাদের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে নেওয়া হয়নি। তবে বাকি চার বোর্ডের প্রতিনিধিরা আছেন কমিটিতে। সরাসরি জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট কাউকে রাখা হয়নি।

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজত নির্ভেজাল অরাজনৈতিক সংগঠন ছিল। চরমোনাই পীর এ কারণে তাতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। পরে অনেক নেতা হেফাজতকে রাজনীতিতে টেনে আনেন। যেসব ইসলামিক রাজনৈতিক দলের গণভিত্তি নেই, জনসমর্থন নেই, তারা টিকে থাকতে হেফাজতকে আঁকড়ে ধরছে। একটি দলেরই কেন্দ্রীয় কমিটির ২০/২৫ জন নেতা হেফাজতের কমিটিতে এসেছেন। এটা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে বহিঃপ্রকাশ।

বাবুনগরীবিরোধী এবং আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীর পক্ষের নেতারা সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এ বলয়ের নেতা ও সদ্য সাবেক দপ্তর সম্পাদক আলতাফ হোসেন বলেন, সারাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সবার মতামতের মাধ্যমে করণীয় ঠিক করা হবে। পাল্টা কাউন্সিল ও কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

আহমদ শফীর পর কে হেফাজতের নেতা হবেন- তা নিয়ে অনেক আগে থেকেই বিরোধ চলছে সংগঠনটিতে। তার জীবদ্দশাতেই গত জুনে আনাস মাদানীর সমর্থকরা হাটহাজারী মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে দেন। আহমদ শফীর মৃত্যুর পর তিনি আবার মাদ্রাসায় ফেরেন। অন্যদিকে আনাস মাদানী ও তার সমর্থকদের মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে সর্বসম্মতিক্রমে আমির পদে তার ভাগ্নে জুনায়েদ বাবুনগরী ও মহাসচিব নূর হোসেইন কাসেমীকে নির্বাচিত করা হয়। মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতে নেই। কাউন্সিল আহ্বান ও এতে সভাপতিত্ব করার এখতিয়ারও তার নেই। কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ২০১৮ সালে আহমদ শফীর নেতৃত্বে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের সমালোচনা করে পদত্যাগ করেছিলেন মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী। জুনায়েদ বাবুনগরীর সমর্থকদের দাবি, আহমদ শফী সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।

কয়েক দিন আগে থেকেই একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী আমির হতে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছেন, তিনি এ দায়িত্ব নিতে চাননি। শীর্ষ আলেমদের অনুরোধে রাজি হয়েছেন।

ইসলামী ঐক্যজোটের এক অংশের নেতা মুফতি মুহম্মদ ইজহারের দুই ছেলে মুসা বিন ইজাহার ও হারুন বিন ইজাহারের নাম রয়েছে কমিটিতে। বিএনপি জোটের মনোনয়নে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মুফতি মুনির হোসাইন অর্থ সম্পাদক হয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীকের সাবেক এমপি জমিয়তের নেতা অ্যাডভোকেট শাহিদুল পাশা চৌধুরী হয়েছেন আইন সম্পাদক।

আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত হওয়ার প্রথম চার বছর হেফাজত চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলাম অবমাননায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকায় সমাবেশ করে সংগঠনটি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। ওই বছরের ৫ মে সংগঠনের নেতাকর্মীরা একই দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন। মধ্যরাতে তাদের উচ্ছেদ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর থেকে হেফাজত অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। জুনায়েদ বাবুনগরীসহ কয়েকজন মতিঝিলের সহিংসতার মামলায় জেলে গেলেও আহমদ শফীকে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরকারের সমালোচকের ভূমিকায় দেখা যায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত