প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : ডিআরইউ’র রজতজয়ন্তী, শেখ হাসিনার ভাষণ এবং মির্জা গোলাম হাফিজের কৌশল

দীপক চৌধুরী: ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান হবে আর যাবো না– তাতো হতেই পারে না। প্রাণের সংগঠন ডিআরইউ’র অনুষ্ঠান বলে কথা। যথারীতি গিয়েছি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ শুনেছি। তিনি সবসময়ই জীবন থেকে নেওয়া কথাগুলোই তাঁর ভাষণ-বক্তৃতায় বলে থাকেন। এজন্যেই এগুলো প্রাণবন্ত হয়ে থাকে। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন এই দুটি শর্তই তাঁর রাজনীতির প্রথম ও প্রধান অঙ্গীকার। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রোগ্রাম ‘কভার’ করার অভিজ্ঞতা থেকে এই ধারণা পেয়েছি। তাঁর কারণেই বাংলাদেশ এখন সম্ভাবনার দেশ। বিশ্বে তাঁর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে। গতকাল রোববার গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) রজতজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছিলেন। শেখ হাসিনা অতীতের উদাহরণ টেনে বলছিলেন, ‘এমন একটা সময় আমাদের দেশে ছিল-যতই দুর্নীতি হোক, যতই অন্যায় হোক, সেগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া হতো। আর সমস্যাগুলো, ওই যে কথায় বলে, কার্পেটের তলে লুকিয়ে রাখা। আমাদের সরকারে কিন্তু আমরা তা করছি না।’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপনি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। নতুন বাঁক ধরিয়েছেন। ইতিহাসে যা কল্পনায়ও ছিল না। এদেশে মুক্তযোদ্ধারা সম্মানীভাতা পাবেন, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ঘাতকদের বিচার হবে, হত্যাকারীদের শাস্তি হবে তা তো কল্পনার বাইরে ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচার হবে? এটাতো আমরা, বাঙালিরা কল্পনাও করতে পারতাম না একটা সময়। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে কেবল আপনার জন্যে। কারণ, আপনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরাধিকার, আপসহীন নেত্রী। যথার্থই বলেছেন, আগে অর্থাৎ জিয়া-এরশাদ-খালেদার আমলে ‘নানাকীর্তি’ ধামাচাপা দেওয়া বা কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখা হতো। এখন তা হচ্ছে না, প্রকাশ হচ্ছে, অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতির বিচার হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত ধামাচাপায় দক্ষ। তা-ই যদি না হবে তাহলে যারা দেশের স্বাধীনতায়ই বিশ্বাস করে না, ১৯৭১-এ খুন-রাহাজানি-ধর্ষণ-বাড়িঘর লুট, হিন্দুর সম্পত্তি লুণ্ঠন করেছিল যারা– তারা এদেশে মন্ত্রী হয় কীভাবে? যাকগে, অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা মনে পড়ছে– তা প্রকাশ না করার লোভ সামলাতে পারছি না। ‘সন্ত্রাসমূলক অপরাধ দমন আইন-১৯৯২’ নিয়ে রাজনীতি গরম তখন। বিএনপি ক্ষমতায় সুতরাং বিরোধীমত ঠেকাতে এর দরকার। সম্ভবত ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস। আজকের কাগজ পত্রিকায় কাজ করি। সন্ত্রাস দমন আইন নিয়ে বিএনপি খুব লাফালাফি করছে। পূর্বেই বলেছি, মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিবিরোধী আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে ঠেকানো। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শক্তিকে বিএনপির মারাত্মক ভয় ছিল। তখন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ। এই সন্ত্রাস দমন আইনটি নিয়ে তাঁর ইন্টারভিউ দরকার। মন্ত্রীর একান্ত সচিব এম এ রাজেক। রংপুরের মানুষ, চমৎকার ব্যক্তিত্ব, উদার দৃষ্টি। তাঁর সাহায্যে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী মহোদয় ইন্টারভিউ দিলেন। তবে তাঁর শর্ত ছিল সাক্ষাৎকারের সময় টেইপরেকর্ডারের উপস্থিতি লাগবে। সুদীর্ঘ ইন্টারভিউ নেওয়া হলো। ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকার প্রথম পাতায় পাঁচকলামে এ সাক্ষাতকার ছাপা হলো। সন্ত্রাসদমন আইনের প্রয়োজনীয়তা ও যুক্তি তুলে ধরে মন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজের দেওয়া বক্তব্যের শিরোনাম ছিল, ‘আপনি সাংবাদিক আপনার যেমন নিরাপত্তার অভাব, আমি মন্ত্রী আমারও’। মন্ত্রীর ছবিসহ সাক্ষাতকার। পত্রিকাটি যেদিন বের হলো সেদিন বিকেলে সংসদ অধিবেশন। সংসদ গরম হয়ে উঠল তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতায়। আজকের কাগজ পত্রিকায় নিরাপত্তা নিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং মন্ত্রীর সংশয় প্রকাশ। এর পরদিন সচিবালয়ে মন্ত্রী গোলাম হাফিজের দপ্তরে এম এ রাজেক সাহেবের কক্ষে গেছি। তিনি অস্থিরতার সঙ্গে বললেন, ‘ভালো হয়েছে আপনি এসেছেন। আমার মন্ত্রী আপনার সঙ্গে ইন্টারভিউর বিষয়ে কথা বলতে চান।’

আমার মুখের দিকে এক পলক তাকিয়েই মির্জা গোলাম হাফিজের রক্তচক্ষু। তাঁর রাগান্বিত কণ্ঠ, ‘আমি কী এভাবে বলেছিলাম? আপনি লিখে দিলেন কাগজে (পত্রিকা)।’ টেইপরেকর্ডার চাপ দিয়ে শোনালাম তাঁর কথাগুলো। এরপর কিছুক্ষণ চুপচাপ। সামনের চেয়ার দেখিয়ে ইশারায় বসতে বললেন। কফি, বিস্কিট এলো। মন্ত্রীর নানা কথা, বয়সের কথা, মানসিক চাপের কথা, দলের নেতাদের টিপ্পনি! ইনিয়ে-বিনিয়ে মন্ত্রীর নানাকথা। অর্থাৎ কীভাবে এটাকে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব। যদিও মন্ত্রীর সেই পরামর্শ রাখার কোনো পথ নেই। তবু তাঁর ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা, কার্পেটের নীচে ফেলার প্রাণান্তকর ইচ্ছা মন্ত্রীর ছিল। এখন দুর্নীতির বিচার হচ্ছে। এক শ্রেণির কর্মকর্তা বা সরকারি লোক দুর্নীতিতে এতোটাই নিমজ্জিত যে, গর্ত থেকে হাতি দিয়ে টেনে তুললেও তাদের ‘সাফ’ করা যাচ্ছে না- এটা সত্য। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই জঞ্জাল সাফ করতে এ সরকারের ত্রুটি নেই। এই সরকারের অগ্রগতি ও উন্নয়নকে দুর্নীতিবাজরা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে বাধাগ্রস্ত করতে চাইলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। তাঁর সুচিন্তিত মতামতেই এখন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। তিনি জনগণের প্রতি আত্মনিবেদিত।

এটা স্বীকার করতেই হয় যে, ইস্পাত কঠিন মনোবলে পর্বতসম বাধা ডিঙ্গিয়ে ক্রমেই এগিয়ে চলেছেন শেখ হাসিনা। এমন সব খবর সামনে চলে আসছে যা মানুষকে বিস্মিত করছে। আওয়ামী লীগ নেতা দুই ভাইয়ের টাকার গুদাম, এক যুবমহিলা লীগ নেত্রীর প্রতিদিন তিন লাখ টাকা হোটেল মনোরঞ্জনের বিল। এগুলো বিচার হচ্ছে। দুর্নীতির জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছিরের জেল। পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান কারাবন্দি। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ সীমাহীন ঘুষবাণিজ্যে নিমগ্ন থাকায় এখন কারাগারে। তারা বিচারের মুখে। ঘুষ খাওয়া ও ঘুষ দেওয়ায় এতো দক্ষ ছিলেন যে, ইতিহাসে ‘ঘুষবিদ হিসেবে’ তাদের নাম লেখা থাকবে। দুদকের পরিচালক কীভাবে ঘুষের বিনিময়ে ডিআইজিকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন তা শুনে অনেককেই এখন বিস্মিত করে না। সমালোচকরাও স্বীকার করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের কারণে দুর্নীবাজদের এখন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, জেল খাটছে, বিচার চলছে। এই রীতি-পদ্ধতি দীর্ঘদিন এদেশে ছিল না। এখন অন্যায়কারী ধরা পড়লে তিনি যতো উচ্চতম ব্যক্তি বা সমাজের যে স্ট্যাটাসেরই হোন না কেন, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

আমরা জানি, রাজনীতির কঠিন ময়দানে জাতির জনকের এই কন্যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কারণেই আজ টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ। মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বারো বছর ধরে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশের জনগণকে যেমন আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন ঠিক তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত