প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা থামছে না, ৯ মাসে গণপিটুনিতে নিহত ৩০

ডেস্ক রিপোর্ট :  সন্দেহ, গুজব কিংবা পরিকল্পিতভাবে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলবেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে মানুষ। আর চোর, ডাকাত, পকেটমার কিংবা ছিনতাইকারী সন্দেহে ধরা পড়লে গণপিটুনি দেওয়াটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। পূর্বশত্রুতার জেরে চোর কিংবা ছিনতাইকারী অপবাদে সাধারণ মানুষকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার ঘটনাও ঘটছে। আলোকিত বাংলাদেশ

পরিকল্পিত হত্যাকে গণপিটুনি বলে চালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মদতেও গণপিটুনিতে হত্যাকা-ের অভিযোগ রয়েছে। গণপিটুনি দিয়ে হত্যাকা-ের ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো বিচার হয়নি। রয়েছে গণপিটুনির ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি করে বাণিজ্যের অভিযোগ। গত ১১ অক্টোবর সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে যুবক রায়হানকে হত্যার পর ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর ভূঁঁইয়া গণপিটুনি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিসংখ্যান বলছে, গত ৯ মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩০ জন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা জানান, বিচার না হওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এবং স্বার্থ হাসিলের জন্য গণপিটুনির মতো ভয়াবহ নৃশংসতায় মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। সন্দেহ এবং গুজবে কান দিয়ে কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অপরাধ করেও ঘুষ আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় গণপিটুনির মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ঘটনা বাড়ছে। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা বাড়লেও ২০২০ সালে কমে এসেছিল। তবে বর্তমানে দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি, দেশ-বিদেশে ধর্মীয় উত্তেজনা ও লকডাউনের কারণে মানুষের ঘরবন্দি

হয়ে থাকাসহ বিভিন্ন কারণে গণপিটুনির মতো বর্বরতা বাড়ছে। গুজব ছড়ানো ও গণপিটুনির ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে সার্কেল এএসপিদের সঙ্গে ওসিদের বৈঠক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোসহ হাইকোর্টের পাঁচ দফা নির্দেশনা কার্যক্রমও জোরদার করা হয়নি।

দ-বিধির ৩০৪ ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হলে তা খুন হিসেবে গণ্য হবে। যার শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদ-। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আইনের শাসনের কঠোর প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক বিবেচনা না করে সবার জন্য জবাবদিহিতা চালু ছাড়া গণপিটুনি বন্ধ হবে না। আর রাজনৈতিক সহিংসতা দূর করতে হবে। যদি এ পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ একটি অরাজক অবস্থা সৃষ্টি হবে। উন্মাদ জনগণের এ ‘গণপিটুনির আদালত’ জনপ্রিয় হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। গণপিটুনি দিয়ে হত্যাকা-ের বিচার হওয়ার নজির নেই।

আর গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় দোষীদের বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় একই ঘটনা বারবার ঘটছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. নুর খান লিটন আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, অনেক সময় গণপিটুনির শিকার হয়ে নির্দোষ মানুষও নিহত হচ্ছেন। পূর্বশত্রুতার জেরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপরাধী সাজিয়ে পরিকল্পিত হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। গণপিটুনির ঘটনায় থানায় মামলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আস্থাহীনতা রয়েছে। এসব ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে মামলায় অজ্ঞাত অসংখ্য আসামি করে বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। গণপিটুনিতে নিহত হলে স্বজনদের বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। অপবাদ সহ্য করে বিচারের আশা ছাড়তে হচ্ছে স্বজনদের।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, একজন খারাপ লোককেও গণপিটুনি দিয়ে মারা যাবে না। কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। এসব ঘটনার তদন্ত হয়। মামলার বিচার না হওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলেন, গণপিটুনির ঘটনায় প্রধান সমস্যা হলো সাক্ষী পাওয়া যায় না। গণপিটুনির সময় অনেক লোক থাকলেও যে কারণে তারা উদ্ধার করতে যান না, একই কারণে তারা সাক্ষ্যও দেন না। বিভিন্ন জায়গার লোকজন গুজবে কান দিয়ে হুজুগে এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ঘটনা ঘটার পর পালিয়ে যান। ফলে তাদের চিহ্নিত করাও কঠিন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গণপিটুনিতে নিহত হওয়ায় মামলায় সাক্ষী পাওয়া যায় না। ফলে দোষীরা শাস্তি থেকে বেঁচে যায়। তবে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৩০ জন। এর মধ্যে খুলনায় নিহত হয়েছেন ১০ এবং ঢাকায় ৯ জন। ২০০৯ সালে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন ৩৯ জন। তার মধ্যে ঢাকায়ই নিহত হন সর্বোচ্চ ২১ জন। ২০১৯ সালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ জনে। তার মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৫ এবং ঢাকায় খুন করা হয় ২৪ জনকে।

গত বছর ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সন্তানের ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হন তাসলিমা। তাসলিমা বেগমসহ গণপিটুনিতে বেশ কয়েকজনকে হত্যার প্রেক্ষাপটে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ১ মার্চ গণপিটুনি রোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ পুলিশের প্রত্যেক সার্কেল অফিসার (এএসপি) তার অধীনে প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে ৬ মাসে অন্তত একবার গণপিটুনি প্রবণতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে বৈঠক করবেন। গণপিটুনির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার প্রচার কার্যক্রম ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রচারণা অব্যাহত রাখবে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা পালনে সরকারি সংস্থাগুলোর সেই অর্থে কার্যক্রম নেই। গণপিটুনি রোধে গণমাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচার-প্রচারণার কার্যক্রমও এখন আর দেখা যায় না।

গণপিটুনির কয়েকটি ঘটনা : গত ১৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় গরুবাহী কাভার্ডভ্যান চুরি সন্দেহে পুলিশের উপস্থিতিতে এক যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলে স্থানীয় জনতা। উত্তেজিত লোকজন কাভার্ডভ্যানে আগুন লাগিয়ে দেন। ১৯ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগে শাহীন হোসেন নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। উত্তেজিত জনতা আরও দুজনকে পিটিয়ে আহত করে। মসজিদের মাইকে ডাকাত ঘোষণা দিয়ে ২৫ এপ্রিল নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে তুচ্ছ ঘটনার জেরে মো. সুমন নামে এক তরুণকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। ১১ সেপ্টেম্বর বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় গরুচোর সন্দেহে এলাকাবাসী গণপিটুনি দিলে কাজী উজ্জ্বল হোসেন নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত