প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

থামছে না ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংকিং জালিয়াতি

ডেস্ক রিপোর্ট: থামছে না ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে পুরো ব্যাংকিং খাতে এক ভয়াবহ চক্র গড়ে উঠেছে। তারা গ্রাহকদের ভিসা কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড বিভিন্ন ভাবে হ্যাক করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। গ্রাহকদের কার্ড নম্বর চুরি করে নতুন কার্ড তৈরি করে কেনাকাটাসহ এটিএম মেশিন থেকে টাকা উত্তোলন করে নিচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিসের পিন নম্বর জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তারও যোগসাজশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে এসব জালিয়াতিতে। এই চক্রটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। কিছু কিছু ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ঠেকাতে নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখছে এটিএম মেশিনের কার্যক্রম। ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। বাংলাদেশে বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থাকা সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক বার সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটিএম মেশিন বন্ধ রেখে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি ঠেকানো যাবে না। আইটি দিয়েই আইটি সমস্যার সমাধান করতে হবে।

জানা গেছে, গত ৭ জুন ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের ১৩ জনকে আটক করে র‌্যাব। এদের বিরুদ্ধে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। র‌্যাবের পৃথক অভিযানে ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে তাদের আটক করা হয়। আটকের সময় তাদের কাছ থেকে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। গত ৯ জুলাই ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির আরেক চক্রের চারজনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

Chaldal.com নামে অনলাইন শপের অভিযোগের সূত্র ধরে সিআইডির সাইবার পুলিশ জালিয়াতির ঘটনাটি উদঘাটন করে। সংস্থাটি তদন্তে জানতে পারে, চক্রটি নিয়মিত অন্য ব্যক্তির মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে Chaldal.com থেকে কেনাকাটা করে। ক্রেডিট কার্ড থেকে নিয়মিত অনলাইনে লেনদেন হলেও প্রকৃতপক্ষে কার্ডের মালিক বিষয়টি সম্পর্কে অন্ধকারেই থেকে যান। এ ছাড়া চক্রটি আড়ং ও অন্যন্য অনলাইন শপে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমেও কেনাকাটা করে। প্রকৃত ক্রেডিট কার্ড হোল্ডারের পিন নম্বরসহ গোপন তথ্য চুরির মাধ্যমে তারা এ জালিয়াতি করে।

জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা হলেন, নিজাম উদ্দিন, রেহানুর হাসান রাশেদ, আনোয়ার পারভেজ ও আল-আমিন। এদের তিনজন ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং অন্যজন পণ্য রিসিভ করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। রাজধানীর বনানী থানায় তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। আট মাসের তদন্তে ক্রেডিট কার্ড হ্যাকার নাজমুস সাকেব নাঈমের খোঁজ পায় রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ। গত ২৫ আগস্ট মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে নাঈম ও তার সঙ্গী মইনুল ইসলাম মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হ্যাক করে টাকা চুরির তথ্য জানান নাঈম। তিনি পাপুয়া নিউগিনির ব্যাংকের ভিসা কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বাংলাদেশসহ ৯টি দেশ থেকে টাকা চুরি করেন। ৮টি দেশের কেউই এই ভয়ঙ্কর চোরকে খুঁজে পায়নি।

জানা যায়, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাপুয়া নিউগিনির নাগরিক আবদুল ওয়াহেদের সাড়ে তিন কোটি টাকা চুরি করে সেই জালিয়াত। আবদুল ওয়াহেদের ভিসা কার্ড হ্যাক হয় ২০১৪ সালে। নাঈম থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে বসে ৯টি দেশে অনলাইনে ১ হাজার ৪৭২টি ট্রানজেকশনের মাধ্যমে কেনাকাটা করে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসেন ভুক্তভোগী ওয়াহেদ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। মামলার তদন্তে দেখা যায়, ভার্চুয়াল ভিসা কার্ড জেনারেট করে ৬৯ বারে প্রায় ৯৯ হাজার মার্কিন ডলার তুলে নেন নাঈম। আর ‘নেটাললার্ক’ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আরেকটি ভার্চুয়াল ভিসা কার্ড জেনারেট করে ৭ বারে প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া গত মাসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জালে ধরা পড়েন আবদুল্লাহ-আল-মামুন নামে এক ব্যক্তি। তিনি জাল জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে দুটি ব্যাংক থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণ পরিশোধ না করতেই জাল এনআইডি বানান তিনি। তার মতো আরও ১৯ জন জালিয়াতি করে ঋণ নিয়েছেন। মামুনসহ পাঁচজনকে ঢাকার মিরপুর থেকে গ্রেফতারের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জেরায় বেরিয়ে আসে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। ডিবি সূত্র জানায়, গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর থেকে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সহায়তাকারী একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে ডিবির লালবাগ বিভাগ। তারা হলেন, সুমন পারভেজ, মজিদ, সিদ্ধার্থ শংকর সূত্রধর, আনোয়ারুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন ও মহিউদ্দিন চৌধুরী। এদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ভুয়া এনআইডি দিয়ে কতজনকে ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন তার কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রের হোতা সুমন পারভেজ ও মজিদ ২০১৭ সাল থেকে জাল জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। এখন পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫টি ভুয়া এনআইডি তৈরির কথা তারা স্বীকার করেছেন। আর এই ভুয়া এনআইডি চক্রের মাধ্যমে আবদুল্লাহ আল মামুন ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা, সিটি ব্যাংকের নিকেতন শাখা থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন। এ ছাড়া মিল্টন রাজধানীর নর্থসাউথ রোডের সাউথবাংলা ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকা, ইয়াছির সিটি ব্যাংকের প্রগতি সরণি শাখা থেকে ১০ লাখ টাকা, সালেহ আহমেদ ইউসিবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা, আবদুল মজিদ এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নেন। এভাবে চক্রটি অন্তত ২০ জনকে ব্যাংক থেকে ঋণ করিয়ে দিয়েছে বলে তদন্তে জানতে পেরেছে ডিবি।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ব্যাংক কিংবা ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতিতে আমরা মামলার পরই ব্যবস্থা নিই। তার আগে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ কম। তবে বর্তমানে বিভিন্নস্থানে টাকা বিনিয়োগে টাকা মেরে দেওয়ার অভিযোগ প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা শঙ্কিত।

দেশের ব্যাংকিং খাতের এই জালিয়াতির বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, ক্রেডিট কার্ড বিশেষ করে ভার্চুয়াল লেনদেনে আমাদের দেশে এখনো উচ্চপর্যায়ের ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ হ্যাকিংয়ের চেষ্টা করা হয়। যারা হ্যাকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তারা কাজটি করেন। বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর বড় দুর্বলতা দক্ষ আইটি কর্মীর অভাব রয়েছে। সম্প্রতি দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও তুলনামূলক কম। অনলাইন প্ল্যাটফরমে লেনদেনে হ্যাকিং প্রতিরোধে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক পরিসরে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে অনেকে এটিএম বুথ বন্ধ রাখছে। কিন্তু সেটা সমাধান নয়।বিডি প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত