প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাবলু ভট্টাচার্য্য: স্মরণ, পাবলো পিকাসো

বাবলু ভট্টাচার্য্য: “শিল্প এমন এক মাধ্যম যা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।”——- পাবলো পিকাসো

পিকাসো যখন বালক ছিলেন তখন তাঁর মা এমন একটা ধারণা পোষণ করতেন যে, পুরোহিত হলে পিকাসো হবে পোপ। আর সেনা হলে হবে সৈন্যাধ্যক্ষ। ধারণাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য না হলেও, প্রকারান্তরে সত্য হল।
তবে ব্যক্তি পিকাসো আর শিল্পী পিকাসো এক এবং অভিন্ন ছিলেন না। তাঁর দুই সত্তার মধ্যে বিরোধ এবং বৈষম্য ছিল সারাজীবন।
উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে, যেমন— স্পেন ছেড়ে যখন তিনি ফ্রান্সে আসেন তখন তাঁর পরনে ছিল স্পেনের গ্রাম্য পোশাক, শ্রমিকের। মুখে গ্রাম্য ভাষা। সারা জীবন তিনি তা ত্যাগ করেন নি।
চুল কাটাতে কখনো তিনি বাড়ীর বাইরে যেতেন না। নিজেই নিজের চুল কাটতেন, দাঁড়ি কাটতেন, নখ কাটতেন। কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের দিয়ে কাটিয়ে নিতেন। কারণ তাঁর স্প্যনিশ সংস্কার। সংস্কারটা হলো এই যে, কাঁটা চুল, দাঁড়ি কিংবা নখ নিয়ে কেউ তুকতাক করতে পারে।
এমন কি শেষ জীবনে বাড়িতে এসে একজন নাপিত তাঁর চুল, দাঁড়ি, নখ কেটে দিয়ে যেত এবং তিনি সেসবের টুকরোগুলো কোথায় যে লুকিয়ে ফেলতেন, কেউ জানতো না।
তাঁর আচার-আচরনেও স্প্যানিশ রীতিনীতিই প্রকট হয়ে উঠত। একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওলট-পালট করা শিল্পীর এইসব ব্যাপার-স্যাপার একেবারে অস্বাভাবিক না হলেও নজরে পড়ত। তিনি নিজেও বলতেন— ‘আমার শিল্পের প্রাথমিক প্রেরণা আমার গ্রাম এবং দেশের মানুষ।’
আরও একটা কথা তিনি বলতেন— ‘আমি দিই না কিছুই। নিই।’ কথাটা স্বার্থপরের মতো শোনালেও, সত্যি। তিনি যার কাছ থেকে যা নিয়েছেন, তাঁর অনেকটাই জাগতিক এবং ব্যবহারিক। সে ঋণ তিনি শোধ করেননি। কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছেন শিল্পের মধ্য দিয়ে। তাতে ব্যক্তির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি কিন্তু শিল্পের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছ।
তিনি কি স্বার্থপর ছিলেন প্রেমের ব্যাপারে? কিংবা নিষ্ঠুর? আপাতভাবে, এরকম একটা সন্দেহ জাগে। সন্দেহটা অমুলক না। জীবনের নানা পর্যায়ে তিনি নানা নারীকে ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু সকলকে বিয়ে করেননি। এ ব্যাপারে তাঁর সুনাম-দুর্নাম দুই-ই ছিল… সুনামের চেয়ে দুর্নামটাই বেশি।
এইসব সত্ত্বেও প্রেম এসেছিল তাঁর জীবনে একেকটা অভিজ্ঞতার মতো। সেইসব অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর শিল্পের সুস্থিরতায়-অস্থিরতায় নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। রেমব্রান্ট যেমন তাঁর ভাইদের, বন্ধুদের এবং আত্মীয়-স্বজনদের অবিস্মরনীয় করেছেন তাঁর শিল্পে— ভাইয়ের প্রতিকৃতি এঁকেছেন যীশুর আদলে— তেমনি পিকাসো তাঁর প্রেমিকা ও সহধর্মীদের, ছেলেমেয়েদের অবিস্মরণীয় করেছেন।
তাঁর শিল্পের সাথে যারা পরিচিত, তারা অনায়াসেই চিনে নিতে পারেন তাঁর প্রেমিকাদের— ওলগা, দোরামা, ফ্রাঁসোয়া জিলোকে।
বিস্ময়ের কথা, তাঁর প্রেমিকারা কেউ স্প্যানিশ ছিলেন না। ছিলেন রুশ কিংবা অন্যদেশের নারী। দেশজ অনেক কিছুই মেনে নিয়েও, এই একটা ব্যাপারে তিনি দেশজ ছিলেন না।
প্রেম যখন তাঁর জীবনে আসেনি, তখন তিনি ছিলেন হতাশ, বিরক্ত এবং ক্লান্ত। তিনি ছিলেন অস্থির শিল্পী। বিশ্বাস করতেন কেবল নিজেকে। বলতেন— ‘আই ডু নট সার্চ, আই ফাইণ্ড।’ এটাই সত্যি। অস্থিরতা দিয়ে তিনি একটা যুগের না— শতাব্দীর চেহারা বদলে দিয়ে গেছেন।
অনেকে তাঁকে কমিউনিস্ট বলেন, হয়তো তিনি তাই ছিলেন। কিন্তু একটা কথা তো অস্বীকার করা যায় না, কমিউনিস্ট দুনিয়া তাঁকে নিয়ে স্বস্তিতে ছিল না। কমিউনিস্টদের আদর্শ বা ফর্মুলা মেনে তিনি ছবি আঁকেননি। শান্তির প্রতীক হিসেবে, যে-পায়রাটা ব্যবহার করা হয়, সেটাও বিশেষ কোন উপলক্ষের কথা মনে রেখে আঁকা হয়নি। আঁকা হয়েছিল অনেক আগেই।
এলুয়ার যখন তাঁর কাছে যান একটা শান্তির প্রতীক এঁকে দেবার জন্যে, তখন তিনি পুরানো আঁকাআঁকির স্তূপ ঘেঁটে সাদা পায়রাটাকে বের করে দেন।
হিটলারও তাঁকে নিয়ে স্বস্তিতে ছিলেন না। তাঁর অনেক প্রমাণ আছে। ‘গুয়েরনিকা’র একটা প্রিন্ট দেখে একজন জার্মান সামরিক অফিসার জিজ্ঞেস করেছিলেন পিকাসোকে— ‘এটা কি তোমার আঁকা?’ পিকাসো চটপট জবাব দিয়েছিলেন— ‘না, এটা তোমাদের রচনা।’ ইঙ্গিতটা বুঝতে, ওই জার্মান সামরিক অফিসারের বোধহয় কোন অসুবিধা হয় নি।
পিকাসো ছিলেন সব রকম নির্যাতনের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠিত ধারনার বিরুদ্ধে। তবে ওই যে বলা হয়, তিনি ভেঙেছেন কেবল— এটা ঠিক না। যা কিছু ভেঙেছেন, তা গড়ার জন্যই। ভাঙার আনন্দে কোনো কিছু তিনি ভাঙেননি।
পাবলো পিকাসো ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর স্পেনের মালাগা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত