প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোভিড মহামারীর বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প ঋণে, জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বণিক বার্তা: কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ খরায় ছিল দেশের শিল্প খাত। নতুন উদ্যোগ ও বিনিয়োগ ছিল একেবারেই হাতে গোনা। এ অবস্থায় চলতি বছরের শুরুতেই বিশ্বব্যাপী আঘাত হানে কভিড-১৯ মহামারী। করোনার তাণ্ডবে অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো থমকে যায় দেশের শিল্প খাতে বিনিয়োগও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমেছে ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে ৫৭ শতাংশ কমেছে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণের আদায়। মেয়াদি ঋণের এ পরিস্থিতিকে দেশের ব্যাংকিং খাত, শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় দুর্যোগ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণত শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ দেয়া হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভবন-অবকাঠামো গড়ে তোলা ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজার থেকেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংগ্রহ করেন। যদিও বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ শিল্প উদ্যোগই ব্যাংকঋণনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের এ খাতে দেশের সবক’টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) ঋণ আছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। এ ঋণের ৬৫ শতাংশের বেশি বিতরণ করেছে দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের জুন শেষে এ ব্যাংকগুলোর শিল্প খাতে বিতরণকৃত মেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ ও আদায় বেশি কমেছে। শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও আদায়ের এ খরা কাটিয়ে ওঠা যায়নি বর্তমানেও।

ব্যাংকাররা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই শিল্প খাতে নতুন উদ্যোক্তা পাওয়া যাচ্ছে না। পুরনো উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের কারখানা কিংবা ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাস সেসব উদ্যোগকেও থামিয়ে দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্র্রাহকদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঋণের কিস্তি আদায় করতে হচ্ছে বলে জানান মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছর গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দিয়েছে। এ কারণে বেশির ভাগ গ্রাহকই কিস্তি পরিশোধ না করে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের অজুহাত দেখাচ্ছেন। তার পরও গ্রাহকদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে আমরা ঋণের কিস্তি আদায়ের চেষ্টা করছি। যাদের চার-পাঁচটি কিস্তি বকেয়া পড়েছে, তাদের এক-দুটি কিস্তি হলেও দেয়ার জন্য বলছি। এভাবে চেষ্টা করছি কিছু ঋণ হলেও আদায় করার। তবে শিল্প খাতে নতুন করে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে।

শিল্পের মেয়াদি ঋণসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরেই এ খাতে বিনিয়োগ ও আদায় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাস শিল্প খাতের বিনিয়োগের ওপর দিয়ে সুনামির ঢেউ আছড়ে ফেলেছে। ২০১৯ সালের মার্চ-এপ্রিল প্রান্তিকে দেশের শিল্প খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে এ খাতে বিতরণকৃত ঋণ ১২ হাজার ১৩০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমেছে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে করোনার লকডাউন পরিস্থিতিতে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণ ৯৪ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা শিল্প খাতে বিতরণ করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগে থেকে অনুমোদিত ঋণ বিতরণ হওয়ায় লকডাউনের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ বেড়েছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম। তিনি বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে পরিচালনা পর্ষদের সভা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে পর্ষদের সভা শুরু হওয়ার পর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়। তবে মহামারী ব্যাংকের সব কার্যক্রমেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। বছরের শুরুতে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে বিশেষ সুবিধায় আমরা বেশকিছু ঋণ পুনঃতফসিল করেছি। করোনাভাইরাসের আঘাত না এলে আমাদের আদায় আরো বাড়ত। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসত।

করোনা সংক্রমণ রোধে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ ছুটি চলমান ছিল মে মাসের শেষ পর্যন্ত। জুনের শুরুতেই সরকারি দপ্তর চালু হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লেগেছে। সীমিত পরিসরে বাস্তবায়ন হওয়া লকডাউনের সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ছাড়া সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমেছে। এ সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ কমেছে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ, বিদেশী ব্যাংকের কমেছে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর কমেছে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। আর দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণ ৮৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে।

বিতরণের চেয়েও বড় বিপর্যয় হয়েছে শিল্প খাতের ঋণ আদায়ে। এপ্রিল-জুন মেয়াদে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কমেছে ২৭ দশমিক ১ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৬০ দশমিক ১ শতাংশ, বিদেশী ব্যাংকগুলোর ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং এনবিএফআইগুলোর ৪২ দশমিক ১ শতাংশ ঋণ আদায় কমেছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে শিল্পের মেয়াদি ঋণের আদায় কমেছে ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে মেয়াদি ঋণের আদায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছিল।

শিল্প খাতে বিতরণকৃত ঋণ আদায় কম হলেও দেশের কৃষকরা ব্যাংকঋণ পরিশোধ করছেন বলে জানান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কৃষি ব্যাংকের আদায় ছিল ১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত আমরা ১ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছি। সে হিসাবে আমি বলতে পারি, মহামারী ও বন্যার মতো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও কৃষকরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন। ২০১৮ সালে যখন আমি কৃষি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নিই, তখন এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ শতাংশ। বর্তমানে কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। কিস্তি পরিশোধ না করলে আগামী জানুয়ারিতে খেলাপি হবে আমাদের এমন ঋণ মাত্র দেড় শতাংশ। সব মিলিয়ে ঋণ পরিশোধে কৃষকদের আন্তরিকতায় আমরা খুশি।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশের শিল্প খাতসহ পুরো ব্যবসা-বাণিজ্যই বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও ইভেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বর্তমানে পৃথিবীর কোনো দেশেই নতুন বিনিয়োগ নেই। সবাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছে। দুই-তিন মাসের বেশি কারখানা বন্ধ ছিল। করোনা যদি আরো এক-দুই বছর স্থায়ী হয় তাহলে দেশের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানাই বন্ধ হয়ে যাবে। পুরনোরাই টিকে থাকতে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নতুন শিল্প উদ্যোক্তা আসার সুযোগ কই?

সর্বাধিক পঠিত