প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি

এস এম নূর মোহাম্মদ : ঘটনা-১: চলতি বছরের ৪ জুলাই পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী নিখোঁজ হয়। এরপর ৬ আগস্ট ওই ছাত্রীর বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ আব্দুল্লাহ, রকিব এবং খলিল নামে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। তিন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। আসামিরা স্বীকারোক্তিতে বলেন যে, তারা ওই ছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ২৩ আগস্ট ওই ছাত্রী ফিরে এসছে। আসামিদের স্বজনরা জানিয়েছেন, পুলিশ নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করেছে।

ঘটনা-২: অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গত বছরের ২৩ এপ্রিল পুলিশ বাদী হয়ে চট্টগ্রামের হালিশহর থানায় হত্যা মামলা করে। এরপর ২৫ এপ্রিল জীবন চক্রবর্তী ও দুর্জয় আচার্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে জীবন চক্রবর্তী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গাঁজা খাওয়ার ঘটনা কেন্দ্র করে দিলীপ রায়কে হত্যা করেছে বলে জবানবন্দিতে জানান জীবন। কিন্তু এর কিছুদিন পরে দিলীপ রায়কে জীবিত অবস্থায় আদালতের সামনে হাজির করা হয়।

দুর্জয় চক্রবর্তী হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করলে চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ফেরত আসা দিলীপ এবং নথিসহ তদন্ত কর্মকর্তা ও দুই আসামিকে হাজিরের নির্দেশ দেন। হাইকোর্টে শুনানিতে ফিরে আসা দিলীপ বলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে সর্ম্পক ছিন্ন হয়। এ কারণে মামলার ভয়ে কিছুদিন বোনের বাড়িতে ছিলাম। আসামি দুর্জয় বলেন, পুলিশ আমাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। চারদিন আটকে রেখে নির্যাতন করে। ক্রসফায়ার দেওয়ার কথা বলে আমাকে জবানবন্দি দিতে বলে। কিন্তু আমি জবানবন্দি দিইনি।

আর আসামি জীবন চক্রবর্তী আদালতকে বলেন, পুলিশ আমাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। হালিশহর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে বলে তোর নামে হত্যা মামলা আছে। চারদিন ধরে তদন্ত কর্মকর্তা মারধর করেন। এক পর্যায়ে একটি পাথর ও ফুলের টব নিয়ে এসে বলে তুই আদালতে গিয়ে বলবি এ পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে দিলীপকে হত্যা করেছিস। আমি পুলিশের মারধরের ভয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছি।

ঘটনা -৩: গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে বরিশালে নিজ ঘরে খুন হন রেজাউল করিম রিয়াজ নামে এক ব্যক্তি। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ তদন্তে নেমে রিয়াজের আমিনা আক্তার স্ত্রী লিজাকে গ্রেপ্তার করে। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয় লিজার কথিত প্রেমিক মাসুম নামে এক ব্যক্তিকে। পুলিশী হেফাজতে থাকাবস্থায় ২০ ফেব্রুয়ারি কথিত প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে স্বামী হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দেন লিজা।
মামলাটি পরবর্তিকালে অধিকতর তদন্তের জন্য গোয়েন্দা বিভাগে পঠানো হয়। নতুন তদন্তের সময় তিন চোরকে গ্রেপ্তার করলে তারাও রিয়াজকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়। তারা বলেছে, ঘরে চুরি করতে ঢুকলে রিয়াজ জেগে ওঠায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলন করে লিজা জানান, রিয়াজ খুন হওয়ার সময় তিনি অন্য কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য তাকে অমানুষিক নির্যাতনসহ ভাই-বোনকে আটকের পাশাপাশি যৌন নির্যাতন করারও ইঙ্গিত দিয়েছিল এসআই বশির। এমনকি শেখানো স্বীকারোক্তি না দিলে আবারও রিমান্ডে এনে নির্যাতনের ভয় দেখানো হয় তাকে।

সম্প্রতি ১৬৪ ধারার জবানবন্দী গ্রহণ নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। সেখানে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ তার বক্তব্যে বলেন, স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার সময় আইনজীবী থাকার বিধান রয়েছে। যদিও আমাদের দেশে এর প্রচলন নেই। ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দী রেকর্ড করার সময় আসামিকে বার বার সতর্ক করবেন। দেখা যায় ৭ দিনের রিমান্ডের মধ্যে ৬ দিন পর এসে আসামি স্বীকারোক্তি দেয়। কোর্ট সেটা নিয়ে নেয়। সবাই জানে বাংলাদেশে রিমান্ড কি। এজন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে সতর্ক হতে হবে।

তিনি বলেন, স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার আগে ম্যাজিস্ট্রেটের উচিৎ অবশ্যই ফরমে উল্লিখিত লেখাগুলো ভালভাবে পড়ে নেওয়া। আর অবস্থা বুঝে স্বীকারোক্তি না নিলে অবশ্যই আসামিকে পুলিশের হেফাজতে না দিয়ে কারাগারে পাঠানো উচিৎ। কারণ সবাই জানে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হওয়ার পর না দিয়ে পুলিশ হেফাজতে গেলে তার কি অবস্থা হয়। আবার দেখা যায়, এক মামলায় স্বীকারোক্তি না দিলে অন্য মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে পুনরায় রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ আরও বেশি নির্যাতন করে। তাই ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে বাঁচাতে হবে।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, সংবিধানে বলা আছে, কাউকে নিজের বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী স্বেচ্চায় দিতে হবে এবং সত্য ঘটনা হতে হবে। কাউকে ভয় দেখিয়ে বা নির্যাতন করে বাধ্য করা হলে সেটা অপ্রাসঙ্গিক ও অবৈধ হবে। স্বীকারোক্তি কোনো স্বাক্ষ্য নয়।

তিনি বলেন, পুলিশ কোন আসামিকে নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করলে এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। দ-বিধির ৩৩০ ধারায় বলা আছে, নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করলে ৭ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়া যাবে। আর ৩৩১ ধারায় বলা আছে গুরুতর জখম করলে ১০ বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়া যাবে। নির্যাতনের শিকার হলে অভিযোগ জানাতে হবে। আর সাজার মেসেজ দিতে পারলে আশা করি নির্যাতনের প্রবণতা কমে যাবে।

এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংবিধানে বলা আছে কাউকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। কিন্তু দেখা যায় পুলিশ বাধ্য করছে। কোনোদিন দেখিনি ম্যাজিস্ট্রেট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী নিতে অস্বীকার করেছেন। জবানবন্দী না দিলে আবার পুলিশের কাছে রিমান্ডে পাঠানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারকদের এসব ভূমিকায় বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত