প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চ্যালেঞ্জ সামলে সক্ষমতা বেড়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের

ডেস্ক রিপোর্ট: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে গোটা দুনিয়া। অজানা এই ভাইরাস জনজীবনের স্বাভাবিকতা কেড়ে নিয়েছে। বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। দেশে দেশে কর্মসংস্থার হারিয়ে কোটি কোটি মানুষ এখন বেকার।

তবে করোনা সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে। বিগত শতকে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি। কারণ করোনা প্রতিরোধী কার্যকর কোনো ওষুধ কিংবা টিকার সন্ধান এখনও পায়নি চিকিৎসাবিজ্ঞান। কয়েকটি টিকার ট্রায়াল শেষ পর্যায়ে থাকলেও সেগুলো ভাইরাস প্রতিরোধে কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটুকু সফল কিংবা ব্যর্থ তা নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে দেশে করোনাভাইরাসের উৎকণ্ঠা কাটিয়ে জনজীবন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। গতি ফিরেছে অর্থনীতিতেও। একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে অনেকের আশঙ্কা ছিল, সংক্রমণ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং সংক্রমণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। নমুনা পরীক্ষা, শনাক্ত, সুস্থতা ও মৃত্যু- রোগতাত্ত্বিক এই চারটি সূচকেই উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে করোনায় বৈশ্বিক মৃত্যুহার অনেক বেশি। সেই তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যু মাত্র ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। একই সঙ্গে সুস্থতার হারও বেশি। ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। করোনা পরিস্থিতির এই উন্নতির নেপথ্যে ছিলেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। করোনা সংক্রমণের শুরুতে সবাই যখন বাসাবাড়িতে অবস্থান করছিলেন, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই আক্রান্ত মানুষের পাশে থেকে সেবা দিয়েছেন। এই সেবা দিতে গিয়ে শতাধিক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী জীবন দিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন কয়েক হাজার। তবুও তারা হাল ছাড়েননি। করোনা সংক্রমণের শুরুতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে বেশকিছু অভিযোগ ছিল। শুরুর সেই চ্যালেঞ্জ অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার পরিধি ও মান উন্নয়ন হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা শুরুতে রোগীর চিকিৎসা নিয়ে যে ভয়ে ছিলেন, তাও কেটে গেছে। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সক্ষমতার ঘাটতি দ্রুতই কাটিয়ে ওঠার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্নিষ্টরাও। কিন্তু টিকা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাকের টিকার ট্রায়াল হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। শেষ মুহূর্তে সিনোভ্যাক ট্রায়ালের জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পর ওই টিকার ট্রায়াল আর হয়নি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ বলছে, ট্রায়াল না হলেও টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না।

সংক্রমণ ও মৃত্যুর বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে :সার্বিক বিষয় পর্যালোচনায় বলা যায়, সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সফলতা আশাব্যঞ্জক। বিশ্বের উন্নত ও বড় অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কম। সুস্থতার হারও বেশি। শীর্ষ করোনা সংক্রমিত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর ১০ দিনের মাথায় একজনের মৃত্যু হয়। এরপর ক্রমেই সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। জুনের মাঝামাঝি শীর্ষ সংক্রমিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১৫তম এবং মৃত্যুতে ২৯তম স্থানে চলে আসে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই অবস্থানে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আরবের কয়েকটি দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ শুরু হয়েছে। আর এতে করে সংক্রমণে তিন ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশ ১৮তম এবং মৃত্যুতে দুই ধাপ পিছিয়ে ৩১তম স্থানে নেমেছে। দেশে করোনার রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনার ৪৪তম সপ্তাহ চলছে। শেষ হবে আগামী শনিবার। তবে ৪২তম সপ্তাহের সাপেক্ষে ৪৩তম সপ্তাহের রোগতাত্ত্বিক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নমুনা পরীক্ষার হার ৫ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়েছে। নমুনা পরীক্ষা বাড়লেও শনাক্তের হার শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে সুস্থতার হারও ৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেড়েছে। মৃত্যুহারও কমেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের সপ্তাহের তুলনায় ৪৩তম সপ্তাহে চারটি সূচকেই উন্নতি হয়েছে। এ চিত্র থেকে বলা যায়, দেশে করোনা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে রয়েছে।

দেশে করোনা সংক্রমণের পিক টাইম কবে ছিল, সেই প্রশ্ন অনেকের। করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এপ্রিলে সংক্রমণ হার ১২ শতাংশে ওঠে। ৩১ মে সংক্রমণ ২০ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর ২০ আগস্ট পর্যন্ত এই হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো দিন তা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে। ২১ আগস্ট সংক্রমণ হার কমে ১৮ শতাংশে নামে। এ চিত্র থেকে বলা যায়, দেশে ৩১ মে থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত পিক ছিল। বর্তমানে সংক্রমণ ১০ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে। অর্থাৎ, প্রথম দফার সংক্রমণ এখনও শেষ হয়নি। সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে নামলে বলা যাবে প্রথম দফার সংক্রমণ শেষ হয়েছে।
করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করছে ওয়ার্ল্ডওমিটার. ইনফো নামে একটি ওয়েবসাইট। ওই ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গতকাল বুধবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিশ্বের চার কোটি ৪৩ লাখ ২২ হাজার ৫০৪ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৮৯ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এর বিপরীতে সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিন কোটি ২৪ লাখ ৮৬ হাজার ৭০৩ জন। এ হিসাবে মৃত্যুহার ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৭৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। বৈশ্বিক এই চিত্রের বিপরীতে বাংলাদেশে মৃত্যু কম ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। সুস্থতার হারেও বাংলাদেশ ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে এগিয়ে রয়েছে। দেশে মোট সুস্থতার হার ৭৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।

গত সপ্তাহে সংক্রমণে তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮তম এবং মৃত্যুতে দুই ধাপ পিছিয়ে ৩১তম স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। শীর্ষ সংক্রমিত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, যুক্তরাজ্য, মেক্সিকো, পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, ইতালি, চিলি, জার্মানি ও ইরাকের পর বাংলাদেশ অবস্থান করছে। মৃত্যুতেও এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ নিচে অবস্থান করছে। কম সংক্রমিত আরও ১৩ দেশে মৃত্যুহার বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তুরস্ক, ইউক্রেন, বেলজিয়াম, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, রুমানিয়া, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, সুইডেন ও ইজিপ্টের পর বাংলাদেশ অবস্থান করছে।

দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ মোকাবিলার প্রস্তুতি :করোনার প্রথম দফার সংক্রমণ এখনও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে আগামী শীত মৌসুমকে সামনে রেখে দ্বিতীয় দফার সংক্রমণের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরাও দ্বিতীয় দফার সংক্রমণের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, কভিড-১৯ সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ থাকলেও বর্তমানে পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাসপাতালের সেবার পরিধি ও মান উন্নয়ন হয়েছে। এর পরও যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক দেশে দ্বিতীয় দফায় মারাত্মক সংক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও সবকিছু পুরোপুরি চালু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়েও জনসাধারণের মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব কারণে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। সেই সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখনই করণীয় বিষয়ে রোডম্যাপ প্রস্তুত করে সে অনুযায়ী পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কারণেই দেশে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী নয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু কম। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, করোনার দ্রুত বিস্তার রোধে বাংলাদেশ সফল হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীও কয়েকবার করোনা নিয়ন্ত্রণে সফলতার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের প্রশংসা করেছেন। তার নির্দেশনা ও নেতৃত্বে করোনা প্রতিরোধে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। নো মাস্ক, নো সার্ভিস- এই স্লোগান ধারণ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। অর্থাৎ, মাস্ক না পরলে সরকারি সেবা মিলবে না। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মাস্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এই উদ্যোগের ফলে সফলতা আসবে। একই সঙ্গে সবাইকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। তাহলেই সংক্রমণ কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আমরা সক্ষম হবো।সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত