প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১]নবায়ন ছাড়াই চলছে হাজী সেলিমের ৭ প্রতিষ্ঠান

ডেস্ক রিপোর্ট : [২]ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নদী এবং নদীর তীরভূমি ব্যবহারের লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই নির্বিঘ্নে ব্যবসা করছেন সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী মোহাম্মদ সেলিম।

[৩]সেখানে নির্বিঘ্নে চলছে তার মালিকানাধীন মদিনা গ্রুপের দুটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, একটি ডকইয়ার্ড, একটি পাথর ব্যবসাসহ সাতটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম।

এসব প্রতিষ্ঠানের কাজে নদীর তীরের শত শত শতাংশ জমি ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনাও। অথচ এই আটটি প্রতিষ্ঠানের ৬টিরই লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৯ সালে শেষ হয়েছে। বাকি দুটির মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে চলতি বছরের জুনে। দীর্ঘদিন আগে মেয়াদ শেষ হলেও সাত প্রতিষ্ঠানের নদী বা তীরভূমি ব্যবহারে অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ভরাট করে পাথর ব্যবসা করায় একটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে জানা গেছে উল্লিখিত সব তথ্য।

সূত্র জানায়, নীতিমালা অনুযায়ী লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগেই তা নবায়ন করার জন্য আবেদনের বিধান রয়েছে, যা লাইসেন্সে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওই বিধান লঙ্ঘন করে আসছে মদিনা গ্রুপ। তবুও রহস্যজনক কারণে নদী ও তীরভূমি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে আসছে বিআইডব্লিউটিএ। শুধু তা-ই নয়, এর আগেও মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর পর লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে আরোপ করা হয়নি কোনো দণ্ড।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বলেন, নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্সের মেয়াদ নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয়। মদিনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো একইভাবে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করার কথা ছিল। কিন্তু তারা যদি এখনও নবায়নের আবেদন না করে থাকে, তাহলে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।

জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ’র ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের আওতাধীন এলাকায় লাইসেন্স নিয়ে আটটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে মদিনা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে-নারায়ণগঞ্জ জেলার পাগলা মৌজায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এমটিসি সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, একই জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাটে মদিনা সিমেন্ট লিমিটেড ও মদিনা মেরিটাইম নামের ডকইয়ার্ড।

এছাড়া রয়েছে চারটি তেলবাহী জাহাজ মদিনা পেট্রোলিয়াম ওয়ান, মদিনা-৪, মদিনা-৫ ও বেগম সালেহা-২। এ সাতটি প্রতিষ্ঠানেরই নদী ও নদীর তীরভূমি ব্যবহারের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এর বাইরে রয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঝাউচরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মদিনা মেরিটাইমের নামে পাথর ব্যবসার প্রতিষ্ঠান। নদী ভরাটের অভিযোগে এ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত রাখা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তীরভূমি ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স নেয়া বাধ্যতামূলক। ‘নদীবন্দরসমূহের তীরভূমি ও জেটি লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়ন নীতিমালা’ অনুযায়ী লাইসেন্স দেয়া হয়।

তীরভূমি ব্যবহার ও পণ্য পরিবহনের ওজন হিসাব করে নির্দিষ্ট হার অনুযায়ী শুল্ক পরিশোধের বিধান রয়েছে। এরপরই পরবর্তী বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়ন করা হয়। কিন্তু হাজী মোহাম্মদ সেলিম যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করেননি, সেগুলো থেকে ওই সময়ের শুল্কও আদায় হয়নি।

নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট এলাকায় নদীর ২৫৯ শতাংশ তীরভূমি ব্যবহার করছে মদিনা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। নদীর পাড়ে রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের বিশাল আকারের পাকা জেটি, বার্জ লোডার পাইপ, ভাসমান পল্টুন, আরসিসি ওয়াল, আধা পাকা স্থাপনা, স্পাডসহ বিভিন্ন স্থাপনা। অথচ এ তীরভূমি ব্যবহার ও পণ্য লোড-আনলোড করার লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৯ সালের ৩০ জুন শেষ হয়েছে।

এ হিসাবে এক বছর চার মাস ধরে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চলছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তা-ই নয়, সর্বশেষ নবায়নের ক্ষেত্রেও নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে। নীতিমালার ৮(চ) অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিনের আগে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করার বিধান রয়েছে।

নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী বছরের সম্ভাব্য পরিমাণ শুল্ক আগাম জমা দেয়ার শর্তে ওই লাইসেন্স নবায়নের নিয়ম রয়েছে। অথচ এ কোম্পানির ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে চলতি বছরের ২৮ অক্টোবর। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আগাম নবায়নের নিয়ম থাকলেও তা মানেনি প্রতিষ্ঠানটি।

আরও দেখা গেছে, একইভাবে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় রয়েছে আরেকটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। এমটিসি সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ নামের এ প্রতিষ্ঠানেরও মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৯ সালের ৩০ জুন। সেটি নবায়ন করা হয়েছে মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর পর। অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ জুন। এ প্রতিষ্ঠানটি নদীর তীরের ১০ শতাংশ জমি ব্যবহার করছে। সেখানে রয়েছে পাকা জেটি, কাচা স্থাপনা, কনভেয়ার বেল্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

এছাড়া নদীতে অবস্থান করে বিভিন্ন জাহাজে তেল সরবরাহ করছে মদিনা গ্রুপের চারটি ট্যাংকার জাহাজ। এর মধ্যে ওটি মদিনা-১ ট্যাংকারের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর, মদিনা-৪ জাহাজের মেয়াদ ৩০ জুন ও মদিনা-৫ জাহাজের মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়েছে। একইভাবে বেগম সালেহা-২ জাহাজ ও নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে মদিনা মেরিটাইম ডকইয়ার্ডের লাইসেন্সেরও মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছে মদিনা গ্রুপ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মদিনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম কথা বলতে না পারায় তার বক্তব্য নেয়া যায়নি। তার বক্তব্য চেয়ে ব্যক্তিগত সহকারী মহিউদ্দিন বেলালকে রোববার ফোন দেয়া হলে তিনি ব্যস্ত থাকার কারণ দেখিয়ে ফোন কেটে দেন।

লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর কর্মকর্তা মো. মাসুদ কামাল বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তা নবায়নের আবেদন করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত