প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসুদ রানা: ভারতে অদ্যাপি পৌত্তলিকতা, কী বলতেন দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ?

মাসুদ রানা: ভারতে যে-বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শতবর্ষ এবং সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, সে-বছর অকালে মারা গেলেন ফরাসি দার্শনিক অগাস্ত্য কোঁৎ ১৮৫৭ সালে। মৌলিক জ্ঞানের অধিকারী এই ফরাসী দার্শনিক দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, বিজ্ঞানের দর্শন ও সমাজবিজ্ঞানে তাঁর মৌলিক অবদান রাখার জন্যে বিশে^ স্মরণীয়। অগাস্ত্য কোঁৎ যে-তত্ত্বের জন্যে বিখ্যাত, তার নাম হচ্ছে ‘পজিটিভিজম’, যার বাংলা নাম সম্ভবত ‘প্রত্যক্ষবাদ’। পজিটিভিজমের মূল কথা হচ্ছে, কোনো জ্ঞানই নির্ভরযোগ্য নয়, যদি না তা প্রত্যক্ষণযোগ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়, যা একমাত্র আসতে পারে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে।

কোঁৎ বলেন, সভ্যতা বিকাশের পথে মনুষ্য-জ্ঞান তিন পর্যায়ে বিকশিত হয়েছে। প্রথম পর্যায়কে তিনি বলেছেন ‘থিওলজিক্যাল’ (ধর্মতাত্ত্বিক), দ্বিতীয় পর্যায়কে বলেছেন ‘মেটাফিজিক্যাল’ (অধিবিদ্যিক), এবং তৃতীয় পর্যায়কে ‘পজেটিভ’ (প্রত্যক্ষ)। ‘থিওলজিক্যাল’ পর্যায়ে মানুষ সব কিছুকে ব্যাখ্যা করেছে অতিপ্রাকৃতিক সত্তার আলোকে, যার ওপর ভিত্তিষ্ঠিত প্রায় প্রতিটি ধর্ম। এখানে জ্ঞানের নির্ণায়ক পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ নয়, বরং প্রকৃতির সবকিছুতেই অতিপ্রাকৃতিক সত্তার প্রত্যক্ষ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।

‘মেটাফিজিক্যাল’ পর্যায়ে মানুষ প্রধানত ধর্মীয় বিশ্বাসের আশ্রয়েই জগত ও জীবন সম্পর্কে কতিপয় সাধারণ বিমূর্ত নীতি বা নিয়ম প্রতিষ্ঠা করে, তার যুক্তিতে সবকিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। এখানে মানুষ যুক্তিবাদী হয়ে উঠলেও তখনও পর্যন্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ আশ্রয়ী হয়ে ওঠেনি। ‘পজেটিভ’ পর্যায়ে মানুষের জ্ঞান গড়ে উঠেছে বস্তুনিষ্ঠ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে, যেখানে কোনো পূর্বস্থিত বিশ^াস বা বিমূর্ত নিয়ম নয়, বরং প্রত্যক্ষ ও মূর্ত-নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থেকে।

অগাস্ত্য কোঁৎ ‘থিওলজিক্যাল’ বা ধর্মতাত্ত্বিক পর্যায়কে তিনভাগে ভাগ করেছেন। আর, এগুলো হচ্ছে ‘ফেটিশিজম’ (সর্বপ্রাণবাদ), ‘পলিথেইজিম’ (বহুদেববাদ), ও ‘মনোথেইজিম’ (একেশ্বেরবাদ)। কোঁৎ বলেন, সর্বপ্রাণবাদে মানুষ প্রকৃতির সবকিছুর মধ্যে স্পিরিট বা চৈতন্য কল্পনা করেছে এবং তার পুজা করেছে। বহুদেববাদে মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের নিয়ন্তা হিসেবে একেকজন দেবতার কল্পনা করে তার বন্দনা করেছে। আর, একেশ^রবাদে মানুষ সমস্ত বিশ^ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও পরিচালক হিসেবে এক ঈশ^রের কল্পনা করে তার আরাধনা করেছে।

তাঁর মতে, মানুষের জ্ঞান বিকাশের ধারায় প্রথমে এসেছে সর্বপ্রাণবাদ, তারপর বহুদেববাদ, তারপর একেশ^রবাদ। পরবর্তী পর্যায়ে এসেছে অধিবিদ্যাবাদ এবং সবশেষে এসেছে বৈজ্ঞানিক প্রত্যক্ষবাদ। অগাস্ত্য কোঁৎ-এর ‘থিওলজিক্যাল’ বা ধর্মীয় পর্যায়ের তিনটি উপ-পর্যায়কে আরও বিধিবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি। আমার ইচ্ছা আছে, এ-বিষয়ে আমি আমার ধারণা কী তা লিখবো। তবে এক্ষণে আমি যা বলতে চাচ্ছি, তা হচ্ছে সাধারণভাবে, প্রায় প্রতিটি সভ্যতায় সর্বপ্রাণবাদকে প্রতিস্থাপন করে বহুদেববাদ এসেছে এবং বহুদেববাদকে প্রতিস্থাপন করে একেশ^রবাদ এসেছে। কিন্তু অন্তত একটি ব্যতিক্রম হচ্ছে ভারত, যেখানে এখনও বহুদেববাদ প্রবল প্রতিপত্তি নিয়ে রাজ করছে।
অর্থাৎ, অগাস্ত্য কোঁৎ-এর তত্ত্ব অনুসারে ভারতীয় সমাজ এখনও জ্ঞান-বিকাশের আধুনিক স্তরে উন্নীত হতে পারেনি। এ-সমাজ এখনো প্রথম স্তরের দ্বিতীয় উপস্তরেই রয়ে গিয়েছে। কারণ সেখানে এখনও পৌত্তলিকতা মহাসমারোহে চর্চিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটি কী করে সম্ভব? এ-বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানের স্বার্থে এখানে উল্লেখ্য যে, ভারতে গৌতম বুদ্ধ যে-জ্ঞান ও জীবন-দর্শন প্রবর্তন করেন, যা বৌদ্ধধর্ম নামে পরিচিত, সেখানে তিনি বহুদেববাদকে সম্পূর্ণ অস্বীকারতো করেন-ই, এমনকি একেশ্বরবাদের দিকেও যাননি।

বৌদ্ধ আশ্চর্যজনকভাবে সরাসরি একটি উচ্চস্তরের মেটাফিজ্যাল পর্যায়ে তার জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি ও শিক্ষাকে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা পজেটিভিজমের প্রায় দ্বারপ্রান্ত উপনীত হয়েছিলো। আমি মনোবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে বৌদ্ধধর্মের মনোবিজ্ঞান ‘অভিধম্ম’ পড়লে সেটি বুঝতে পারি। এটি এক বিস্ময়কর জ্ঞানভাণ্ডার। দুর্ভাগ্যবশত হিন্দু বহুদেববাদের প্রবল আক্রমণে বৌদ্ধধর্ম তার মাতৃভূমিতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণে ভারতীয় সমাজ পৌত্তলিক পর্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে পারলো না। ঊনিশ শতকে বাংলা তরুণ সমাজ সংস্কারক হেনরি লুইস ডিরোজিওর অনুসারীরা ইয়াং বেঙ্গল নামে এবং প্রায় একই সময় রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজ পৌত্তলিকতাকে অস্বীকার করলেও শেষপর্যন্ত জয়ী হতে পারেনি।

পরিশেষে, আজ পজিটিভিজমের এই অগ্রসর যুগে, বিশ্বের কোনো আধুনিক সভ্যতায় যেখানে পৌত্তলিকতা আর টিকে নেই, সেখানে কীভাবে ভারতীয় সমাজে বিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও ফেশিটিজমের এই দ্বিতীয় স্তরটি বিস্মকরভাবে টিকে আছে, তা নিয়ে দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক, সমাজবৈজ্ঞানিক ও সমাজ-মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

২৯/০৫/২০১৯। লণ্ডন, ইংল্যান্ড

ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত